বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও বিশ্লেষক শায়খ শাহ ওয়ালিউল্লাহ বলেছেন, জুলাইবিপ্লবে তরুণরা যে কাজ করেছে, এদের সবাই আল্লাহর নামে কাজ করেছে। এবং শহীদ হওয়ার তামান্না থেকে কাজ করেছে। মৃত্যুর ভয় ওদের কাছ থেকে চলে গিয়েছিল। যে কারণে পুলিশ অফিসার বলেছে, ‘একটাই মরে, একটাই যায়, বাকিরা যায় না।’ এসব কিছুর বাস্তবতায় বলতে হয় ইসলামই আমাদের রক্ষাকবচ। ইসলামই যুগে যুগে জুলুমের হাত থেকে মজলুমদের শান্তির আশ্রয় ও ঠিকানা হয়ে উঠেছে।
জুলাই আন্দোলনের পর গণভোট ও নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিকদলগুলোর নেতাকর্মীরা যখন প্রচণ্ড ব্যস্ততায় দিনরাত পার করছেন তখন আলোকিত সমাজের অন্যতম কারিগর হিসেবে আলেমরা কী ভাবছেন তা জানতে শায়খ শাহ ওয়ালিউল্লাহর এই সাক্ষাৎকার নেয়া। নয়া দিগন্তকে তিনি বলেন, তিনটি বাস্তবতায় মানুষের জীবন পরিচালিত হয়। ঐতিহ্যগত ধর্ম বিশ্বাস, জন্মের আগে ও পরে তার বাপ-দাদা যা করেছেন, এই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ব্যক্তির জীবনকে পরিচালিত করে। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তি যখন শিক্ষিত হয়ে ওঠে সে তখন তার পঞ্চইন্দ্রিয় কাজে লাগিয়ে, অর্জিত জ্ঞান ও বিবেক কাজে খাটিয়ে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করে জীবন পরিচালিত করে। তৃতীয়ত, আসলে বাস্তবতা। বর্তমান পরিস্থিতিকে মানুষ গ্রহণ করে। বাংলাদেশে হাজার বছর ধরে ইসলাম অনুসরণ করে আসছে মানুষ। রাসূল সা:-এর তিনজন বিখ্যাত সাহাবি আমাদের এ ভূখণ্ডে এসেছেন। যে কারণে ৬৯ হিজরিতে সাহাবি মসজিদ লালমনিরহাটে পাওয়া গেছে। এটি প্রমাণিত। সাহাবায়ে কেরামের মাধ্যমে আমাদের পূর্বপুরুষরা ধারাবাহিকভাবে ইসলাম শিখেছেন, আমল করেছেন, এটা আমাদের মানুষের হৃদয়ের গহিনে প্রোথিত হয়ে আছে। বিখ্যাত নাস্তিক রাজনৈতিক দর্শনের অনুসারীদেরও হজ করতে দেখা গেছে। তিনি বলেন, যদিও এ দেশে মাদরাসা শিক্ষা পার্সেন্টেজে কম কিন্তু এ দেশের সামাজিকতা, চালচলন, জন্ম, বিয়ে, বিপদ আপদ, দুর্ঘটনা সব কিছুতেই মানুষ স্রষ্টার সাথে কানেক্টিভিটি খোঁজে। এ জন্য এ উপমহাদেশে আলেমদের প্রভাব বেশি। এটি মানুষকে প্রতিনিয়ত ভাবায়। আবার ক্ল্যাস অব সিভিলাইজেশন বা সভ্যতার দ্বন্দ্বের দিক থেকে যদি দেখেন তাহলে সচেতন মানুষ হলেই সে পৃথিবীর পলিটিক্যাল বাস্তবতাকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করে এবং দেখে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে দ্বন্দ্বের ধারাবাহিকতা। সর্বশেষ আমাদের জুলাইবিপ্লবে তরুণরা যে কাজ করেছে, এদের সবাই আল্লাহর নামে কাজ করেছে। এবং শহীদ হওয়ার তামান্না থেকে কাজ করেছে। মৃত্যুর ভয় ওদের কাছ থেকে চলে গিয়েছিল। যে কারণে পুলিশ অফিসার বলেছে, ‘একটাই মরে, একটাই যায়, বাকিরা যায় না।’ এসব কিছুর বাস্তবতায় বলতে হয় ইসলামই আমাদের রক্ষাকবচ। ইসলামই যুগে যুগে জুলুমের হাত থেকে মজলুমদের শান্তির আশ্রয় ও ঠিকানা হয়ে উঠেছে।
নয়া দিগন্ত : বাংলাদেশের নিরাপত্তার দিক থেকেও তো ইসলাম রক্ষাকবচ বা সার্বভৌমত্বের গ্যারান্টি হিসেবে কাজ করে...
শায়খ শাহ ওয়ালিউল্লাহ : নিঃসন্দেহে, নিঃসন্দেহে সার্বভৌমত্বের গ্যারান্টি ইসলাম, এতে কোনো সন্দেহ নেই। ইসলামই মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে স্বাধীনতা, পারিবারিক জীবনে স্বাধীনতা, অর্থের লেনদেনের স্বাধীনতা, সম্পদ অর্জন ব্যয়ের স্বাধীনতা এমন নিখুঁতভাবে দিয়েছে, পৃথিবীতে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দিকে তাকালে পুঁজিবাদী অর্থনীতির ব্যবস্থাপনার বিপরীতে ইসলামের ইনসাফ ও ভারসাম্যপূর্ণ বাস্তবতা যা পুঁজিবাদ দিতে পারেনি। অন্য দিকে সমাজতন্ত্র যদিও পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে, তার জন্মভূমিতেই ধংস হয়েছে কিন্তু এটাও ঠিক অনেকে এখনো সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেন, সে ব্যবস্থাও কিন্তু মানুষকে কল্যাণ দিতে পারেনি। সাসটেইনেবল ইকোনমিক্যাল সলিউশন পেতে গেলে ইসলামের বিকল্প পৃথিবীতে আর কিছু নেই। ইসলাম একমাত্র শুধু কেবল। আপনি স্বাধীনতা বলবেন, অর্থব্যবস্থাপনা বলবেন, জীবনের পরিচ্ছন্নতা বলবেন, পারিবারিক কাঠামোর কথা বলবেন সব দিকেই ইসলাম দুনিয়া ও আখেরাতের সব কিছুর জন্যই রক্ষাকবচ।
নয়া দিগন্ত : দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ, পুরোপুরি ঈমান অর্জনের বিপরীতে সামাজিক বিশৃঙ্খলা রয়েছে, ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করা, বিদেশী পুঁজি পাচার বিশেষ করে বিগত পনেরো বছর ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে এসব ঘটেছে, এ ক্ষেত্রে ইসলামে পরিপূর্ণভাবে দাখিল হওয়া ছাড়া তো কোনো বিকল্প নেই...
শায়খ শাহ ওয়ালিউল্লাহ : দেখুন, দুই দিক থেকে ইসলাম আমাদের জীবনে রক্ষাকবচ, এক সঠিক পথ বাতলে দেয়, যাতে আমি কারো কষ্টের কারণ না হই, আমার জীবনেও কষ্ট নেমে না আসে। এ জন্য আমাকে পরিচ্ছন্ন পথ বাতলে দিচ্ছে। দ্বিতীয়ত, কেউ অপরাধ করে বসলে তার সংশোধনী ও ফিরে আসার পথ বাতলে দিয়েছে। রাসূল সা: বলেছেন এ ধরনের মানুষ যারা মানুষের আমানত বা অর্থ মেরে দেয় তাদের জানাজা পড়বে না। নবীজি পড়তেন না। বাংলাদেশে ইসলামের যদি এই শিক্ষা কায়েম করা যেত তাহলে অটোমেটিক্যালি সামাজিক বিচার হয়ে যেত। একসময় সুদখোরের সাথে কেউ আত্মীয়তা করত না। ঘুষখোরের সাথে কেউ মিশতে চাইত না। এখন তো বিভিন্ন কারণে হয়ত উল্টে গেছে। কিন্তু আবার আমাদের দেয়ালে ধাক্কা লেগেছে। দেয়ালে ধাক্কা লেগে এখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছি ইনশা আল্লাহ।
নয়া দিগন্ত : এই ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে অনেক সময় বাতিলের সাথে সংঘর্ষ বাধে, এখানে আমাদের করণীয় কী?
শায়খ শাহ ওয়ালিউল্লাহ : ইসলাম প্রতিটি ব্যাপারে ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা দিয়েছে। সবর বা ধৈর্য কিন্তু ভারসাম্য। আপনি যেটা বুঝেছেন, যেটা ধারণ করেছেন, যার ওপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছেন তার ওপর অটল থাকা। কোনো ধরনের পরিবেশ পরিস্থিতিতে উস্কে না যাওয়া। অন্যের দিকে বায়াস না হওয়া। এটার নাম সবর যা ঈমানের অংশ। ইসলামের তিনভাগের এক ভাগ হচ্ছে এই সবর। যেকোনো পরিস্থিতিতে ইসলামের শিক্ষায় সবরের ওপর অটল থেকে সামনে আগাতে থাকলেই সফলতা চলে আসে। আল্লাহর নিরঙ্কুশ সাহায্য পাওয়ার জন্য প্রথম শর্ত হচ্ছে সবর। দুই নম্বর হচ্ছে সালাত বা নামায। এই সবরের বাস্তবতা আলহামদুলিল্লাহ আমাদের সমাজে ঘুরে আসছে। একসময় মানুষের মধ্যে সবরের বাস্তবতা ছিল খুবই কম। কোনো সন্দেহ নেই। সমাজের একটি জিনিস কী, সমাজকে যখন আপনি ভালো কিছু দেখাবেন সমাজ তখন তা গ্রহণ করে। সমাজ যখন দেখে যে চুরি করে টেকা যায় না, ডাকাতি করে টেকা যায় না, ক্ষমতার অপব্যবহার করে টেকা যায় না, আশ্রয় পাওয়া যায় না কোথাও, সামাজিক শাস্তিটাও একটা বড় জিনিস, ইসলাম দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করেছে। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘হে বুদ্ধিমান মানুষেরা যদি বুদ্ধি কিছু থাকে, সেন্স যদি থাকে তাহলে হত্যাকারীকে ন্যায়ানুগ বিচারের আওতায় এনে হত্যা করাটা এর মধ্যে রয়েছে জীবন।’ সমাজে জুলাইবিপ্লবের পরই এসব উপলব্ধি ঘুরে আসছে। যে কারণে যারা গুম করেছে, খুন করেছে, অর্থপাচার করেছে তারা আজ বিচারের মুখোমুখি। একসময় ছিল একেবারে তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করত। সব কিছুই তাদের পক্ষে ছিল, ভয়ে হয়তো তাদের কেউ সালাম করত, এখন আর কোনো দ্বিধা নেই।
নয়া দিগন্ত : এখন তো নির্বাচন সামনে, আমাদের জনপ্রতিনিধি বা শাসক বেছে নেয়ার ক্ষেত্রে তো একটা ঈমানি দায়িত্ব রয়েছে...
শায়খ শাহ ওয়ালিউল্লাহ : উমর ইবনে খাত্তাব রা: অর্ধেক পৃথিবী শাসন করেছেন। হাদিসে আছে, তার একটা রাষ্ট্রীয় ফরমান ছিল যে, কোনো সরকারি পদে পদায়ন করতে প্রধান শর্ত ছিল সে কুরআন পড়ে কি না, সে অনুযায়ী আমল করে কি না। তিনি বলতেন, আমরা এমন কাউকে পদায়ন করি না যে, কি না কুরআন পড়ে না, পড়তে জানে না, অর্থ বুঝে না, আমল করে না। আমার মনে হয় উমর রা: এর এই ফরমান ফের উচ্চকিত হওয়া উচিত, বারবার বলা উচিত। প্রকৃত জীবনবোধ, দুনিয়ার জীবন তো সামান্য, আখেরাতের জীবন চিরন্তন ও চিরস্থায়ী। যেকোনো ব্যাপারে আমার বোধসত্তা কী হবে এই অ্যাডভান্স চিন্তা করে যে কাজ করে সে হয় ভালো। এটা এখন বারবার বলা উচিত, আগামী নির্বাচনে এমন লোক নির্বাচিত হোক, নেতৃত্ব ক্ষমতায় আসুক যারা কুরআন-সুন্নাহ পড়ে, বুঝে এবং এর ভিত্তিতে মানবতার জয়গান গেয়ে সত্য প্রতিষ্ঠায় আগাবে। নিজের জীবনেও সত্য প্রতিষ্ঠা করবে, পরিবার ও বিশ্বাসে তা ধারণ করবে এবং সমাজে তা প্রতিষ্ঠা করবে।



