জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা ঘিরে রাজধানীর একাধিক আসনে সহিংসতা ও উত্তেজনা বাড়ছে। ঢাকা-১৮ আসনের পাশাপাশি গতকাল ঢাকা-৮ আসনেও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এনসিপির অভিযোগ, বিএনপির প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের নেতৃত্বে পরিকল্পিতভাবে প্রচারণায় বাধা, হামলা ও ভয়ভীতি সৃষ্টি করা হচ্ছে। এসব ঘটনায় নির্বাচনী মাঠে সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নেই বলে অভিযোগ তুলেছেন এনসিপির নেতাকর্মীরা।
গত দুই দিনে ঢাকা-১৮ আসনে একাধিক সহিংস ঘটনার অভিযোগ উঠেছে। প্রথম ঘটনাটি ঘটে উত্তরার আবদুল্লাহপুর এলাকায়। সেখানে নির্বাচনী প্রচারণার সময় জামায়াতের এক কর্মীর ওপর হামলা চালানো হয়। এতে তার মাথা ফেটে যায় এবং তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসা নিতে হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রচারণার মিছিল চলাকালে হঠাৎ হামলার ঘটনা ঘটে, যা এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। এর পরদিন খিলক্ষেতের বরুয়া এলাকায় এনসিপির নির্বাচনী অফিস উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এনসিপির অভিযোগ, অফিস উদ্বোধনের আগে মব সৃষ্টি করে তাদের কর্মসূচিতে বাধা দেয়া হয়। পরিস্থিতি এমন হয়ে ওঠে যে নির্ধারিত সময়ে অফিস উদ্বোধন করা সম্ভব হয়নি। দলটির নেতারা বলছেন, এটি ছিল তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম বানচাল করার একটি পরিকল্পিত চেষ্টা।
একই দিনে তুরাগ ও নিকুঞ্জ এলাকায় এনসিপির নারী কর্মীদের প্রচারণাতেও বাধা ও হুমকি দেয়ার অভিযোগ উঠে। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, কয়েকটি এলাকায় নারী কর্মীদের পথসভা ও ঘরে ঘরে প্রচারণা চালাতে দেয়া হয়নি। কোথাও কোথাও হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানো হয়। নারী কর্মীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এর আগে নির্বাচনী মিছিল ‘আজাদীর যাত্রা’ কর্মসূচিকেও কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়। এনসিপির অভিযোগ, কর্মসূচি ঘোষণার চার ঘণ্টার মধ্যেই একই স্থানে বিএনপির পক্ষ থেকে পাল্টা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এতে সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ে এবং নির্বাচনী পরিবেশ আরো অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।
এ দিকে সরাসরি হামলার ঘটনা শুরু হয় ঢাকা-১৮ আসনে। গত সোমবার এনসিপির প্রার্থী ও ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদিব একটি এতিমখানা পরিদর্শনে গেলে সেখানে তার ওপর হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এনসিপির দাবি, বিএনপি কর্মী আক্তারের নেতৃত্বে একদল লোক এ হামলা চালায়। এতে প্রার্থীসহ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হন।
এর মধ্যেই গতকাল নতুন করে সহিংসতার অভিযোগ ওঠে বহুল আলোচিত ঢাকা-৮ আসনে। সেখানে এনসিপির প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। রাজধানীর শান্তিনগরের হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে এ হামলার ঘটনা ঘটে।
প্রতিষ্ঠানটির পিঠা উৎসবে অংশ নিতে গেলে একদল শিক্ষার্থী ‘ধানের শীষ’ স্লোগান দিয়ে তার ওপর হামলা চালায় বলে দাবি করেছেন তার প্রচার দলের কর্মীরা। গতকাল বেলা ১২টার পর এ ঘটনা ঘটে বলে জানান নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর প্রচার দলের অন্যতম সদস্য শামিল আব্দুল্লাহ। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনী প্রচারণার সময় একদল ব্যক্তি অতর্কিত হামলা চালায়। এতে প্রার্থী ও তার সাথে থাকা নেতাকর্মীরা আতঙ্কের মধ্যে পড়েন। এ ঘটনায় স্থানীয়ভাবে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
এই ধারাবাহিক ঘটনার পর এনসিপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। এনসিপির এক নেতা বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণভাবে ভোটারদের কাছে যেতে চাই। কিন্তু বারবার হামলা ও বাধার মুখে পড়ছি। এতে ভোটারদের মধ্যেও ভয় তৈরি হচ্ছে।
এনসিপির নেতারা বলছেন, ঢাকা-১৮ ও ঢাকা-৮ দু’টি আসনেই একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। তাদের মতে, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং বিরোধী প্রার্থীদের মাঠছাড়া করার একটি ধারাবাহিক কৌশল। একজন নেতা বলেন, যদি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না থাকে, তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন কিভাবে হবে? এসব ঘটনার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, পরিকল্পিতভাবে তাদের নির্বাচনী প্রচারণা বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে।
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক ও ১১ দলীয় জোটের ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী বলেন, নির্বাচনী সহিংসতার মাধ্যমে ভয় সৃষ্টি করে মাঠ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে। তার ভাষায়, “হামলা, হুমকি আর বাধা দিয়ে জনগণের মত প্রকাশ রুদ্ধ করা যাবে না। জনগণ এসবের জবাব দেবে ব্যালটে। ভোটের দিন মানুষ ঠিকই বলে দেবে, তারা কাকে চায়।” তিনি বলেন, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই আমি নির্বাচনে নেমেছি। ঢাকা-৮ আসন শহীদ ওসমান হাদির পবিত্র আসন। এখানে কোনোভাবেই দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির রাজনীতি চলতে দেয়া হবে না।” তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, আসন্ন নির্বাচনে জনগণ ব্যালটের মাধ্যমে সন্ত্রাস ও দখলদারির সমুচিত জবাব দেবে।
পদপ্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী বলেন, নির্বাচনী সহিংসতার মাধ্যমে ভয় সৃষ্টি করে মাঠ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে। হামলা, হুমকি আর বাধা দিয়ে জনগণের মতপ্রকাশ রুদ্ধ করা যাবে না। জনগণ এসবের জবাব দেবে ব্যালটে। ভোটের দিন মানুষ ঠিকই বলে দেবে, তারা কাকে চায়।”
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে পাটওয়ারী বলেন, আগে সিদ্ধান্ত নিন দলে সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেবেন নাকি বহিষ্কার করবেন। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙের দায়ে মির্জা আব্বাসকে অবিলম্বে বহিষ্কার করা উচিত।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ম্যাডাম আমাদের দোয়া করেছিলেন, বলেছিলেন বাংলাদেশটা ঠিক রাখিও। আজ যদি তিনি সুস্থ থাকতেন, তবে বিএনপি ও ছাত্রদলের এই কর্মকা- দেখে তিনিও লজ্জা পেতেন।
নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, আমাদের খালি মাঠে ছেড়ে দেয়া হয়েছে, কোনো নিরাপত্তা নেই। কমিশন একপাক্ষিক আচরণ করছে। ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিক প্রার্থীদের মনোনয়ন বৈধ করে তারা আগেই গোল দিয়ে রেখেছে। তিনি বলেন, আমরা গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনাকে হটিয়েছি। ভয় দেখিয়ে আমাদের থামানো যাবে না। হয় আমরা থাকব, না হয় সন্ত্রাসীরা থাকবে।
দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয় এ হামলায় শাহিন আহমেদ খান, আশিকুর রহমান, জাকির মাহমুদসহ অন্তত ১৫ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন, যারা বর্তমানে চিকিৎসাধীন।
এনসিপির আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনের জোটের প্রার্থী নাহিদ ইসলাম বলেন, ঢাকা-৮ ও ঢাকা-১৮সহ সারা দেশে আমাদের প্রার্থীদের ওপর হামলা হচ্ছে। নারী কর্মীরাও টার্গেট হচ্ছেন। এটা প্রমাণ করে মাঠে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আঘাত এলে পাল্টা জবাব আসবে। আমরা মুখোমুখি সঙ্ঘাত চাই না, কিন্তু দমননীতি চলতে দিলে পরিণতি ভালো হবে না।
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, “রাজনীতি মানে কথার লড়াই। জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে কে গ্যাংস্টার আর কে জনগণের পক্ষে। কিন্তু জনগণকে সিদ্ধান্ত নিতে না দিয়ে হামলা চালানো হচ্ছে।” তিনি অভিযোগ করেন, ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ জোটের জনপ্রিয়তায় ভীত হয়েই প্রতিপক্ষ সহিংসতার পথ বেছে নিয়েছে।
নারী কর্মীদের ওপর বাধা ও হুমকির বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে এনসিপির যুগ্ম মুখ্য আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, “নারীদের মাঠে নামতে বাধা দেয়া মানে গণতন্ত্রকে সঙ্কুচিত করা। আমরা ভয় পাব না। নারীরাও রাজনীতিতে থাকবে, প্রচারণায় থাকবে, ভোটারদের কাছে যাবে।” তিনি বলেন, এসব ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। নির্বাচনী প্রচারণায় সবার সমান অধিকার থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে আমরা তা পাচ্ছি না। বরং আমাদের প্রার্থীদের ওপর নিয়মিত হামলা হচ্ছে। প্রশাসনকে আরো সক্রিয় ও নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখতে হবে না হলে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা থাকবে না।”
অন্য দিকে বিএনপির পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। দলের স্থানীয় নেতারা বলছেন, তারা শান্তিপূর্ণ প্রচারণায় বিশ্বাস করেন এবং সহিংসতার রাজনীতিতে জড়িত নন। তারা বলছেন, কোনো সহিংসতা তারা সমর্থন করেন না এবং এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত।



