গাজী নজরুলকে সংসদীয় কমিটিতে রাখা নিয়ে বিতর্ক, আপত্তিতে বাদ

Printed Edition

সংসদ প্রতিবেদক

বিরোধী দল থেকে (জামায়াতে ইসলামী) বহিষ্কৃত সংসদ সদস্য জি এম নজরুল ইসলামকে সংসদীয় কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে জাতীয় সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে বিতর্ক হয়েছে। তাকে কমিটিতে রাখার প্রশ্নে বিরোধী দলের নৈতিক আপত্তির মুখে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ ও সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকার বিষয়টি সামনে আনেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। পাল্টা জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান বলেন, দল থেকে বহিষ্কৃত একজন এমপিকে সংসদীয় কমিটিতে না রাখাই নৈতিকভাবে সঙ্গত।

শেষ পর্যন্ত বিরোধীদলীয় নেতার ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিয়ে জি এম নজরুল ইসলামকে ‘সরকারি প্রতিশ্রুতি সম্পর্কিত কমিটি’ থেকে বাদ দিয়ে কমিটি পুনর্গঠনের প্রস্তাব দেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।

গতকাল সোমবার ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এ নিয়ে তুমুল বিতর্ক হয়।

আলোচনায় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, জি এম নজরুল ইসলাম এর আগে কয়েকটি স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। বিরোধীদলীয় নেতার চিঠি ও অনুরোধের পর তাকে সেসব কমিটি থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। তবে একজন সংসদ সদস্যের পদ বহাল থাকা অবস্থায় সংসদীয় কার্যক্রমে অংশ নেয়ার সুযোগ দেয়া স্পিকারের দায়িত্ব।

তিনি বলেন, বিরোধী দল বা সরকারি দলের বাইরের কোনো কমিটিতে তাকে রাখা সম্ভব না হওয়ায় এবং গুরুত্বপূর্ণ দু’টি কমিটি থেকে বাদ দেয়ার পর তাকে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ একটি কমিটিতে রাখা হয়েছে। ওই কমিটি বছরে এক-দুবার বসে। তবে বিরোধী দলের আপত্তি থাকলে জি এম নজরুল ইসলামের নাম কমিটি থেকে বাদ দিতে সরকারি দলের কোনো দ্বিধা নেই। তাকে বিরোধী দলের কোটা থেকেও সদস্য হিসেবে রাখার প্রস্তাব হয়নি বলেও জানান চিফ হুইপ।

এরপর বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, জি এম নজরুল ইসলামকে বিরোধী দলের কোটা থেকে সংসদীয় কমিটিতে দেয়া হয়নি- বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্যই তারা জানতে চেয়েছিলেন।

তিনি বলেন, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে জি এম নজরুল ইসলামকে কোনো কমিটির জন্য প্রস্তাব করা হয়নি। নৈতিক কারণে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাই জাতীয় সংসদের মতো মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কোনো কমিটিতে তাকে না রাখাই সঙ্গত ও নৈতিক ছিল।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, যেহেতু সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ রয়েছে, তাই জি এম নজরুল ইসলামকে কমিটি থেকে বাদ দেয়া হলে তা একটি ভালো দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

এরপর স্পিকারের অনুমতি নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, সংবিধান অনুযায়ী শুধু দল থেকে বহিষ্কার করলেই কোনো সংসদ সদস্যের পদ শূন্য হয় না। সংশ্লিষ্ট সদস্য নিজে পদত্যাগ না করলে তার সদস্যপদ বহাল থাকে। এ ক্ষেত্রে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদও সরাসরি প্রযোজ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জি এম নজরুল ইসলাম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দেয়া থেকে বিরত ছিলেন। এ কারণে বিরোধী দল সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বিষয়টি উল্লেখ করে স্পিকার বা নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিলে তার সংসদীয় আসন শূন্য হতে পারে।

তবে বিরোধী দলের আপত্তির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এবং বিরোধীদলীয় নেতার প্রতি সম্মান জানিয়ে জি এম নজরুল ইসলামকে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটি থেকে বাদ দিতে সরকারের কোনো আপত্তি নেই বলেও জানান তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে কিছুটা হাস্যরসের সাথে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, দুর্বল মানুষকে জব্দ করতে গ্রামে যেমন মেম্বার নির্বাচনে দাঁড় করিয়ে দেয়ার কথা প্রচলিত আছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও মাঝে মধ্যে সংসদকে প্রাণবন্ত রাখতে এমন কিছু ‘টিপস’ দেন।

তিনি বলেন, জি এম নজরুল ইসলামকে এরই মধ্যে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাই তিনি দলের সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করে ফ্লোর ক্রসিং করেছেন- এ কথা নতুন করে বলার সুযোগ নেই। তবে নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাকে সংসদীয় কমিটিতে না রাখার যে আবেদন জানানো হয়েছে, তা বিবেচনায় নেয়ায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ।

পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবার ফ্লোর নিয়ে বলেন, বিরোধী দলের অবস্থান থেকে স্পষ্ট যে তারা জি এম নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ বহাল রাখতে চান, তবে তাকে কোনো সংসদীয় কমিটিতে রাখতে চান না।

তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, সংবিধান অনুযায়ী জি এম নজরুল ইসলাম এখনো বৈধ সংসদ সদস্য। বিরোধী দল ৭০ অনুচ্ছেদের অধীনে কোনো পদক্ষেপ না নিলে তার সদস্যপদ বহাল থাকবে। তবে বিরোধীদলীয় নেতার সম্মান ও ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাকে প্রস্তাবিত কমিটি থেকে বাদ দেয়া হচ্ছে।

বিতর্কের শেষ পর্যায়ে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি আবারো বক্তব্য দেন। সব সংসদ সদস্যের প্রতি সম্মান এবং বিরোধীদলীয় নেতার ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে ‘সরকারি প্রতিশ্রুতি সম্পর্কিত কমিটি’ পুনর্গঠনের প্রস্তাব করেন তিনি।