টানা বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও সমুদ্রের অস্বাভাবিক জোয়ারে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, পার্বত্য জেলা এবং সিলেট অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। প্রাণ ভয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে ভিড় করছেন। গত পাঁচ-আট দিনে বন্যাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনায় ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন ৩৩ জন এবং এখনো নিখেঁাঁজ রয়েছেন চারজন।
পুলিশ সদর দফতরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যায় প্রায় এক হাজার ৬৭৮ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রাথমিক হিসাবে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য দেশের বিভিন্ন জেলায় তিন হাজার ৩১৩টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে শনিবার পর্যন্ত আশ্রয় নিয়েছেন ১৭ হাজার ৭৪৯ জন।
বন্যা মোকাবেলায় জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, কোস্টগার্ড, আনসার ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। দুর্গত এলাকায় শুকনা খাবার, চাল, নগদ অর্থ, ওষুধ, শিশুখাদ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ করা হচ্ছে। বান্দরবানে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাও ত্রাণ কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বন্যা ও ভূমি ধসে সবচেয়ে বেশি ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে কক্সবাজারের উখিয়ায়। এ ছাড়া লামায় পাঁচজন, চকরিয়ায় চারজন এবং বাঁশখালীতে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। সাতকানিয়া, আনোয়ারা, রাঙ্গুনিয়া, সীতাকুণ্ড, পেকুয়া, মহেশখালী, রাঙামাটি সদর, বাঘাইছড়ি, বিলাইছড়ি, মহালছড়ি, নাইক্ষ্যংছড়ি, রাজনগরসহ বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধস, প্রবল স্রোত ও দুর্ঘটনায় আরো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া, বোয়ালখালী, সাতকানিয়া ও মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে চারজন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
বন্যায় আর্থিক ক্ষতি প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায়। সেখানে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৭৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা। সাতকানিয়ায় ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৫২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এ ছাড়া হাটহাজারী, রাঙ্গুনিয়া, মীরসরাই, সীতাকুণ্ড ও পটিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে।
বন্যায় শুধু কৃষিই নয়, সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার কয়ারবিল-লেমশীখালী সংযোগ সেতু ধসে পড়েছে। রাঙামাটির বাঘাইছড়ি ও রাজস্থলীর বিভিন্ন সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে একটি পাকা সড়ক ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসে গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও পাহাড়ধসে ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে, আবার কোথাও প্রবল স্রোতে ঘরবাড়ি ভেসে গেছে। কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের একাধিক আশ্রয়কেন্দ্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায় সেনাবাহিনী উদ্ধার, খাদ্য বিতরণ ও চিকিৎসাসহ বিভিন্ন সহায়তা দিচ্ছে। অন্য দিকে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা, আকমল আলী রোড, নিউমুরিং, নারিকেলতলা ও নেভি হাসপাতাল গেটসংলগ্ন এলাকায় নৌবাহিনী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং পানিবন্দী মানুষের মাঝে রান্না করা খাবার বিতরণ করছে। স্বাভাবিক পরিস্থিতি না ফেরা পর্যন্ত এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে নৌবাহিনী।
বিজিবি জানিয়েছে, বন্যাদুর্গত বান্দরবান, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, ফেনী, সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও জামালপুরসহ ১১ জেলায় ৯০টি পয়েন্টে সার্বক্ষণিক নজরদারি ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
এ পর্যন্ত বান্দরবানের বিভিন্ন এলাকা থেকে ১১৬ জন পর্যটকসহ ১২২টি পরিবারের ছয় শতাধিক মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া ৪৮ জনকে জরুরি চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়েছে। বান্দরবান-রোয়াংছড়ি সড়কের উপড়ে পড়া গাছ অপসারণ এবং নাইক্ষ্যংছড়ির ঝুঁকিপূর্ণ স্টিল সেতু রক্ষায়ও বিজিবি কাজ করছে। গত ৪ জুলাই বান্দরবানের থানচি উপজেলার অমিয়াখুম ভ্রমণে গিয়ে থুইসাপাড়ায় আটকা পড়েন চার পর্যটক। ৭ জুলাই থেকে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে নদীপথ বন্ধ হয়ে গেলে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
খবর পাওয়ার পর বলিপাড়া ব্যাটালিয়নের (৩৮ বিজিবি) জিন্নাপাড়া ক্যাম্পের একটি বিশেষ দল বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। টানা ৪৮ ঘণ্টার অভিযানের পর ঢাকার সূত্রাপুরের মারুফ উদ্দিন, আবু হুরায়রা জাদিম, তামিম রায়হান সৌরভ এবং শ্যামপুরের মাহাদি আল মাহবুবকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।
বান্দরবান সেক্টর কমান্ডার বলেন, সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও বিজিবির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। দুর্যোগ ও জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধার ও মানবিক সহায়তা দিতে বিজিবি সব সময় প্রস্তুত।
এ দিকে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, বন্যা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে। পানি নেমে যাওয়ার পর কৃষি, সড়ক ও আবাসন খাতের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হবে। ততদিন উদ্ধার, আশ্রয় ও ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষায়ও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।



