- পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের হামলা
- পশ্চিম তীর দখলের প্রতিবাদে স্টকহোমে বিক্ষোভ
চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে গাজা উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় বিমান ও কামান হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। প্রত্যক্ষদর্শীর বরাতে আনাদোলু এজেন্সি জানায়, দক্ষিণ গাজার রাফাহর পূর্বাঞ্চলে বিমান হামলা চালানো হয়। একই সময়ে খান ইউনুসের পূর্ব এলাকায় স্থলবাহিনীর গুলিবর্ষণ এবং উপকূলের দিকে নৌবাহিনীর তীব্র গোলাবর্ষণ হয়। গাজা শহরের পূর্ব অংশেও একযোগে বিমান হামলা ও কামানের গোলা নিক্ষেপ করা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এসব হামলায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ইসরাইলি হামলায় ছয় শতাধিক ফিলিস্তিনি নিহত এবং দেড় হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া টানা দুই বছরের হামলায় গাজায় প্রাণ হারিয়েছেন ৭৫ হাজারের বেশি মানুষ, আহত হয়েছেন এক লাখ সত্তর হাজারেরও বেশি। একই সাথে উপত্যকার প্রায় নব্বই শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে বলে ফিলিস্তিনি সূত্র জানিয়েছে। এ দিকে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে মাথায় আহত এক ফিলিস্তিনি কিশোরের মৃত্যু হয়েছে।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, নাবলুসের কাছে বেইত ফুরিক শহরে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর অভিযানের সময় জীবন্ত গুলিতে মাথায় আহত হন ওই কিশোর হানেনি। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। একই অভিযানে ১৬ বছর বয়সী আরেক কিশোর পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়। নাবলুসের জরুরি সেবা কেন্দ্রের পরিচালক ইমাদ আহমেদ বলেন, আহত দুই শিশুকে রাফিদিয়াহ রাষ্ট্রীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ফিলিস্তিনি সূত্র জানায়, গাজায় ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে হামলা শুরুর পর একই সময়ে পশ্চিম তীরেও অভিযান, আটক ও হত্যার ঘটনা বেড়েছে। এ সময়ে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুসালেমে অন্তত এক হাজার ১১৭ ফিলিস্তিনি নিহত এবং প্রায় ২২ হাজার মানুষ আটক হয়েছেন। রমজান শুরুর পর থেকে ১০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনিকে আটক করার কথা জানিয়েছে ফিলিস্তিনি বন্দী সমিতি। এ দিকে ইসরাইলি দৈনিক ইয়েদিওথ আহরোনোথ জানায়, রমজানকে ঘিরে পশ্চিম তীরে সামরিক সতর্কতা আরো জোরদার করা হয়েছে।
পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের হামলা
অধিকৃত পশ্চিম তীরে পৃথক দুটি ঘটনায় অবৈধ ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় এক শিশুসহ তিন ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন। স্থানীয় কর্মকর্তা ও চিকিৎসকদের বরাতে জানা গেছে, রামাল্লাহর উত্তর-পূর্বে আল-মুগাইয়ির গ্রামে বসতি স্থাপনকারীরা গুলি চালালে দুইজন আহত হন। আহতদের মধ্যে একজন শিশু এবং অপরজন তরুণ, যিনি পিঠে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর অবস্থায় রয়েছেন। খবর মিডল ইস্ট মনিটরের। গ্রাম পরিষদের প্রধান আমিন আবু আলিয়া জানান, গ্রামের দক্ষিণ অংশে এখনো আতঙ্ক বিরাজ করছে এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অন্য দিকে, দক্ষিণ-পশ্চিম তীরের মাসাফের ইয়াত্তা এলাকায় বসতি স্থাপনকারীদের মারধরে আরো এক ফিলিস্তিনি আহত হন। ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট জানায়, আহত ব্যক্তিকে সহায়তা দিতে গেলে ইসরাইলি সেনারা তাদের চিকিৎসা দলকে বাধা দেয়। গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পশ্চিম তীরে সহিংসতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ফিলিস্তিনি তথ্যমতে, এ সময়ে পশ্চিম তীরে সহস্রাধিক মানুষ নিহত, হাজারো আহত এবং প্রায় ২২ হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে।
পশ্চিম তীর দখলের প্রতিবাদে স্টকহোমে বিক্ষোভ
অধিকৃত পশ্চিম তীরকে আনুষ্ঠানিকভাবে দখলের লক্ষ্যে ইসরাইলের সাম্প্রতিক প্রশাসনিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে শত শত মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। তীব্র শীত উপেক্ষা করে শনিবার শহরের ওডেনপ্লান চত্বরে জড়ো হন বিক্ষোভকারীরা। বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের আহ্বানে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা পরে সংসদ ভবন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দিকে মিছিল করেন। খবর মিডলইস্ট মনিটরের। বিক্ষোভকারীরা পশ্চিম তীর দখলের পরিকল্পনার বিরোধিতা করেন এবং গাজার মানবিক সঙ্কট নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানান। মিছিলে ‘পশ্চিম তীর দখল নয়’, ‘গণহত্যা বন্ধ করো’ এবং ‘গাজায় শিশু হত্যা বন্ধ করো’- এমন সেøাগান শোনা যায়। সুইডিশ মানবাধিকার কর্মী সিগিন মেদার জানান, দুই বছরের বেশি সময় ধরে তারা নিয়মিত বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি গাজাকে ‘মানবিক বিপর্যয়ের কেন্দ্র’ হিসেবে উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি স্পষ্ট কর্মপরিকল্পনার আহ্বান জানান। আয়োজকরা ইসরাইলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার দাবিতে নতুন একটি উদ্যোগ শুরুর ঘোষণা দেন এবং এ সংক্রান্ত একটি স্মারকলিপি সরকার ও সংসদে জমা দেয়ার কথা জানান।
বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে গাজা নিয়ে জোরালো প্রতিবাদ
আন্তর্জাতিক বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে গাজায় চলমান হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন পুরস্কারপ্রাপ্ত ফিলিস্তিনি ও লেবানিজ নির্মাতারা। ‘ক্রনিকলস ফ্রম দ্য সিজ’ চলচ্চিত্রের পরিচালক আবদুল্লাহ আল খাতিব পুরস্কার গ্রহণের সময় বলেন, গাজায় সংঘটিত গণহত্যায় জার্মান সরকার নীরব সহযোগী। খবর আনাদোলু এজেন্সির। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তিনি ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলাকে নিজের নৈতিক দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, সব চাপ সত্ত্বেও তিনি ন্যায়বিচারের পক্ষে অবস্থান নেবেন। তিনি ভবিষ্যতে গাজায় একটি চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজনের স্বপ্নের কথাও জানান। একই অনুষ্ঠানে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পুরস্কারপ্রাপ্ত লেবানিজ নির্মাতা মারি-রোজ ওস্তা বলেন, বাস্তবে ফিলিস্তিন ও লেবাননের শিশুদের কোনো অলৌকিক শক্তি নেই, যা তাদের বোমা থেকে রক্ষা করবে। এ দিকে ৮১ জন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী ও নির্মাতা এক যৌথ চিঠিতে উৎসব কর্তৃপক্ষের নীরবতার সমালোচনা করে শিল্পীদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন।
শান্তির প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও গাজায় কেবল হতাশা
গাজার ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের আশ্বাস দিয়ে ওয়াশিংটনে শান্তি বোর্ডের প্রথম বৈঠক হলেও বাস্তবে গাজায় কোনো আশার আলো দেখছেন না ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারা। বৈঠকে বিপুল অর্থ সহায়তার ঘোষণা ও আধুনিক গাজার ভিডিও প্রদর্শন করা হলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। খবর এপি নিউজ। বাস্তুহারা ফারাজ আবু আনজে নামের একজন বলেন, সম্মেলন ও প্রতিশ্রুতির কথা বহুবার শোনা গেছে, কিন্তু মাটিতে তার কোনো প্রতিফলন নেই। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা ধ্বংস, চারদিকে শুধু তাঁবু আর হতাশা। ঘোষিত সহায়তার পরিমাণ পুনর্গঠনের প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় অপ্রতুল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। জাতিসঙ্ঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী গাজা পুনর্গঠনে প্রয়োজন অন্তত সত্তর বিলিয়ন ডলার। বাসিন্দাদের আশঙ্কা, ঘোষিত অর্থও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছবে না। তাদের দাবি, শান্তি ও পুনর্গঠনের আগে বাস্তব নিরাপত্তা, ঘরে ফেরার অধিকার এবং মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি।
ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুদণ্ড বৈধ করতে নতুন বিল এগোচ্ছে ইসরাইলি পার্লামেন্টে
ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পথ সুগম করতে নতুন একটি বিল এগিয়ে নিচ্ছে ইসরাইলের পার্লামেন্ট। বিলটি পাস হলে দখলদার কর্তৃপক্ষ আইনগতভাবে ফিলিস্তিনিদের ফাঁসি কার্যকর করতে পারবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন মানবাধিকার কর্মীরা। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিষয়টি তেমন মনোযোগ না পেলেও ফিলিস্তিনিদের জন্য এটি নতুন এক ভয়াবহ হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। খবর আলজাজিরার। এই বিলটি ২০২২ সালের শেষ দিকে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে জোট সরকার গঠনের সময়কার রাজনৈতিক সমঝোতার অংশ। বিলটির দাবিদার ছিলেন তৎকালীন চরম ডানপন্থী নেতা ও বর্তমান জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির। গত নভেম্বরে বিলটি প্রথম পাঠে অনুমোদন পায় এবং জানুয়ারিতে এর বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, দোষী সাব্যস্ত হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে আপিলের সুযোগ ছাড়াই ফাঁসি কার্যকর করা হবে। ফিলিস্তিনি বন্দীদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দিন ধরে প্রশাসনিক আটক, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত আচরণের অভিযোগ রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, নতুন এই বিল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও জেনেভা কনভেনশনের সরাসরি লঙ্ঘন। ফিলিস্তিনিদের আশঙ্কা, আইনটি কার্যকর হলে কারাগারে থাকা হাজারো মানুষের জীবন চরম ঝুঁকিতে পড়বে এবং দখলদারিত্ব আরো সহিংস রূপ নেবে।
গাজার শান্তি বোর্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাড়ছে সংশয়
এ দিকে গাজার জন্য ঘোষিত শান্তি বোর্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাড়ছে সংশয়। সমালোচকদের মতে, এ উদ্যোগ আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসঙ্ঘ কাঠামো উপেক্ষা করে গড়ে তোলা হয়েছে, যা শান্তির বদলে ক্ষমতার রাজনীতিকে জোরদার করতে পারে। খবর মিডলইস্ট মনিটরের। বৈঠকে ফিলিস্তিনিদের আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্ব না থাকাকে গুরুতর ত্রুটি হিসেবে দেখছেন অনেকেই। তাদের প্রশ্ন- দখলদারিত্ব অব্যাহত রেখে কেবল নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনা কীভাবে ন্যায্য শান্তি নিশ্চিত করবে? অনেক ইউরোপীয় দেশের অনুপস্থিতিও এই উদ্যোগের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ বাড়িয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, শান্তি মানে শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। বিশেষজ্ঞদের মতে, গাজা আজ বিশ্ব বিবেকের পরীক্ষা। সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে আগে সহিংসতা বন্ধ, নাগরিক সুরক্ষা নিশ্চিত এবং ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকার স্বীকৃতি দেয়া জরুরি। ন্যায়বিচার ছাড়া পুনর্গঠন টেকসই শান্তি আনতে পারবে না।



