আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিশিষ্ট ব্যাংকার মো: রাফাত উল্লাখান বলেছেন, এসএমই খাতই দেশের অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ শক্তিকে ধারণ করে রেখেছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস, স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে সিএমএসএমই খাতের অবদান অপরিসীম। নয়া দিগন্তকে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন। নিচে তার সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত-
নয়া দিগন্ত : বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্পায়নের ক্ষেত্রে সিএমএসএমই খাতের বর্তমান অবদানকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন?
রাফাত উল্লাহ খান : বাংলাদেশের অর্থনীতিকে যদি একটি বিশাল বৃক্ষের সাথে তুলনা করি, তাহলে সিএমএসএমই খাত হলো সেই বৃক্ষের শিকড়। এই খাতই দেশের অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ শক্তিকে ধারণ করে রেখেছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস, স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে সিএমএসএমই খাতের অবদান অপরিসীম। বিশেষ করে নারী, তরুণ এবং প্রথম প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের জন্য এই খাত বাস্তব সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তাই আমি সিএমএসএমইকে শুধু একটি অর্থনৈতিক খাত নয়, বরং বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করি।
নয়া দিগন্ত : বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শিল্পোদ্যোক্তা সৃষ্টিতে সিএমএসএমই খাতকে কেন সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম বলা হয়?
রাফাত উল্লাহ খান : ইতিহাস বলে, বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই ছোট উদ্যোগ হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল। সিএমএসএমই খাত একজন উদ্যোক্তাকে বাজার বুঝতে, ঝুঁকি নিতে, সীমিত সম্পদ দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে শেখায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই খাতে ব্যবসা শুরু করতে সবসময় বড় মূলধনের প্রয়োজন হয় না। তাই আমি মনে করি, আগামী দিনের শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়িক নেতারা এই খাত থেকেই উঠে আসবেন।
নয়া দিগন্ত : নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
রাফাত উল্লাহ খান : বর্তমানে ব্যাংকের ভূমিকা শুধু অর্থায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ব্যাংক এখন উদ্যোক্তাদের উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে কাজ করছে। নতুন উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিকল্পনা মূল্যায়ন, সঠিক অর্থায়ন কাঠামো নির্বাচন, আর্থিক শৃঙ্খলা বিষয়ে পরামর্শ প্রদান এবং ব্যবসার বিভিন্ন পর্যায়ে সহায়তা করা ব্যাংকের দায়িত্বের অংশ হওয়া উচিত। আমরা চাই উদ্যোক্তারা ব্যাংককে শুধু অর্থের উৎস নয় বরং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করুন। নয়া দিগন্ত : আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক কেন সিএমএসএমই খাতকে অগ্রাধিকার দেয়?
মো: রাফাত উল্লাহ খান : ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মূল দর্শন হলো সম্পদের সুষম বণ্টন, উৎপাদনমুখী অর্থায়ন ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন। সিএমএসএমই খাত এই দর্শনের সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। বর্তমানে আমাদের সিএমএসএমই বিনিয়োগ পোর্টফোলিও প্রায় ১০ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা, যা মোট বিনিয়োগের প্রায় ২২ শতাংশ। প্রায় ৯ হাজার উদ্যোক্তা আমাদের সেবা গ্রহণ করছেন। আমরা আগামী কয়েক বছরে এই অংশ ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি।
নয়া দিগন্ত : ভবিষ্যতে কোনো কোনো খাতকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে?
রাফাত উল্লাহ খান : আমরা বিশেষভাবে নারী উদ্যোক্তা, তরুণ উদ্যোক্তা, কৃষিভিত্তিক ব্যবসা, গ্রামীণ উদ্যোগ ও প্রযুক্তিনির্ভর নতুন ব্যবসাগুলোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। পাশাপাশি ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং সহজ অর্থায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে আরো বেশি উদ্যোক্তাকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
নয়া দিগন্ত : নতুন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য কী ধরনের বিশেষ বিনিয়োগ সুবিধা রয়েছে?
রাফাত উল্লাহ খান : উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন ভিন্ন হওয়ায় আমরা বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগ পণ্য চালু করেছি। ‘তিজারা’ সাধারণ সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতবিহীন অর্থায়ন সুবিধা প্রদান করে। ‘নিসা’ বিশেষভাবে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য। এ ছাড়া ‘আত-তাওফিক’ ও ‘আল-আওয়ানা’ বৃহত্তর বিনিয়োগ সুবিধা প্রদান করে। পাশাপাশি ট্রেড ফাইন্যান্স, ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট, ডিজিটাল ব্যাংকিং ও পুনঃঅর্থায়ন সুবিধাও রয়েছে।
নয়া দিগন্ত : জামানত সঙ্কট মোকাবেলায় আপনারা কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?
রাফাত উল্লাহ খান : জামানতসঙ্কট বাংলাদেশের সিএমএসএমই খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক উদ্যোক্তার ব্যবসার সম্ভাবনা থাকলেও পর্যাপ্ত জামানত না থাকায় তারা অর্থায়ন পান না। তাই আমরা ‘তিজারা’ ও ‘নিসা’র মতো জামানতবিহীন বিনিয়োগ পণ্য চালু করেছি। এখানে আমরা উদ্যোক্তার সম্পদের চেয়ে ব্যবসার সম্ভাবনা, নগদপ্রবাহ, অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দিই। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমও ব্যবহার করছি।
নয়া দিগন্ত : নারী উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের ভূমিকা কী?
রাফাত উল্লাহ খান : নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষমতায়ন টেকসই উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে আমাদের নারী উদ্যোক্তা বিনিয়োগ পোর্টফোলিও প্রায় ২০০ কোটি টাকা এবং প্রায় ৯০০ জন নারী উদ্যোক্তা এর সুবিধা পাচ্ছেন। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আমরা ‘নিসা’ ও ‘আল-আওয়ানা’ নামে বিশেষায়িত পণ্য চালু করেছি। বর্তমানে নারীরা প্রযুক্তি, ই-কমার্স, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ, উৎপাদন ও সেবা খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
নয়া দিগন্ত : তরুণ উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়নে কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে?
মো: রাফাত উল্লাহ খান : আমরা শুধু অর্থায়নেই সীমাবদ্ধ নই; উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়নেও গুরুত্ব দিচ্ছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতায় বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে ব্যবসা ব্যবস্থাপনা, আর্থিক পরিকল্পনা, বিপণন কৌশল, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার ও উদ্যোক্তা দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। আমাদের বিশ্বাস, অর্থায়নের পাশাপাশি জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনই দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
নয়া দিগন্ত : গ্রামীণ ও প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে?
রাফাত উল্লাহ খান : বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো অনেকাংশে গ্রামকেন্দ্রিক। তাই আমরা সারাদেশে বিস্তৃত শাখা, উপশাখা, এজেন্ট ব্যাংকিং এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমের মাধ্যমে গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিচ্ছি। কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও স্থানীয় উৎপাদনমুখী কার্যক্রমে আমরা বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে থাকি।
নয়া দিগন্ত : আল-আরাফাহ্ রুরাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের (এআরডিপি) গুরুত্ব কী?
রাফাত উল্লাহ খান : এআরডিপি আমাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগ। এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষি, গবাদিপশু পালন, হাঁস-মুরগি পালন এবং অন্যান্য আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন করা হয়। এর ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন এবং তাদের জীবনমানের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটছে।
নয়া দিগন্ত : কৃষি ও কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগে অর্থায়নের ক্ষেত্রে আপনারা কী ধরনের উদ্যোগ নিয়েছেন?
মো: রাফাত উল্লাহ খান : আমরা কৃষিকে শুধু উৎপাদন নয় বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবসায়িক ভ্যালু চেইন হিসেবে দেখি। তাই কৃষি উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণনসহ পুরো কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অর্থায়ন করছি। এর মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ আয় বৃদ্ধিতে অবদান রাখতে চাই।
নয়া দিগন্ত : ডিজিটাল প্রযুক্তি কিভাবে সিএমএসএমই অর্থায়নকে সহজ করছে?
রাফাত উল্লাহ খান : ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যাংকিং সেবাকে আরো সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ করেছে। ই-কেওয়াইসি, ডিজিটাল ডকুমেন্টেশন, অনলাইন আবেদন ও তথ্যভিত্তিক মূল্যায়নের ফলে উদ্যোক্তাদের সময় ও ব্যয় কমেছে। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা অ্যানালিটিক্সের ব্যবহার সিএমএসএমই অর্থায়নকে আরো কার্যকর করবে।
নয়া দিগন্ত : বাংলা কিউআর, এজেন্ট ব্যাংকিং ও ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম সিএমএসএমই খাতকে কিভাবে সহায়তা করছে?
রাফাত উল্লাহ খান : ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম সিএমএসএমই খাতের জন্য নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে। বাংলা কিউআরের মাধ্যমে দ্রুত ও নিরাপদ লেনদেন সম্ভব হচ্ছে। এজেন্ট ব্যাংকিং গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের ব্যাংকিং সেবা সহজ করেছে। মোবাইল ব্যাংকিং ও ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার ফলে উদ্যোক্তারা দ্রুত লেনদেন, বেতন প্রদান এবং ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব ডিজিটাল লেনদেন উদ্যোক্তাদের একটি আর্থিক ইতিহাস সৃষ্টি করছে, যা ভবিষ্যতে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নয়া দিগন্ত : সিএমএসএমই খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
রাফাত উল্লাহ খান : আমার বিশ্বাস, সিএমএসএমই খাতই বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান ভিত্তি হয়ে থাকবে। সঠিক নীতিগত সহায়তা, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবা এবং উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়নের সমন্বয় ঘটাতে পারলে এই খাত আগামী দিনে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে।



