ইনুর মানবতাবিরোধী অপরাধের রায় ৩০ জুন

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার রায় জানা যাবে আগামী ৩০ জুন।

গতকাল সোমবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই দিন নির্ধারণ করেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা এ মামলায় হাসানুল হক ইনু একমাত্র আসামি। এর আগে গত ১৪ মে এই মামলার উভয় পক্ষের আইনি যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হওয়ার পর মামলাটি রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয়েছিল।

সোমবার আদালতের কার্যক্রম শুরু হলে প্রসিকিউশনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন- প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম ও ফারুক আহাম্মদ। মামলার রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণের পর ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। তিনি বলেন, অভিযুক্ত হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে মূলত ‘সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটি’ বা ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায় চাপানো হয়েছে। তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে নীতিগত বৈঠক করা, আন্দোলন দমনে বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত দেয়া এবং তাদের যৌথ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে কুষ্টিয়াসহ সারা বাংলাদেশে ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যার আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তার ওপর বর্তায়।

চিফ প্রসিকিউটর আরো জানান, প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে এই মামলায় মোট ১০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-প্রমাণ আদালতে সফলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সাক্ষীদের জবানবন্দীতে অভিযুক্ত হাসানুল হক ইনুর সরাসরি অপরাধমূলক সংশ্লিষ্টতা আদালতে প্রমাণিত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। রায় নিয়ে প্রসিকিউশনের প্রত্যাশার কথা ব্যক্ত করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আমাদের জোরালো প্রত্যাশা হলো- আইন অনুযায়ী অভিযুক্তের অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে আদালত যেন তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেন।’

আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র অনুযায়ী, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দলীয় ক্যাডারদের গুলিতে ছয়জনকে হত্যাসহ আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ইনুর বিরুদ্ধে এই মামলাটি দায়ের করে প্রসিকিউশন। কুষ্টিয়ায় নিহতদের মধ্যে রয়েছেন- শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম ও সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন ও উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী এবং চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ। স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট রাজধানীর উত্তরা থেকে হাসানুল হক ইনুকে গ্রেফতার করে পুলিশ এবং পরবর্তীতে গত বছরের ২ নভেম্বর তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (চার্জ) গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।

প্রসিকিউশন সূত্রে জানা যায়, হাসানুল হক ইনু বিগত ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে শেখ হাসিনার সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করতেন। তিনি সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও নিজের দলীয় ক্যাডার বাহিনীকে আন্দোলন দমনের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। অপরাধের প্রমাণ হিসেবে ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনা ও হাসানুল হক ইনুর মধ্যকার অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি ফোনালাপের ট্রান্সক্রিপ্ট ও অডিও ল্যাবরেটরি বিশেষজ্ঞের মতামতসহ ট্রাইব্যুনাল-২-এ দাখিল করা হয়েছে। এ ছাড়া ভারতের ‘মিরর নাউ’ অনলাইন পোর্টাল ও দেশের বেসরকারি টেলিভিশন ‘নিউজ ২৪’সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ‘দেখামাত্র গুলি’ (শুট অন সাইট) করার বিষয়ে তার দেয়া উসকানিমূলক সাক্ষাৎকারগুলোকেও আনুষ্ঠানিক অভিযোগে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, আন্দোলনকারীদের ওপর ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করে নজরদারি চালানো, ছত্রীসেনা নামিয়ে বোমাবর্ষণ ও গুলি করার নির্দেশনার সাথে ইনু সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। দাখিলকৃত ফোনালাপের বিবরণ অনুযায়ী, আন্দোলনকে নির্মমভাবে দমনের উদ্দেশ্যে আন্দোলনকারীদের ‘জঙ্গি’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে কার্ড খেলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল এবং প্রচার করা হয়েছিল যে তারা জঙ্গি আক্রমণে মারা গেছে। এ ছাড়া প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল বিএনপি ও ছাত্রশিবিরকে ধ্বংস করার নীলনকশা এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের (যেমন- জোনায়েদ সাকী ও সাইফুল হক) কৌশলে নিজেদের পক্ষে টানার ষড়যন্ত্রেও তার পূর্ণ সমর্থন ও উসকানি ছিল বলে প্রসিকিউশন প্রমাণাদি দাখিল করেছে।