মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলায় কৃষিজমিতে সেচসুবিধা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দু’টি স্লুইসগেট এক দশক ধরে অচলাবস্থায় পড়ে আছে। শুকনা মৌসুমে কৃষকের পানির চাহিদা মেটানোর জন্য নির্মিত স্লুইসগেটগুলো এখন উল্টো স্থানীয়দের কাছে ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর উদাসীনতায় কোটি টাকার প্রকল্পটির সুফল পাচ্ছেন না কৃষকরা। ফলে প্রতি বছর তাদের বিকল্প উপায়ে বাঁধ নির্মাণ করে সেচের পানি ধরে রাখতে হয় এবং বাড়তি অর্থ ব্যয় করে পানি কিনে নিতে হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাজনগর উপজেলার উত্তরভাগ ইউনিয়নের বড়দল ও চানভাগ এলাকায় পাহাড়ি ধামাইছড়ার ওপর দু’টি স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পটি উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। এর ব্যয় ছিল তিন কোটি সাত লাখ টাকা। প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল বোরো ও রবি মৌসুমে ফসলিজমিতে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। কিন্তু নির্মাণের পর থেকে একবারের জন্যও কৃষকের কাজে লাগেনি গেট দু’টি।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে বড়দল গ্রামে গিয়ে স্থানীয় কয়েকজন কৃষকের সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। নিয়ামত মিয়া, অলক মিয়া, অনিক দাস, রসুন মিয়া ও বাতির আলী জানান, প্রকল্পটি চালুর পর কৃষকদের নিয়ে একটি সমিতি গঠন করা হয়। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ওই সমিতির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল।
তবে উদ্বোধনের মাত্র ছয় মাস পর, ২০১৬ সালের মে মাসে পাহাড়ি ঢলের তোড়ে বড়দল এলাকার স্লুইসগেটের দক্ষিণ পাড় ভেঙে যায়। অতিবৃষ্টির কারণে পানির চাপে পাশের টিলাও ধসে পড়ে। ফলে গেটের নিচ দিয়ে না গিয়ে পানি নতুন পথ তৈরি করে পাশ দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে।
একই ধরনের ক্ষতি হয় চানভাগ এলাকার গেটটিও। সেখানে পশ্চিম পাড় ভেঙে গিয়ে পানি নতুন গতিপথে বইতে থাকে। এরপর আর কখনো গেট দু’টি সচল করা হয়নি।
কৃষকদের ভাষ্য, নির্মাণের পর এক মৌসুমও এর সুফল পাওয়া যায়নি। বাধ্য হয়ে প্রতি বছর ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা খরচ করে মাটির বাঁধ নির্মাণ করে পানি আটকে ফসল ফলাতে হচ্ছে।
বড়দল গ্রামের কৃষক নিয়ামত মিয়া বলেন, গেট দু’টি দীর্ঘদিন অচল থাকায় পানি সরবরাহের পাইপ চুরি হয়ে গেছে। কপাট বন্ধ থাকায় নিচে পলি জমে গেছে। এখন এগুলো শুধু এমনিতেই পড়ে আছে, কোনো কাজে আসছে না। চানভাগ গ্রামের কুতুব আলী বলেন, তিন কোটি টাকা খরচ করে যে প্রকল্প করা হলো, তা আমাদের কোনো কাজে আসেনি। এখন এটি পরিত্যক্ত স্থাপনার মতো পড়ে আছে অব্যবহৃত অবহেলায়।
এলাকার সাবেক চেয়ারম্যান শাহ্ শাহিদুজ্জামান ছালিক বলেন, কৃষকদের উন্নয়নের কথা বলে প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন এটি তাদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ধামশ্বরী ক্ষুদ্র পানি সম্পদ উন্নয়ন সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালিক বলেন, অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করায় গেট দু’টি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এগুলো মেরামতের জন্য একাধিকবার উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলেও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। তবে রাজনগর উপজেলা প্রকৌশলী মো. আব্দুল গনী বলেন, তিনি নতুন যোগদান করেছেন। সরেজমিন গেট দু’টি পরিদর্শন করেছেন। মেরামতের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করবেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল আমিন বলেন, এ বিষয়ে কৃষকরা তার কাছে আগে কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করেননি। এখন বিষয়টি খতিয়ে দেখে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
রাজনগরে কর্মরত সাবেক এক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, স্থানীয় সমিতি ও সংশ্লিষ্ট দফতরের গাফিলতির কারণেই প্রকল্পটি অচল হয়ে আছে। সমিতির সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল, কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণে ঘাটতি ছিল।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, দ্রুত গেট দু’টি সংস্কার করে চালু করা হলে উত্তরভাগ ইউনিয়নের ভুরভুরির বিল, ফাটাবিল, পশ্চিম চানভাগ, পূর্ব চানভাগ, বড়দল, উত্তরভাগ, হায়পুর ও উদয়রামপুরসহ হাওর এলাকার প্রায় তিন হাজার একর জমিতে কম খরচে সেচ দেয়া সম্ভব হবে। এতে বহু পতিত জমিও আবার চাষের আওতায় আনা যাবে।
তাদের প্রশ্ন, কৃষকের উন্নয়নের নামে নেয়া কোটি টাকার প্রকল্প যদি এক দশকেও কাজে না আসে, তবে এর দায়ভার নেবে কে?



