দেশে ফার্নেস ওয়েলের (এইচএফও) দামে বড় ধরনের বৃদ্ধি বিদ্যুৎ খাত ও সামগ্রিক শিল্প অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিইআরসি) সর্বশেষ সিদ্ধান্তে প্রতি লিটার ফার্নেস ওয়েলের দাম ৭০ টাকা ১০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯৪ টাকা ৬৯ পয়সা নির্ধারণ করেছে। অর্থাৎ প্রতি লিটারে বৃদ্ধি পেয়েছে ২৪ টাকা ৫৯ পয়সা, যা শতাংশ হিসেবে প্রায় ৩৫। নতুন এই মূল্য রোববার মধ্যরাত থেকে কার্যকর হয়েছে।
মাত্র দেড় মাস আগেই বিইআরসি ফার্নেস ওয়েলের দাম কমিয়ে ৭০ টাকা ১০ পয়সা নির্ধারণ করেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে প্রায় ৩৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়কে সরাসরি বাড়িয়ে দেবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত খুচরা বিদ্যুতের দাম, শিল্প উৎপাদন ব্যয় এবং বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে প্রতিফলিত হবে।
বিইআরসি ও জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে শিপিং ঝুঁকি- আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামে অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি করেছে। একটি বড় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য মতে, ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে সিঙ্গাপুর প্ল্যাটস সূচকে এইচএফওর দাম ছিল প্রতি মেট্রিক টন ৪৪৯.৪৭ মার্কিন ডলার, যা মার্চের প্রথম সপ্তাহে বেড়ে দাঁড়ায় ৯৪১.২৬ ডলারে। অর্থাৎ এক মাসেরও কম সময়ে দাম বেড়েছে প্রায় ১০৯ শতাংশ।
বিইআরসি জানায়, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন, ২০০৩-এর ধারা ৩৪(৪) ও ৩৪(৬) অনুযায়ী প্রতি তিন মাস অন্তর বা প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানির দাম সমন্বয়ের বিধান রয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, মার্চ মাসে অপরিশোধিত তেল আমদানিতে বিঘœ, আন্তর্জাতিক বাজারে পরিশোধিত ফার্নেস ওয়েলের গড় দর এবং ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার বিবেচনায় নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ডলারের শক্তিশালী অবস্থানও স্থানীয় বাজারে জ্বালানি ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ে প্রভাব
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) আগের তথ্য অনুযায়ী, ফার্নেস ওয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় ব্যয় ছিল ২৭ টাকা ৩৯ পয়সা, যার বড় অংশই জ্বালানি খরচ। সাধারণত একটি এইচএফওভিত্তিক রিসিপ্রোকেটিং ইঞ্জিন বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় ০.২২ থেকে ০.২৫ লিটার ফার্নেস ওয়েল লাগে। গড় হিসেবে ০.২৪ লিটার ধরা হলে, নতুন মূল্যবৃদ্ধির ফলে ইউনিটপ্রতি জ্বালানি ব্যয় বাড়বে প্রায় ৫ টাকা ৯০ পয়সা। ফলে মোট উৎপাদন ব্যয় বেড়ে দাঁড়াতে পারে প্রায় ৩৩ টাকা ২৯ পয়সা, যা প্রায় ২১ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে।
১০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের অতিরিক্ত ব্যয়
বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি ১০০ মেগাওয়াট এইচএফওভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র যদি ২৪ ঘণ্টা পূর্ণ সক্ষমতায় চালু থাকে, তাহলে দৈনিক উৎপাদন হয় প্রায় ২৪ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ। প্রতি ইউনিটে অতিরিক্ত ৫.৯ টাকা ব্যয় ধরে দৈনিক বাড়তি খরচ দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৪১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। অর্থাৎ একটি কেন্দ্রেই দৈনিক অতিরিক্ত ব্যয় ১.৪ কোটির বেশি হতে পারে। দেশে ফার্নেস ওয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৫ হাজার ৬৩৪ মেগাওয়াটের বেশি হওয়ায় সামগ্রিকভাবে এই অতিরিক্ত ব্যয় কয়েক শ’ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
খুচরা বিদ্যুতের দাম বাড়ার আশঙ্কা
বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপ উল্লেখযোগ্য এবং পিডিবি ইতোমধ্যে বড় অঙ্কের লোকসানে রয়েছে। এ অবস্থায় উৎপাদন ব্যয় বাড়লে সরকারকে হয় ভর্তুকি বাড়াতে হবে, নয়তো পাইকারি ও খুচরা বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের পথে যেতে হবে। জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, ইউনিটপ্রতি উৎপাদন ব্যয় ৫-৬ টাকা বাড়লে গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি ইউনিটে ১ থেকে ২ টাকা পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। এতে আবাসিক গ্রাহকদের মাসিক ব্যয়ও বাড়বে। উদাহরণস্বরূপ, একটি পরিবার মাসে ৩০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে এবং ইউনিটপ্রতি দেড় টাকা বৃদ্ধি পায়, তাহলে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ৪৫০ টাকা।
শিল্প খাতে বাড়তি চাপ
ফার্নেস ওয়েলের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে শিল্প খাতে। গার্মেন্ট, টেক্সটাইল, সিরামিক, স্টিল ও খাদ্যপ্রক্রিয়াজাত শিল্পে বিদ্যুৎ একটি প্রধান ব্যয় উপাদান। বিদ্যুতের দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বাড়বে, ফলে রফতানি পণ্যের প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে। বিশেষ করে যেসব শিল্প প্রতিষ্ঠান ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফার্নেস ওয়েল ব্যবহার করে, তাদের ব্যয় আরো দ্রুত বাড়বে। শিল্প মালিকদের মতে, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যয় বৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে যুক্ত হবে।
পণ্যমূল্যে সম্ভাব্য প্রভাব
বিদ্যুতের খরচ বৃদ্ধি সরাসরি বাজারে প্রভাব ফেলে। উৎপাদন, কোল্ড স্টোরেজ, পরিবহন ও প্যাকেজিং- সবক্ষেত্রেই বিদ্যুতের ব্যবহার রয়েছে। ফলে খাদ্যপণ্য, নির্মাণসামগ্রী, ওষুধ, পোশাক ও ইলেকট্রনিক্সসহ প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি নতুন করে ‘কস্ট-পুশ’ মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি করতে পারে, যেখানে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বাজারদর বেড়ে যায়।
জনজীবনে প্রভাব
বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধি এবং পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি- দুইয়ের সম্মিলিত চাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বাড়াবে। মধ্যবিত্ত ও নি¤œ আয়ের মানুষের জন্য এটি বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেলে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভরতা বাড়ে, যা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলতে পারে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে আগামী মাসগুলোতেও জ্বালানির দাম সমন্বয়ের চাপ থাকতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা দীর্ঘায়িত হলে এবং শিপিং ব্যয় বৃদ্ধি পেলে ফার্নেস ওয়েলের দাম আরো বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।



