ইরান যুদ্ধে বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থায়ী রূপান্তর

নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ

Printed Edition

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের সঙ্ঘাত অবসানে একটি প্রাথমিক সমঝোতার ঘোষণা এলেও বিশ্ব অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত সহজে শুকোচ্ছে না। আগামীকাল শুক্রবার জেনেভায় একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের কথা রয়েছে, যা পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে একটি বিস্তৃত চুক্তির পথ তৈরি করতে পারে। এই পদক্ষেপের ফলে জ্বালানি সরবরাহ এবং স্থবির হয়ে পড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কিছুটা স্বস্তি ফেরার আশা থাকলেও বিশ্লেষকদের ধারণা, যুদ্ধ-পূর্ববর্তী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় ফিরে যাওয়া এখন আর সম্ভব নয়। বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্দরমিত গিলের মতে, বছরের শুরুতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক মনে হলেও এই যুদ্ধ সবকিছু ওলটপালট করে দিয়েছে। বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে চলতি বছরের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ২০২৫ সালের ২.৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২.৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। একই সাথে মূল্যস্ফীতির পারদ ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমানোর অবস্থান থেকে সরে এসে তা আরো বাড়ানোর কথা ভাবছে, যা ঋণনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোকে চরম সঙ্কটে ফেলবে।

এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে বৈশ্বিক জ্বালানি খাতে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও গ্যাস সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়েছে, যা দেশগুলোকে বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য করেছে। ফলস্বরূপ, সৌর, বায়ু এবং পারমাণবিক শক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকেছে অনেক রাষ্ট্র। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘এম্বারে’র বিশেষজ্ঞ ড্যান ওয়াল্টার একে একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, যে খাতটি পাঁচ বছর আগেও বাজারে টিকে থাকার লড়াই চালাচ্ছিল, তা এখন স্পষ্টতই অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও সস্তা হয়ে উঠেছে। তবে এই পরিস্থিতি জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলোর সমীকরণও বদলে দিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ওপেক প্লাস জোট ছাড়ার মতো বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বিপরীতে সৌদির সাথে রাশিয়ার সম্পর্ক আরো জোরালো হয়েছে। পাশাপাশি ব্রাজিল, ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া, আর্জেন্টিনা ও গায়ানার মতো দেশগুলো নিজেদের তেল উৎপাদন বাড়ানোর তৎপরতা শুরু করেছে। উড ম্যাকেঞ্জির বিশ্লেষকদের মতে, উইন্ড টারবাইন, সোলার প্যানেল, ব্যাটারি ও আধুনিক বিদ্যুৎ প্রযুক্তিতে অনেক এগিয়ে থাকায় এই পুরো পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় একচেটিয়া সুবিধাভোগী বা বিজয়ী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে চীন।

বাণিজ্যিক দিক থেকে আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ। পারস্য উপসাগরের ভূরাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল হরমুজ প্রণালী দিয়ে আগের মতো নিরাপদ ও অবাধে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করবে কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মরিস অবস্টফেল্ড শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এই প্রণালীটি হয়তো আর কখনোই আগের মতো অবাধ ও নিশ্চিত যাতায়াতের চেনা অবস্থায় ফিরবে না। তা ছাড়া যুদ্ধ চলাকালীন ইরানের হামলায় কাতারের গ্যাসক্ষেত্র, সৌদির পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্স এবং আমিরাতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বড় ধাক্কা খেয়েছে, যা ওই অঞ্চলের বিনিয়োগকারী ও পর্যটকদের আস্থা পুরোপুরি নাড়িয়ে দিয়েছে। এই সামগ্রিক পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে এশিয়ার অর্থনীতিগুলো।