- বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি
- দেশের নেটওয়ার্কে সচল কয়েক লাখ ভুয়া আইএমইআই নম্বর
- প্রতি বছর বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার
দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া মোবাইলফোনগুলো বিদেশ থেকে বৈধ-অবৈধপন্থায় আসছে কিংবা দেশীয়ভাবে উৎপাদিত হচ্ছে। সেসব মোবাইল যখন গ্রে মার্কেটে বিক্রি হচ্ছে সেটা তখন আর সরকারি তালিকায় উঠছে না। এভাবে অধিকতর মুনাফার লোভে গ্রে মার্কেটে বিক্রি হওয়া বৈধ মোবাইল হ্যান্ডসেটগুলো এক সময় অবৈধ হয়ে যাচ্ছে। এসব আনঅফিসিয়াল বা অনিবন্ধিত মোবাইল হ্যান্ডসেট সারা দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। ওইসব মোবাইল ফোন চুরি, ছিনতাই হলেও প্রক্রিয়াগতকারণে প্রতিকার পাচ্ছেন না গ্রাহকেরা। ফলে বাড়ছে ডিজিটাল প্রতারণা। একদিকে অনিবন্ধিত মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ভয়ঙ্কর সব অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরও সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধী চক্র। মানুষের স্বাভাবিক জীবনে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছে। অন্য দিকে গ্রে মার্কেটে মোবাইল হ্যান্ডসেট অহরহ বেচাবিক্রি হওয়ায় বছরের পর বছর মোটা অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। যদিও ওইসব মোবাইল হ্যান্ডসেট বিক্রি করে ফুলে ফেঁপে বড় হচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
গ্রে মার্কেট কী : সহজভাবে বললে, গ্রে মার্কেট হলো একটি অনুমোদনহীন বা আনঅফিসিয়াল ব্যবসা বাজার। যেখানে বিনিয়োগকারীরা আসন্ন আইপিও এবং স্টক সম্পর্কে জানতে পারেন, যেগুলো এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তালিকাবদ্ধ হয়নি। সাধারণত আনুষ্ঠানিক ব্যবসা শুরু হওয়ার আগে নতুন সিকিউরিটির কেনাবেচা হয় গ্রে মার্কেটে। অন্যভাবে বলা যায়, গ্রে মার্কেট হলো এমন একটি অনানুষ্ঠানিক বাজার যেখানে ব্র্যান্ডেড পণ্য বা সিকিউরিটিজ অনুমোদিত বিতরণ চ্যানেলে বা নিয়মের বাইরে বিক্রি হয়, যা বৈধ হলেও মূল প্রস্তুতকারক বা নিয়ন্ত্রকের অনুমোদন থাকে না, ফলে ওয়ারেন্টি বা সহায়তার অভাব থাকে এবং যেখানে চোরাচালান বা নিষিদ্ধ পণ্য লেনদেন হয়। গ্রে মার্কেটে বৈধ মোবাইল হ্যান্ডসেট সরকারকে কর ফাঁকি দিয়ে আনঅফিসিয়ালি তুলনামূলক কম টাকায় বিক্রি করা হয়।
এনইআইআর চালু করার কারণ
মোবাইল সিম বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধনের পর গত ১ জানুয়ারি থেকে দেশের নেটওয়ার্কে বৈধ-অবৈধ সব মোবাইল হ্যান্ডসেট যুক্ত করার জন্য এনইআইআর বা ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। যদিও আগামী তিন মাস গ্রে মার্কেটের মাধ্যমে আসা মোবাইল হ্যান্ডসেটের নেটওয়ার্ক বন্ধ না করার কথা জানিয়েছে মোবাইল টেলিকম খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি। অবৈধ পথে মোবাইল বিক্রি বন্ধ, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও ডিজিটাল প্রতারণা কমানোসহ কয়েকটি বিষয় সামনে রেখে এনইআইআর চালুর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এনইআইআর চালু হলে দেশে যত অবৈধ মোবাইল হ্যান্ডসেট রয়েছে সেগুলো বৈধভাবে দেশের নেটওয়ার্কে সংযুক্ত করতে হবে। এতে বড় বড় অপরাধের সাথে জড়িতরা সহজেই শনাক্ত হতে পারবেন। এনইআইআর চালু হলে ডিজিটাল প্রতারণা কমবে, অপরাধের মাত্রাও কমে আসবে। তাদের মতে, মোবাইল হ্যান্ডসেট বৈধ নেটওয়ার্কে সংযুক্ত থাকার দরুন অপরাধীদের ভেতরে ধরা খাওয়ার একটি ভয় ঢুকে যেতে পারে। এতে অপরাধীদের ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় অপরাধ করার ক্ষেত্রে বেগ হতে হবে। তা ছাড়া মোবাইল ব্যবসায়ীরাও আনঅফিসিয়াল ওইসব মোবাইল সেট বিক্রি করে যে অতিরিক্ত মুনাফা করত, সেটাও বন্ধ হয়ে যাবে। সরকারের রাজস্ব খাতে বড় অঙ্কের অর্থায়ন হবে।
এনইআইআর চালুর পরে ‘ক্লোন ফোন’ নিয়ে ভয়াবহ তথ্য
দেশের নেটওয়ার্কে বর্তমানে লাখ লাখ ভুয়া আইএমইআই নম্বর রয়েছে বলে তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে। মন্ত্রণালয় বলছে, “১১১১১১১১১১১১১”, “০০০০০০০০০০০০০”, “৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯” এবং এ ধরনের অনুরূপ প্যাটার্নেও আইএমইআই নম্বর রয়েছে। লাখ লাখ নাগরিক এসব নি¤œ মানের নকল ফোন ব্যবহার করছেন। এসব ফোনের রেডিয়েশন টেস্ট, স্পেসিফিক অ্যাবজরশন রেট টেস্টিং (ঝঢ়বপরভরপ অনংড়ৎঢ়ঃরড়হ জধঃব (ঝঅজ) ঞবংঃরহম সহ বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা টেস্ট কখনো হয়নি এমন হ্যান্ডসেট চারটি মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্কে ব্যাপকভাবে সচল রয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, গত ১০ বছরে শুধু একটি আইএমইআই নম্বর ৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯ এ পাওয়া গেছে ৩ কোটি ৯১ লাখ ২২ হাজার ৫৩৪টি। শীর্ষ কিছু আইএমইআই নম্বরের একটা তালিকানুযায়ী, সাড়ে ১৯ লাখ ডিভাইসের আইএমইআই নম্বর হচ্ছে ৪৪০০১৫২০২০০০; যেগুলো ডুপ্লিকেট হিসেবে আনা হয়েছে। এভাবে- ৩৫২২৭৩০১৭৩৮৬৩৪ নম্বরে সাড়ে ১৭ লাখ, ৩৫২৭৫১০১৯৫২৩২৬ নম্বরে সোয়া ১৫ লাখ, শুধু ১ ডিজিটের শূন্য আইএমইআই নম্বরে আছে ৫ লাখ ৮৬ হাজার ৩৩১টি। এরকম ১ লাখেরও বেশি নেটওয়ার্কে সচল আছে যেগুলো ফেক এবং ডুপ্লিকেট আইএমইআই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদন মতে, ৭৩ শতাংশ ডিজিটাল জালিয়াতি ঘটে অনিবন্ধিত ডিভাইসে। বিটিআরসি ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ব-কণঈ জালিয়াতির ৮৫ শতাংশ ঘটেছিল অবৈধ ফোন, কিংবা পুনঃপ্রোগ্রাম করা হ্যান্ডসেট ব্যবহার করে। ২০২৩ সালে ১.৮ লাখ ফোন চুরির রিপোর্ট হয় যার বেশির ভাগই উদ্ধার করা যায়নি। আর রিপোর্ট হয়নি এমন মোবাইল ফোনের সংখ্যা আছে আরো কয়েক লাখ।
এ প্রসঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজির অধ্যাপক মো: ফজলুল করিম পাটোয়ারী নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশে গ্রে মার্কেটটা মূলত শুরু হয় যখন চায়না থেকে কম দামে মোবাইল আসা শুরু হয়েছে। এখন ঘরে ঘরে মোবাইল। ব্যবসায়ীরা বেশি মুনাফা পাওয়ার জন্য তখন আনঅফিসিয়ালি বেশি মোবাইল ফোন বিক্রি করেছে। সরকারও তখন এর ভয়াবহতা বুঝতে পারেনি। যখন এর মাধ্যমে ডিজিটাল প্রতারণা বেড়েছে, যখন নাগরিক জীবনের নিরাপত্তার প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে তখন সরকার বিষয়টা অনুধাবন করতে পেরেছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এক আইএমইআই নম্বর দিয়ে রয়েছে লাখ লাখ মোবাইল। তবে গ্রে মার্কেটে বিক্রি হওয়া মোবাইলগুলো একবারে সব বন্ধ করা ঠিক হবে না। কারণ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ব্যক্তি পর্যায়ে ক্ষোভ সৃষ্টি হবে। তবে নিয়ন্ত্রণে আনতে অবশ্যই পদক্ষেপ নিতে হবে। এনইআইআর পদ্ধতি চালু করলে সাধারণ মানুষের কী লাভ, কী কী সুবিধা তারা পাবে এটা সরকারের তরফ থেকে স্পষ্ট করতে হবে। তাহলে সাধারণ মানুষ রেজিস্ট্রেশন করতে উৎসাহিত হবে।
এ প্রসঙ্গে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব সম্প্রতি বলেছেন, আমরা অনুমান করেছি যে, ক্লোন ও নকল ফোনের ছড়াছড়ি আছে, তবে বুঝতে পারিনি ভয়াবহতা এতটা গভীর। বাংলাদেশের নাগরিকদের কাছে এভাবে আন-অফিশিয়াল নতুন ফোনের নামে নকল ফোন বিক্রি করা হয়েছে, এমন প্রতারণা অভাবনীয় ও নজিরবিহীন। এই চক্রের লাগাম টানা জরুরি। তিনি আরো বলেন, এনইআইআর পদ্ধতি চালু হয়েছে। তবে এই পর্যায়ে আমরা এসব আইএমইআই ব্লক করছি না। জনজীবনে অসুবিধা সৃষ্টি হয় এমন কোনো পদক্ষেপে সরকার যাবে না। এসব ফোন বন্ধ করা হবে না, গ্রে হিসেবে আপাতত ট্যাগ করা হবে।



