বিলিয়ন টাকার ঝুঁকি

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সিদ্ধান্তে তাৎক্ষণিক পর্যালোচনার দাবি

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সিদ্ধান্তে তাৎক্ষণিক পর্যালোচনা বিলিয়ন টাকার ঝুঁকি দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একাধিক ইসলামী ব্যাংকের একীভূতকরণের মাধ্যমে এই ব্যাংকের কার্যক্রম শুরুর প্রক্রিয়া এখন শেষ পর্যায়ে। আর এই রূপান্তরের কেন্দ্রে রয়েছে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত- নতুন কোর ব্যাংকিং সিস্টেম (সিবিএস) নির্বাচন। এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি সফটওয়্যার কেনা নয়; এটি আগামী দুই দশকের জন্য ব্যাংকের হিসাবরক্ষণ, শরিয়াহভিত্তিক মুনাফা গণনা, সাইবার নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রক রিপোর্টিং এবং ব্যয়ের কাঠামো নির্ধারণ করবে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সিদ্ধান্তে তাৎক্ষণিক পর্যালোচনা বিলিয়ন টাকার ঝুঁকি দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একাধিক ইসলামী ব্যাংকের একীভূতকরণের মাধ্যমে এই ব্যাংকের কার্যক্রম শুরুর প্রক্রিয়া এখন শেষ পর্যায়ে। আর এই রূপান্তরের কেন্দ্রে রয়েছে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত- নতুন কোর ব্যাংকিং সিস্টেম (সিবিএস) নির্বাচন। এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি সফটওয়্যার কেনা নয়; এটি আগামী দুই দশকের জন্য ব্যাংকের হিসাবরক্ষণ, শরিয়াহভিত্তিক মুনাফা গণনা, সাইবার নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রক রিপোর্টিং এবং ব্যয়ের কাঠামো নির্ধারণ করবে।

খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা তাই এর অনুমোদনের আগে একটি স্বাধীন, কাঠামোবদ্ধ ও নথিভুক্ত পর্যালোচনার দাবি তুলেছেন। তাদের ভাষায়, ‘এ ধরনের অবকাঠামোগত সিদ্ধান্ত একবার কার্যকর হলে তা ফিরিয়ে নেয়া প্রায় অসম্ভব- প্রযুক্তিগতভাবে জটিল ও আর্থিকভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল।’

কেন এত গুরুত্ব?

কোর ব্যাংকিং সিস্টেম মূলত একটি ব্যাংকের ‘ডিজিটাল মেরুদণ্ড’। গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে শুরু করে লেনদেন, মুনাফা বণ্টন, ঋণ ব্যবস্থাপনা, অডিট, নিয়ন্ত্রক রিপোর্ট- সব কিছুই এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে ভুল সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে অপারেশনাল ঝুঁকি, আর্থিক দায় ও সুনামহানির কারণ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, সেটির প্রভাব কমপক্ষে ১০-২০ বছর স্থায়ী হবে।

প্রধান উদ্বেগগুলো

১. দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়ের অস্বচ্ছতা : বৈশ্বিক অনেক সিবিএস প্ল্যাটফর্মের লাইসেন্স, রক্ষণাবেক্ষণ ও আপগ্রেড ফি বিদেশী মুদ্রায় (ডলার বা ইউরো) নির্ধারিত। শুরুতে খরচ কম মনে হলেও ১০ বছরের ব্যবধানে রক্ষণাবেক্ষণ ও সাবস্ক্রিপশন ফি বিশাল অঙ্কে পৌঁছাতে পারে। ডলার-টাকার বিনিময় হার বৃদ্ধি পেলে সামগ্রিক ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

২. বৈদেশিক মুদ্রা ঝুঁঁকি : দেশে যখন বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা জাতীয় অগ্রাধিকার, তখন বড় অঙ্কের ডলারনির্ভর প্রযুক্তি চুক্তি নেয়ার আগে স্ট্রেস টেস্ট অপরিহার্য। অর্থনীতিবিদদের মতে, ‘একটি ব্যাংকের প্রযুক্তি ব্যয় যদি দীর্ঘমেয়াদে ডলার-লিঙ্কড হয়, তাহলে তা পুরো ব্যালেন্স শিটে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।’

৩. ৩. মাল্টি-ব্যাংক লাইভ মাইগ্রেশন ঝুঁকি : একাধিক ইসলামী ব্যাংকের তথ্য একত্র করে একটি লাইভ সিস্টেমে স্থানান্তর অত্যন্ত জটিল। এতে গ্রাহকের পরিচয় সমন্বয়; শরিয়াহ পণ্য কাঠামোর সামঞ্জস্য; লেজার ব্যালান্স মেলানো; নিয়ন্ত্রক রিপোর্টিংয়ের একীকরণ- সব কিছু নিখুঁতভাবে না হলে লেনদেন বিভ্রাট বা ডেটা ত্রুটি দেখা দিতে পারে।

৪. প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ইন্টিগ্রেশনে স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের যাচাই অপরিহার্য।

৫. সুশাসন ও ফিডিউশিয়ারি দায়িত্ব

৬. যেহেতু এখানে কোটি কোটি গ্রাহকের আমানত জড়িত, তাই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ওপর রয়েছে বিশেষ দায়িত্ব। বিশেষজ্ঞরা চারটি বিষয় অবিলম্বে নিশ্চিত করার কথা বলছেন- নথিভুক্ত ১০ বছরের মোট মালিকানা খরচ (টিসিও) বিশ্লেষণ; ফরেক্স স্ট্রেস মডেলিং; স্বাধীন প্রযুক্তিগত ডিউ ডিলিজেন্স ও স্বচ্ছ মূল্যায়ন ও সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার প্রকাশ।

৭. তাদের বক্তব্য, বিষয়টি কোনো নির্দিষ্ট ভেন্ডরকে বেছে নেয়া বা বাদ দেয়ার প্রশ্ন নয়। মূল প্রশ্ন হলো- এত বড় সিদ্ধান্ত কি যথাযথ, স্বাধীন ও প্রমাণভিত্তিক মূল্যায়ন ছাড়া নেয়া উচিত?

৮. সিদ্ধান্তে তাড়াহুড়ো না সতর্কতা?

৯. ব্যাংকিং অবকাঠামোর মতো দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে ‘থামা মানে বাধা’ নয়; বরং সেটি বিচক্ষণতা।

১০. যদি একটি ভুল সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে বিলিয়ন টাকার দায় তৈরি করে, তাহলে আজকের একটি অতিরিক্ত পর্যালোচনা পুরো ব্যবস্থাকে বড় ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারে।

১১. খাত সংশ্লিষ্টদের ভাষায়, ‘এটি শুধু প্রযুক্তি নির্বাচন নয়, আমানতকারীর আস্থা রক্ষার প্রশ্ন।’

১২. ফলে এখন দেখার বিষয়- চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে কি সত্যিই একটি স্বাধীন ও কাঠামোবদ্ধ পর্যালোচনার পথে হাঁটবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, নাকি তাড়াহুড়ো সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে।