বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ঘাটতি থেকে যাচ্ছে উদ্বৃত্তে

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য এখন একটি সংক্রমণকালীন ইতিবাচক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। চলতি হিসাবের ঘাটতি প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনা, সামগ্রিক উদ্বৃত্ত এবং রিজার্ভ বৃদ্ধির ফলে স্বল্পমেয়াদে বৈদেশিক খাতে স্থিতিশীলতা দেখা যাচ্ছে। তবে ঋণ পরিশোধের দায়, সেবা খাতের ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং বিনিয়োগ ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-জুন পর্যন্ত সাময়িক পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টস কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় বিগত অর্থবছরে চলতি হিসাব ঘাটতি কমেছে, রফতানি ও প্রবাসী আয়ে প্রবৃদ্ধি ঘটেছে, যদিও আমদানি ব্যয়, সেবা খাতের চাপ এবং ঋণ পরিশোধের দায় এখনো ঝুঁকি তৈরি করছে।

রফতানি আয়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি : ২০২৪-২৫ অর্থবছরে (জুলাই-জুন) পণ্য রফতানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩.৯৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের (২০২৩-২৪) তুলনায় প্রায় ৭.৭ শতাংশ বেশি। শুধু তৈরী পোশাক খাতেই প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮.৯ শতাংশ, আয় দাঁড়িয়েছে ৩৯.৩৫ বিলিয়ন ডলার। তবে নন-আরএমজি খাতের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক কম, যা রফতানিতে একক নির্ভরশীলতার ঝুঁকি বহাল রাখছে।

আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কিন্তু ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা : ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৪.৩৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১.৮ শতাংশ বেশি। যদিও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকার বিভিন্ন ধরনের আমদানি নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নেয়া হলেও এখন তার শিথিলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। খাদ্যশস্য, শিল্পের কাঁচামাল ও জ্বালানি আমদানি বৃদ্ধিই ব্যয়ের বড় কারণ।

সেবা খাতে বড় ঘাটতি : সেবা খাতে ব্যালান্সের নেতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে, ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৫,৪০৫ মিলিয়ন ডলার, যা গত অর্থবছরের তুলনায় বেশি। সেবা খাতের ব্যয় বেড়েছে ১৫.৩ শতাংশ, অন্যদিকে আয় বেড়েছে মাত্র ৭.১ শতাংশ। বিশেষ করে পরিবহন ও ভ্রমণ খাতে বিদেশমুখী অর্থপ্রবাহের চাপ বেশি।

প্রবাসী আয় ঘাটতি কমানোর প্রধান ভরসা : প্রবাসী আয় বা ওয়ার্কার্স রেমিট্যান্স ২৬.৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে দাঁড়িয়েছে ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলার। সামগ্রিকভাবে সেকেন্ডারি ইনকাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০.৯৮ বিলিয়ন ডলার, যা বর্তমান অ্যাকাউন্টের ঘাটতি কমাতে মুখ্য ভূমিকা রাখছে। রেমিট্যান্স আয়ের প্রবৃদ্ধি মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপমুখী কর্মসংস্থানের ইতিবাচক প্রভাব প্রমাণ করছে ।

চলতি হিসাব ঘাটতি থেকে সামান্য উদ্বৃত্তে : সব মিলিয়ে, চলতি হিসাব ভারসাম্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-জুন শেষে দেখা যাচ্ছে ১৪৯ মিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত। অথচ আগের বছর একই সময়ে ঘাটতি ছিল ৬,৬০২ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের মধ্যে প্রায় সম্পূর্ণ ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে মূলত রফতানি ও রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধির কারণে।

বৈদেশিক ঋণ ও আর্থিক হিসাবে মিশ্র চিত্র : আর্থিক হিসাবে অস্থিরতা চোখে পড়ছে। ২০২৩-২৪ সালে যেখানে প্রবাহ ছিল ৪,৪৮৭ মিলিয়ন ডলার, সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩,৯৮০ মিলিয়ন ডলার। নেট বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) কিছুটা বেড়ে হয়েছে ১,৭১২ মিলিয়ন ডলার, তবে পোর্টফোলিও বিনিয়োগ নেতিবাচক অবস্থায় রয়ে গেছে।

ঋণ নির্ভরতা বৃদ্ধি লক্ষ্যণীয় : মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯,০১৩ মিলিয়ন ডলার, যদিও এর পরিশোধ ২৬.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বল্পমেয়াদি ঋণ ও ট্রেড ক্রেডিটে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি আছে, যা ভবিষ্যতে ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

সামগ্রিক ভারসাম্য ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ : সামগ্রিক ভারসাম্য ২০২৩-২৪ সালের ৪,৩০০ মিলিয়ন ডলার ঘাটতি থেকে বেড়ে ২০২৪-২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ৩,৩৯৪ মিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্তে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে হয়েছে ৩১.৭৭ বিলিয়ন ডলার। আমদানি ব্যয়ের সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, রিজার্ভ এখন পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় কভার করতে সক্ষম, যা আগের বছরের তুলনায় অনেক ভালো অবস্থান।

চ্যালেঞ্জ ও নীতি-সঙ্কেত : প্রথমত- সেবা খাতে ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি ও ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ আগামীতে ঝুঁকি তৈরি করবে। দ্বিতীয়ত- রেমিট্যান্স ও তৈরী পোশাক খাতে অতিনির্ভরতার জন্য বৈচিত্র্য আনার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। তৃতীয়ত- বিদেশী বিনিয়োগে আস্থা ঘাটতির কারণে এফডিআই বৃদ্ধির হার সন্তোষজনক নয়, যা দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি সীমিত করতে পারে। চতুর্থত- পণ্য ও সেবার আমদানি নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে আবার ঘাটতি বাড়তে পারে।

এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা মনে করেন- নীতিনির্ধারকদের জন্য এখন মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত-রফতানি বাজারে বৈচিত্র্য আনা, সেবা খাত থেকে আয় বাড়ানো, এফডিআই প্রবাহকে টেকসই করা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় সতর্ক কৌশল অবলম্বন করা। বাংলাদেশ যদি এই পথগুলোতে কার্যকর অগ্রগতি নিশ্চিত করতে পারে, তবে ব্যালান্স অব পেমেন্টসের ইতিবাচক ধারা শুধু সাময়িক নয়, দীর্ঘমেয়াদেও স্থিতিশীলতা আনতে সক্ষম হবে।