ভারত-ঘনিষ্ঠতায় অস্বস্তিতে চীন

বাংলাদেশে বিনিয়োগে ধীরগতির শঙ্কা

Printed Edition

শাহ আলম নূর

ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার হওয়ায় অস্বস্তি বাড়ছে চীনের, যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিনিয়োগ প্রবাহে এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ীরা। সাম্প্রতিক সময়ে দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়লেও চীনা বিনিয়োগের গতি কিছুটা মন্থর হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বরে নিট এফডিআই দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যেখানে আগের বছর একই সময়ে ছিল মাত্র ৭৮০ মিলিয়ন ডলার। ইকুইটি (নতুন বিনিয়োগ), পুনঃবিনিয়োগ ও আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ প্রতিটি উৎসেই দেখা গেছে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। বিশ্বব্যাপী যেখানে এফডিআই গড়ে ৬ শতাংশ কমেছে, সেখানে বাংলাদেশের এই প্রবৃদ্ধি বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও আগ্রহের প্রতিফলন।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। বেশ কিছু বড় চীনা প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে নতুন অর্থায়ন ও ঋণচুক্তি চূড়ান্ত করতে সময় নিচ্ছে বেইজিং। একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ঘোষিত চীনা বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হার ৬৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, যেখানে ২০২২ সালে তা ছিল প্রায় ৮০ শতাংশ।

এদিকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য ও যোগাযোগ সহযোগিতা বাড়ছে দ্রুতগতিতে। দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। সীমান্ত অবকাঠামো, রেল ও জ্বালানি সংযোগে যৌথ প্রকল্পও এগিয়ে চলছে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, এটি সরাসরি রাজনৈতিক বার্তা না হলেও কৌশলগত চাপের অংশ হতে পারে। বাংলাদেশ এখন ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের জায়গায় আছে। ভারত ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়লে বিনিয়োগ সিদ্ধান্তেও তার প্রতিফলন দেখা যায়। চীন হয়তো অপেক্ষা করছে ঢাকার নীতিগত অবস্থান কতটা স্থিতিশীল থাকে তা দেখার জন্য।

তিনি বলেন, চীনা বিনিয়োগ কমে গেলে স্বল্পমেয়াদে অবকাঠামো খাতে চাপ তৈরি হতে পারে। তবে এটি বাংলাদেশের জন্য সুযোগ বিনিয়োগের উৎস বৈচিত্র্যময় করার।

এদিকে দেশীয় ব্যবসায়ীরা বিষয়টিকে বাস্তবসম্মত দৃষ্টিতে দেখছেন। তৈরী পোশাক ও ভারী শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, চীনা বিনিয়োগ ধীর হলে কিছু প্রকল্পে সময় বাড়তে পারে, তবে ভারতসহ অন্যান্য দেশ থেকে বিকল্প বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ-চায়না চেম্বারের এক ব্যবসায়ী নেতারা মনে করছেন চীনা উদ্যোক্তারা এখন বিনিয়োগের আগে আরো বেশি ঝুঁকি মূল্যায়ন করছেন। রাজনৈতিক বার্তাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এদিকে বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারতের সাথে সংযোগ বাড়ায় লজিস্টিক খরচ কমছে এবং রফতানির নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারে চীন ও ভারতের প্রতিযোগিতা নতুন নয়। তবে বাংলাদেশে এর প্রতিফলন এখন আরো স্পষ্ট। তারা বলছেন, বাংলাদেশ এক দিকে চীনের বড় উন্নয়ন অংশীদার, অন্য দিকে ভারতের সাথে ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর। এই বাস্তবতায় ঢাকার কৌশল হচ্ছে দুই পক্ষের সাথেই ভারসাম্য বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারতের সাথে সম্পর্ক জোরদার হওয়ায় চীনের অস্বস্তি বিনিয়োগ প্রবাহে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তারা বলছেন, এটি দীর্ঘমেয়াদি সঙ্কট নয়, বরং বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখার একটি পরীক্ষা।