ব্যবসায়ীদের চাপে সয়াবিন তেলের দাম বাড়াল সরকার

অভিযোগ রয়েছে, দাম বৃদ্ধির জন্য ব্যবসায়ীরা প্রায় মাসখানেক ধরেই সয়াবিন তেলের একটি কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে রাখে। ফলে বাজারে এক লিটার ও পাঁচ লিটার তেলের বোতলের দুষ্প্রাপ্যতা লক্ষ করা গেছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা বোতলের নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম ক্রেতাদের কাছে তেল বিক্রি করে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

গেল সপ্তাহে জ¦ালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর এবার আবার নতুন করে ভোজ্যতেলের দামও বাড়ানো হলো। তেল ব্যবসায়ীদের চাপে নতি স্বীকার করে সয়াবিন তেলের দাম এ দফায় লিটারপ্রতি ৪ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ফলে দেশের নির্দিষ্ট আয়ের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর চাপ আরো বাড়বে।

গতকাল বুধবার সচিবালয়ে ভোজ্যতেলের ব্যবসায়ীদের সাথে বৈঠকের পর সয়াবিন তেলের এই দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

পরে বিকেলে সাংবাদিকদের কাছে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটার ১৯৫ টাকা থেকে ৪ টাকা বেড়ে ১৯৯ টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৭৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৭৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ভোজ্যতেলের নতুন দাম গতকাল বুধবার থেকেই কার্যকর হবে বলেও জানান তিনি।

অভিযোগ রয়েছে, দাম বৃদ্ধির জন্য ব্যবসায়ীরা প্রায় মাসখানেক ধরেই সয়াবিন তেলের একটি কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে রাখে। ফলে বাজারে এক লিটার ও পাঁচ লিটার তেলের বোতলের দু®প্রাপ্যতা লক্ষ করা গেছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা বোতলের নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম ক্রেতাদের কাছে তেল বিক্রি করে।

এ দিকে দাম বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা জানেন বৈশ্বিক একটা প্রতিকূল অবস্থার কারণে বিভিন্ন জিনিসের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে, দাম উৎসে বৃদ্ধি পেয়েছে। তো যেসব জিনিসে আমরা আমদানিনির্ভর, সেসব জিনিসের মূল্য যদি উৎসে বৃদ্ধি পায়, স্বাভাবিকভাবেই আমদানি মূল্যের ওপরও সেটার চাপ পড়ে, অভিঘাত আসে। তো সেই কারণে আমাদের এখানে যারা সয়াবিন তেল আমদানিকারক, সয়াবিন তো আর আমাদের দেশে হয় না, পুরোটাই বাইরে থেকে আসে। সয়াবিন তেল যারা আমদানি করেন উৎসে মূল্য বৃদ্ধির কারণে আমদানি মূল্যের ওপর সেটার প্রভাব পড়েছে। এই প্রভাব পড়েছে আসলে রোজার সময় থেকে।’

তিনি বলেন, ‘সেই সময় থেকেই আমদানিকারক এবং রিফাইনাররা ক্রমাগতভাবে অনুরোধ জানিয়ে আসছিলেন আমাদেরকে যে মূল্য সমন্বয় করার জন্য। না হলে ক্রমাগত লোকসানের কবলে পড়ে তাদের পুঁজি নিঃশেষিত হয়ে যাচ্ছে।

‘তো সেরকম একটা পরিস্থিতিতে আমরা উৎসের মূল্য বারবার যাচাই করে, সেই সাথে আমদানির প্রক্রিয়ায় যে ধরনের বাড়তি খরচ যোগ হয়, সেই সমুদয় মূল্য একসাথে করে আমরা দেখেছি যে তাদের কথার মধ্যে যথার্থতা আছে। তারপরেও তারা যে পরিমাণ অনুরোধ করেছেন, সেই অনুরোধটি পুরোপুরি রাখা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। আমরা কিছু ঊর্ধ্বমূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আশা করি আমাদের যারা ভোক্তা আছেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তারা জিনিসটি বিবেচনা করবেন।’

খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির দাবি করেন, ‘এই সমন্বয় তাদের লোকসানের বোঝা লাঘবে সহায়ক হবে এবং বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতিও আগামী দিন পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে ইনশাআল্লাহ।’

দেশের শীর্ষ ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল বলেন, ‘আপনারা এটা নিয়ে অনেক দিন থেকেই লেখালেখি করছেন, জানতে চাচ্ছেন এবং সরবরাহ একটু বিঘিœত হচ্ছে বা সাপ্লাই চেইনটা একটু বিঘিœত হয়েছে। এটা সরকার এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আমাদেরকে কঠোর মনিটর করছে, এ ব্যাপারে উদ্বিগ্ন।

তিনি বলেন, ‘এখানে অ্যাডজাস্টমেন্টের ন্যায্যতা অনেক আগে থেকেই ছিল। মন্ত্রীও চেষ্টা করছেন। সরকার প্রধানও এ ব্যাপারে কনসার্ন, উনি যেটা আমাদেরকে বলছেন, প্রধানমন্ত্রীও এ ব্যাপারে খুব কনসার্ন। তো যার জন্য আমাদের এই বিষয়ে কিছু বলার নেই। এটা যেটা (দাম বাড়ানো) হয়েছে অত্যন্ত মিনিমাম, কিন্তু আমাদের এটা অ্যাডজাস্টমেন্টটা পুরোপুরি হয়নি। তারপরেও মন্ত্রী যেখানে বলেছেন আমরা সেই জিনিসটাই মেনে নিচ্ছি।’

এক প্রশ্নের জবাবে মেঘনা গ্রুপের কর্ণধার মোস্তফা কামাল বলেন, ‘আমরা বলছি সমন্বয়টা ঠিক না। আমাদের লস হয় ১০ টাকা, এখন সরকার ৫ টাকা বাড়িয়ে দিলো। আপনি তো এটাই ধরে নেবেন।’

সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এখন যেহেতু মূল্য সমন্বয় হয়েছে। আমরা বাজারে নজরদারি আরো জোরদার করব। স্থানীয় প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর এ বিষয়ে কাজ করবে। কোনো ধরনের ব্যত্যয় আমরা সহ্য করব না।

আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী মূল্য সমন্বয় বলতে বোঝায় যে যখন দাম বাড়ে তখন এখানে বাড়ানো হয় যখন কমে তখন এখানেও কমানোর কথা। কিন্তু বাংলাদেশে এ প্র্যাকটিসটা নেই। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আমি আপনার কথাটা ১০০ শতাংশ সমর্থন করি। কিন্তু আজ কয় তারিখ? ২৯ তারিখ (এপ্রিল)। আপনি ২৯ তারিখটা মনে রাখেন, প্রাইস যখনই কমবে সেটার রিফ্লেকশন এখানে হবে। এ ব্যাপারে আপনি নিশ্চিত থাকেন।

এ দিকে ভোক্তাদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ৮ এপ্রিল ‘ভোজ্যতেলের বাজারে কারসাজি ও মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে’ মানববন্ধন করে। ক্যাবের নেতারা তখন বলেন, দেশের বাজারে প্রায় দুই মাস ধরে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহসঙ্কট চলছে। বোতলের গায়ে লেখা দামের (এমআরপি) চেয়েও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে কোথাও কোথাও। বোতলজাত সয়াবিনের সঙ্কটের মধ্যে বেড়েছে খোলা সয়াবিন তেলের দামও।

মানববন্ধন থেকে ছয়টি দাবি তুলে ধরে ক্যাব। এগুলো হচ্ছে সরকার নির্ধারিত দামে ভোজ্যতেল বিক্রি অবিলম্বে নিশ্চিত করা, সয়াবিন তেলের বাজারে সক্রিয় সিন্ডিকেট চক্র চিহ্নিত করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা, বাজারে নিয়মিত ও কার্যকর তদারকি এবং অভিযান পরিচালনা করা, কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি ও মজুদদারির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া, নন-ফুড গ্রেড ড্রামে তেল সংরক্ষণ ও বিক্রি তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করা এবং ভোজ্যতেলের জন্য ফুড-গ্রেড পাত্র ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা।