রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মধ্যে খেলাপি ঋণ আদায়ের শীর্ষে রূপালী

শীর্ষ ২০ খেলাপি থেকে রেকর্ড আদায়

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ডলার সঙ্কট, আমদানিনির্ভরতা ও খেলাপি ঋণের চাপে দেশের ব্যাংকিং খাত যখন কঠিন সময় পার করছে, তখন রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক পিএলসি দক্ষ নেতৃত্ব ও কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলার মাধ্যমে ইতিবাচক অগ্রযাত্রার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সময়োপযোগী সিদ্ধান্তই এই অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি।

দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খেলাপি ঋণ আদায়, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। এর ফলে ২০২৫ সালে শ্রেণীকৃত ও অবলোপনকৃত ঋণ থেকে ব্যাংকটি এক হাজার ৩০০ কোটি টাকা নগদ আদায় করে, যা রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।

একই বছরে শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি গ্রাহকের কাছ থেকে ৩৬১ কোটি টাকা নগদ আদায় করা হয়। পাশাপাশি সমন্বয়ের মাধ্যমে আদায় হয় আরো এক হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে মোট দুই হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা আদায় রূপালী ব্যাংকের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

খেলাপি ঋণ আদায়ে গতি ও স্বচ্ছতা আনতে মামলা ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনা হয়। প্রধান কার্যালয় থেকে বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে তদারকির ফলে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮২৩টি মামলা নিষ্পত্তি হয়, যেখানে আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৫৭১টি। দ্রুত আইনি সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করতে নিয়োগ দেয়া হয় একজন চিফ লিগ্যাল অ্যাডভাইজার।

এই উদ্যোগগুলোর ফলে ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণের চিত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শ্রেণিকৃত ঋণ এক হাজার ৭১৬ কোটি টাকা কমে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৬৪১ কোটি টাকায়। একই সময়ে শ্রেণিকৃত ঋণের হার ৪২ শতাংশ থেকে কমে ৩৮ শতাংশে নেমে আসে। প্রভিশন ঘাটতিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, যা আর্থিক ভিত শক্তিশালী হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উৎপাদনমুখী ও এসএমই খাতেও ঋণ সম্প্রসারণ করেছে রূপালী ব্যাংক। ২০২৫ সালে এসএমই খাতে নতুন করে এক হাজার ৪৭০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়, যা ব্যাংকের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়নে রূপালী ব্যাংক ট্রেনিং অ্যাকাডেমির মাধ্যমে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে।

ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছে রূপালী ব্যাংক। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রথমবারের মতো নিজস্ব প্রযুক্তিতে পরিচালিত মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ‘রূপালী ক্যাশ’ চালু করা হয়েছে। এই সেবার মাধ্যমে গ্রাহকরা সহজ ও নিরাপদ আর্থিক লেনদেন সুবিধা পাচ্ছেন।

২০২৫ সালে আমানত সংগ্রহ ও গ্রাহকসেবায়ও অগ্রগতি লক্ষ করা গেছে। নতুন করে ৮ লাখ ৪৯ হাজারের বেশি হিসাব খোলা হয়, যা আগের বছরের তুলনায় দুই লাখ ৫০ হাজার বেশি। একই সময়ে ব্যাংকের আমানত বেড়েছে প্রায় তিন হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যার মধ্যে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা সুদবিহীন ও স্বল্প সুদের আমানত।

পর্ষদের দেয়া পরামর্শে ব্যবস্থাপনা পরিচালক কর্তৃক ১০০ দিনের বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে ২০২৫ সালে ছয় হাজার ৫০০ কোটি টাকার নতুন আমানত সংগ্রহ এবং প্রায় চার লাখ নতুন হিসাব খোলা সম্ভব হয়। এতে ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি আরো শক্তিশালী হয়েছে।

রেমিট্যান্স আহরণেও সাফল্য দেখিয়েছে রূপালী ব্যাংক। ২০২৫ সালে ব্যাংকটির মাধ্যমে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক রেমিট্যান্স দেশে এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখ্যযোগ্য অগ্রগতি। এক্সচেঞ্জ হাউজের কার্যক্রম জোরদার, প্রবাসীদের জন্য বিশেষ সেবা এবং ডিজিটাল চ্যানেলের ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে এই অগ্রগতি এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

২০২৫ সালে ব্যাংকের রেগুলেটরি ক্যাপিটাল বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৭০০ কোটি টাকায়, যা আগের বছরের তুলনায় ৫৩ কোটি টাকা বেশি।

সামগ্রিক বিষয়ে রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মো: ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য কেবল তাৎক্ষণিক সাফল্য নয়; বরং ব্যাংককে একটি টেকসই, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা।’ শৃঙ্খলা, জবাবদিহি এবং গ্রাহকসেবার মানোন্নয়নই আমাদের অগ্রযাত্রার মূল ভিত্তি। তিনি আরো বলেন, আর্থিক সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে খেলাপি ঋণ আদায় চলবেই।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দূরদর্শী নেতৃত্ব, কার্যকর তদারকি ও প্রযুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তের ফলে রূপালী ব্যাংক আবারো আস্থার প্রতীকে পরিণত হচ্ছে। এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ব্যাংকটি রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের একটি শক্তিশালী ও উদাহরণযোগ্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে বলে তারা মনে করছেন।