ভোটাধিকারের বাস্তবতা ও গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে প্রবাসী ভোট ও রেমিট্যান্স প্রভাব

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে প্রবাসীদের ভূমিকা আজ আর পরিসংখ্যানের সীমায় আটকে নেই- এটি বাস্তবতার শক্তিশালী ভিত্তি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত এক কোটির বেশি বাংলাদেশী নাগরিক প্রতি বছর রেমিট্যান্স পাঠিয়ে জাতীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন। অথচ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধিকার, ভোটাধিকার- এখনো তাদের নাগালের বাইরে।

ফলে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে : অর্থনীতিতে তারা দৃশ্যমান, কিন্তু রাজনীতিতে অদৃশ্য।

প্রবাসী ভোটাধিকার তাই এখন কেবল প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি সাংবিধানিক অধিকার, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

কত প্রবাসী, কত সম্ভাব্য ভোটার?

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্বের ৭০টিরও বেশি দেশে এক কোটির বেশি বাংলাদেশী বসবাস করছেন। এর বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও উত্তর আমেরিকায় কর্মরত শ্রমিক, পেশাজীবী ও ব্যবসায়ী।

আইনগতভাবে তারা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। জাতীয় পরিচয়পত্র, বয়স ও নাগরিকত্বের শর্ত পূরণ করলে ভোটার তালিকাভুক্ত হওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে।

তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অনেকেই ভোটার তালিকায় নেই; তালিকাভুক্ত হলেও ভোট দেয়ার সুযোগ পান না আর দূতাবাসভিত্তিক কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মোট প্রবাসীর ৬০-৭০ শতাংশ ভোটার বয়সী হলে সম্ভাব্য প্রবাসী ভোটার সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৬০-৭০ লাখ। যা একাধিক সংসদীয় আসনের ফলাফল বদলে দেয়ার মতো শক্তিশালী একটি ভোটব্যাংক। কিন্তু এই বিশাল জনগোষ্ঠী কার্যত ‘অদৃশ্য ভোটার’ হিসেবেই থেকে গেছে।

ই-ভোটিং : সম্ভাবনার দরজা

প্রবাসী ভোটাধিকার বাস্তবায়নের সবচেয়ে আলোচিত সমাধান হচ্ছে ই-ভোটিং বা ডিজিটাল ভোটিং। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কয়েকটি মডেল ব্যবহৃত হচ্ছে: অনলাইন ভোটিং; পোস্টাল ব্যালট; দূতাবাসভিত্তিক বুথ; হাইব্রিড পদ্ধতি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নিরাপদ ই-ভোটিং প্ল্যাটফর্মকে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এর সম্ভাব্য সুবিধা হলো- ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা দূর; ব্যয় কম; দ্রুত ফলাফল; অংশগ্রহণ বৃদ্ধি।

আর এর বড় চ্যালেঞ্জ হলো- সাইবার নিরাপত্তা ও হ্যাকিং ঝুঁকি; ডেটা ম্যানিপুলেশন; প্রকৃত ভোটার শনাক্তকরণ; আর রাজনৈতিক আস্থার সঙ্কট।

তবে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক বায়োমেট্রিক ডেটাবেস, পাসপোর্ট তথ্যভাণ্ডার এবং ডিজিটাল অবকাঠামো ই-ভোটিংয়ের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন, বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন এবং এনক্রিপ্টেড ভোটিং সিস্টেম যুক্ত করা গেলে প্রযুক্তিগতভাবে এটি বাস্তবায়ন সম্ভব। তবে প্রযুক্তি একমাত্র সমাধান নয়- রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আইনগত কাঠামো ছাড়া এ উদ্যোগ টেকসই হবে না।

রেমিট্যান্স : অর্থনীতির চালিকাশক্তি, রাজনীতিতে উপেক্ষিত

প্রবাসীরা বছরে যে বিপুল রেমিট্যান্স পাঠান, তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। রিজার্ভ, আমদানি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় এর ভূমিকা অপরিসীম। অর্থনীতিতে তারা ‘জাতীয় সম্পদ’, কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারা প্রায় ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক’। এই বৈপরীত্য গণতান্ত্রিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন তোলে।

যারা অর্থনীতির মেরুদণ্ড, তাদের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেয়ার সুযোগ না থাকাটা এক ধরনের কাঠামোগত বৈষম্য বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

রাজনীতিতে কী বদল আনতে পারে প্রবাসী ভোট?

প্রবাসী ভোটাধিকার চালু হলে বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে কয়েকটি বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

১. নতুন ভোটব্যাংক: ৬০-৭০ লাখ ভোটার যুক্ত হলে নির্বাচনী সমীকরণ বদলে যাবে। বড় দলগুলো প্রবাসী নীতিতে মনোযোগী হবে।

২. নীতিনির্ধারণে প্রভাব: অভিবাসন নীতি; শ্রমিক অধিকার; প্রবাসী কল্যাণ; কনস্যুলার সেবা; রেমিট্যান্স প্রণোদনা- এসব ইস্যু রাজনৈতিক অগ্রাধিকার পাবে।

৩. প্রচারণার রূপান্তর : ডিজিটাল ক্যাম্পেইন, বিদেশভিত্তিক সংগঠন, প্রবাসী কমিউনিটি রাজনীতি শক্তিশালী হবে।

৪. রাষ্ট্র-প্রবাসী সম্পর্ক পুনর্গঠন : প্রবাসীরা কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, রাজনৈতিক অংশীদার হিসেবেও স্বীকৃতি পাবেন।

তবে আশঙ্কাও রয়েছে- বিদেশভিত্তিক মেরুকরণ ও প্রভাব রাজনীতিতে নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে।

করণীয় কী?

বিশেষজ্ঞদের মতে প্রবাসী ভোট বাস্তবায়নে প্রয়োজন- স্পষ্ট আইনগত কাঠামো; নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি; পরীক্ষামূলক পাইলট প্রকল্প; আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ; স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক ঐকমত্য।

শেষ কথা হলো- প্রবাসী ভোটাধিকার কোনো বিলাসিতা নয়; এটি সাংবিধানিক অধিকার। যে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের অর্থনৈতিক অবদান গ্রহণ করে, সেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাদের রাজনৈতিক অধিকারও নিশ্চিত করা।

রেমিট্যান্সে যেমন তারা অর্থনীতির চালিকাশক্তি, তেমনি ভোটাধিকার পেলে তারা হতে পারেন গণতন্ত্রেরও চালিকাশক্তি। বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র গড়তে চায়, তবে প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।