ইকবাল মজুমদার তৌহিদ
বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নামাজে জানাজা শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ছিল না- এটি পরিণত হয়েছিল ইতিহাসের এক বিস্ময়কর মানবসমুদ্রে। রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত এই জানাজায় সরাসরি অংশ নেন আনুমানিক অর্ধকোটি মানুষ। এ ছাড়া লাখো মানুষ জানাজাস্থলে পৌঁছাতে না পেরে মোবাইল ফোন ও টেলিভিশনের পর্দায় সরাসরি সম্প্রচার দেখে দোয়ায় শামিল হন। বাংলাদেশ তো বটেই, ভারতীয় উপমহাদেশ কিংবা বিশ্ব ইতিহাসেও এমন বিশাল জনসমাগমের জানাজার নজির খুঁজে পাওয়া কঠিন।
এই জানাজায় ‘জনসমুদ্র’ শব্দটিও যেন তার অর্থ হারিয়ে ফেলে। যে দিকেই তাকানো যায়, কেবল মানুষ আর মানুষ। লাখো কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে কান্নাজড়িত দোয়া। কয়েক কিলোমিটারজুড়ে রাস্তা, আশপাশের এলাকা আর আকাশ যেন ভারী হয়ে উঠেছিল শোকের শব্দে। পুরো রাজধানী ঢাকা সেদিন রূপ নিয়েছিল এক শোকস্তব্ধ নগরীতে।
বেলা ৩টা ৩ মিনিটে জানাজা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সকাল থেকেই রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউ এবং এর আশপাশের এলাকা লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে পূর্ণ হয়ে যায়। সময় যত গড়িয়েছে, মানুষের ঢল ততই বেড়েছে। জানাজার ঠিক আগে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড় থেকে জাহাঙ্গীর গেট, মগবাজার ওয়ারলেস গেট, মিরপুর-১০, নিউ মার্কেট থেকে কল্যাণপুর- প্রায় সব প্রধান সড়ক কানায় কানায় মানুষে ভরে ওঠে। এর ফলে মানিক মিয়া এভিনিউ-সংলগ্ন সড়কগুলো কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
দল-মত নির্বিশেষে মানুষের এই শোকাবহ উপস্থিতি প্রমাণ করে, ‘দেশনেত্রী’ উপাধি পাওয়া এই আপসহীন নেত্রী সাধারণ মানুষের হৃদয়ে কতটা গভীর জায়গা করে নিয়েছিলেন। প্রবীণ রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ- সবার কণ্ঠে একই কথা, ‘বাংলাদেশে এমন জানাজা আগে কেউ দেখেনি।’ কারো চোখে অশ্রু, কেউ নীরবে হাত তুলে দোয়া করেছেন, কেউ আবার নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থেকেছেন ইতিহাসের এই মুহূর্তের দিকে।
বগুড়া থেকে জানাজায় অংশ নিতে আসা বৃদ্ধ আলমাস মিয়া বলেন, ‘১৯৮১ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জানাজা দেখেছিলাম। ভেবেছিলাম, বাংলাদেশে আর কখনো এমন দৃশ্য দেখব না। আজ ৪৪ বছর পর তার স্ত্রীর জানাজায় এসে মনে হচ্ছে ইতিহাস যেন আবার ফিরে এসেছে। এমন ভালোবাসা জোর করে আদায় করা যায় না। এটা আল্লাহর দেয়া সম্মান- যাকে তিনি সম্মান দেন, কেউ তাকে অসম্মান করতে পারে না।’
দিনাজপুর থেকে আসা শিক্ষার্থী জাবের হোসাইন নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত নই। বাবার মুখে খালেদা জিয়া ও জিয়াউর রহমানের অনেক গল্প শুনেছি। আওয়ামী লীগের সময় তাকে কারাগারে নেয়া হলে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। আজ তার মৃত্যুর খবর শুনে মন খারাপ হয়েছে। তাই জানাজায় অংশ নিতে এসেছি।’
জানাজায় অংশ নিয়েছেন শুধু বিএনপির নেতাকর্মীরাই নন; ছিলেন সাধারণ চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী, রিকশাচালকসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষ। ভিড়ের চাপে সংসদ ভবন এলাকার গাছ, ফুটপাথ এমনকি আশপাশের ভবনের ছাদেও মানুষের অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। জানাজার ঠিক আগমুহূর্তে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের কান্নাবিজড়িত বক্তব্য এবং পরে তারেক রহমানের মায়ের জন্য দোয়ার আহ্বানে পুরো এলাকা পিনপতন নীরবতায় ডুবে যায়। সেই নীরবতা যেন দেশনেত্রীর বিরহ-বেদনায় ভারী হয়ে উঠেছিল।
বেগম খালেদা জিয়ার এই শেষ বিদায়ে উপস্থিত ছিলেন- বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি ও কূটনীতিকরা। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, পাকিস্তান, জাপান, সৌদি আরবসহ ঢাকাস্থ ৩২টি দেশের কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধিরা জানাজায় অংশ নেন। এর মধ্যে পাকিস্তানের স্পিকার, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ভুটান ও নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের উপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষণীয় ছিল। বিদেশী কূটনীতিকদের জন্য নির্ধারিত স্থান থেকে তারা প্রত্যক্ষ করেন বাংলাদেশের মানুষের এই আবেগঘন বিদায়।
জানাজায় নারীদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। মূল জানাজাস্থলে নারীদের প্রবেশ সীমিত থাকলেও আশপাশের নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে হাজারো নারী অশ্রুসজল চোখে বিদায় জানান খাঁটি দেশপ্রেমিক এই নারী নেত্রীকে। অনেকের হাতে ছিল কালো ব্যাজ, মুখে ছিল গভীর শোকের ছাপ।
বিশ্লেষকদের মতে, বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা কেবল একজন নেত্রীর বিদায় নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় ঘটনা। দীর্ঘ রোগভোগ, কারাবাস ও রাজনৈতিক নিঃসঙ্গতার পরও তার এই বিদায় প্রমাণ করে- ক্ষমতার বাইরে থেকেও একজন নেতা কিভাবে গণমানুষের হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকতে পারেন।
এই জানাজা তাই শুধু শেষ বিদায় নয়- এটি ছিল ইতিহাসের কাছে এক শক্তিশালী সাক্ষ্য।



