আজ কৃষিমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকে প্রকল্পের বিস্তারিত তুলে ধরবেন সচিব

আড়াই বছর পর গতি ফিরছে ‘কৃষক স্মার্টকার্ড’ কার্যক্রমে

বরাদ্দ ৭২১ কোটি টাকা; ফিজিক্যাল নাকি ভার্চুয়াল কার্ড হবে- সিদ্ধান্ত নেবে বর্তমান সরকার

কাওসার আজম
Printed Edition

প্রায় আড়াই বছর স্থবির থাকার পর অবশেষে গতি ফেরার আভাস মিলছে ‘কৃষক স্মার্টকার্ড’ কার্যক্রমে। প্রায় ৭২১ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ দিন মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়া এই উদ্যোগ এখন নতুন সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় উঠে এসেছে। ফিজিক্যাল নাকি ভার্চ্যুয়াল- কোন রূপে কার্ড চালু হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বিএনপি সরকার।

আজ সোমবার কৃষি মন্ত্রণালয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী মোহাম্মদ আমীন উর রশীদ ও প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাহউদ্দিন টুকুকে ব্রিফ করার মধ্য দিয়ে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা স্পষ্ট হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।

কৃষিকে ডিজিটাল তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থায় রূপান্তর এবং প্রকৃত কৃষকের হাতে সরাসরি সরকারি ভর্তুকি পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে ২০২৩ সালের ১১ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে কৃষি খাতের সবচেয়ে বড় উদ্যোগ ‘পার্টনার’ (প্রোগ্রাম অন অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনারশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স) প্রকল্প। এর আগে ২০২৩ সালের ১৮ এপ্রিল একনেক সভায় অনুমোদন পাওয়া এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয় ছয় হাজার ৯১০ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়ন এক হাজার ১৫১ কোটি টাকা, বিশ্বব্যাংকের পাঁচ হাজার ৩০০ কোটি টাকা এবং ইফাদের ৫০০ কোটি টাকা। দেশের ৬৪ জেলার ৪৯৫ উপজেলায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরসহ কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন সাতটি সংস্থা প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।

প্রকল্পটির অন্যতম বড় প্রতিশ্রুতি ছিল প্রায় দুই কোটি ২৭ লাখ কৃষক পরিবারকে ‘কৃষক স্মার্টকার্ড’ প্রদান। এ জন্য আলাদা করে প্রায় ৭২১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। পরিকল্পনা ছিল- জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) সাথে কৃষকের তথ্য যুক্ত করে একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ গড়ে তোলা হবে। এতে ভুয়া তালিকা, দ্বৈত সুবিধাভোগী ও মুখস্থভিত্তিক ভর্তুকি বণ্টন বন্ধ হবে। সার, বীজ, কৃষিযন্ত্র প্রণোদনা কিংবা দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সহায়তা সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে পৌঁছে দেয়া যাবে।

ডিপিপি অনুযায়ী, প্রতিটি কৃষকের জন্য একটি ইউনিক আইডি তৈরির কথা ছিল। কার্ডে সংরক্ষিত থাকবে কৃষকের এনআইডি নম্বর, ঠিকানা, জমির আয়তন, মৌসুমভিত্তিক আবাদ তথ্য, ফসলের ধরন এবং ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাকাউন্ট নম্বর। উপজেলা পর্যায়ে ডেটা এন্ট্রি, মনিটরিং ও ডাটা ভেরিফিকেশন ইউনিট স্থাপনেরও পরিকল্পনা ছিল। কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে জমির ব্যবহার, ফসলের ধরন, বন্যা বা খরার ক্ষয়ক্ষতির তথ্য হালনাগাদ করবেন- এমন কাঠামোও অন্তর্ভুক্ত ছিল। নীতিনির্ধারকদের আশা ছিল, এতে কৃষি খাতে স্বচ্ছতা বাড়বে, অপচয় কমবে এবং দুর্যোগকালে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হবে।

কিন্তু বাস্তবে প্রকল্প শুরুর আড়াই বছরেও স্মার্টকার্ড বিতরণ তো দূরের কথা, প্রকৃত কৃষকের পূর্ণাঙ্গ তালিকাই প্রস্তুত হয়নি। ফলে ‘পার্টনার’ প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে (বিবিএস) তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দেয়ার চিন্তা ছিল। কিন্তু প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয় প্রস্তাব করায় সে পরিকল্পনা স্থগিত হয়। পরে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ও টেন্ডারে নির্বাচিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবুও মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু হয়নি।

কৃষক স্মার্টকার্ডসহ পার্টনার প্রকল্পের কাজে স্থবিরতা দেখা দেয়ার কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পটি শুরুতে মিজানুর রহমান নামের একজন অনভিজ্ঞ কমকর্তার কাঁধে তুলে দেয় বিগত আওয়ামী সরকার। প্রকল্পটির ডিপিপি তৈরির ফোকাল পয়েন্ট ছিলেন ড. সাখাওয়াত হোসেন শরিফ। বিএনপিপন্থী কর্মকর্তা ট্যাগ দিয়ে তাকে সরিয়ে মিজানুর রহমানকে দায়িত্ব দেয়ায় বিদেশী অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটি গতি হারায়। পরবর্তীতে দুর্নীতির অভিযোগে তিনি বরখাস্ত হন। তাকে সরিয়ে দেয়ার পর আবুল কালাম আজাদকে প্রকল্পের পিসি (প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর)-এর দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু, প্রকল্পটি এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। প্রকল্পের প্রায় আড়াই বছর অতিবাহিত হলেও অগ্রগতি মাত্র ২০ শতাংশের কাছাকাছি।

পার্টনার প্রকল্পের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর (পিসি) আবুল কালাম আজাদ সম্প্রতি নয়া দিগন্তকে জানিয়েছিলেন, ‘কৃষক স্মার্টকার্ড এখন আর প্রচলিত অর্থে ফিজিক্যাল কার্ড নাও হতে পারে। এটি ভার্চ্যুয়াল কার্ড বা মোবাইল অ্যাপভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে রূপ নিতে পারে। সারা বিশ্বেই এখন ডিজিটাল কার্ডের দিকে যাওয়া হচ্ছে। আমাদের ক্ষেত্রেও কার্ডের সব তথ্য থাকবে, তবে খরচ কিছুটা কমবে।’ তিনি জানান, বরাদ্দের বড় অংশ ব্যয় হবে তথ্য সংগ্রহ ও ডাটাবেজ উন্নয়নে। প্ল্যাটফর্ম তৈরির প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। আগামী অর্থবছরে ডাটা সংগ্রহে ফার্ম নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।

তবে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারিত থাকলেও নির্ধারিত সময়ে সব কার্যক্রম শেষ হবে কি না, তা অনিশ্চিত। প্রকল্পের মেয়াদ দুই বছর বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়ার কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ব্যয় বাড়বে কি না, তা নির্ভর করবে বিশ্বব্যাংক ও ইফাদের সম্মতির ওপর।

এ দিকে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও ‘কৃষক কার্ড’ ইস্যু নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল কৃষকদের আকৃষ্ট করতে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন বিএনপি মাঠপর্যায়ের প্রচারণায় ‘কৃষক কার্ড’ ও ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরে। বিশেষ করে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বক্তৃতায় এসব বিষয়ে জোরালো বক্তব্য দিয়ে আসছেন। নতুন সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারে ‘কৃষক কার্ড’ অন্তর্ভুক্ত থাকায় প্রশাসন এখন দ্রুত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।

কৃষিসচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, ‘মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকে আমাদের প্রকল্পের আওতায় স্মার্টকার্ড বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা দেয়া হবে। তাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের সাথে প্রকল্পের কাঠামো কীভাবে সমন্বয় করা যায়, তা তুলে ধরা হবে। পরে সরকার যেভাবে সিদ্ধান্ত নেবে, সেভাবেই কাজ এগোবে।’ তিনি জানান, ফিজিক্যাল কার্ড হবে কি না, তা সম্পূর্ণ সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। প্রকল্পে উল্লেখিত দুই কোটি ২৭ লাখ কৃষকের সংখ্যা বাড়তে বা কমতেও পারে।

নীতি-নির্ধারকদের মতে, প্রকৃত কৃষকের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণই হবে প্রথম চ্যালেঞ্জ। কারা প্রকৃত চাষি, কারা বর্গাচাষি বা অংশীদার- এ বিষয়গুলো স্পষ্ট না হলে কার্ড বিতরণে জটিলতা তৈরি হতে পারে। একই সাথে তথ্যের নির্ভুলতা ও নিয়মিত হালনাগাদ নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষক স্মার্টকার্ড কেবল একটি কার্ড নয়- এটি কৃষি ব্যবস্থাপনায় একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে ভর্তুকি ও প্রণোদনা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আসবে, কৃষকের আস্থা বাড়বে এবং নীতিনির্ধারণে নির্ভরযোগ্য ডাটা পাওয়া যাবে। তবে দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা কাটাতে না পারলে প্রকল্পটি কাগুজে পরিকল্পনাতেই সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি রয়েছে।

আড়াই বছর পর নতুন সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় উঠে আসায় ‘কৃষক স্মার্টকার্ড’ উদ্যোগে নতুন গতি সঞ্চারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন দেখার বিষয়- সরকার ফিজিক্যাল কার্ডের পথে যায়, নাকি সম্পূর্ণ ভার্চ্যুয়াল প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। যেভাবেই হোক, কৃষকের হাতে সরাসরি সুবিধা পৌঁছে দেয়ার প্রতিশ্রুতি কত দ্রুত বাস্তবে রূপ পায়, সেটিই হবে এই প্রকল্পের সাফল্যের মূল মাপকাঠি।

এ দিকে, গতকাল রোববার কৃষি মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে মন্ত্রণালয় ও দফতর/সংস্থার কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময় সভাতেও উঠে আসে ‘কৃষি স্মার্টকার্ড’ বিষয়টি। কৃষি, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এমপি বলেন, প্রকৃত কৃষকরা যাতে প্রণোদনা, কৃষি ঋণসহ কৃষিবিষয়ক সহায়তা পায় সে বিষয়ে কাজ করতে হবে। কৃষক কার্ড প্রদানের জন্য সরকার কাজ শুরু করেছে বলেও প্রতিমন্ত্রী জানান।

মতবিনিময় সভায় কৃষি, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমীন উর রশীদ বলেছেন, কৃষি খাত শক্তিশালী হলে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। কৃষি খাতকে ঢেলে সাজানো হবে। সারের ব্যবহার কমানো, মাটির গুণাগুণ ঠিক করা, কৃষি সেচের খাল খননসহ বিবিধ বিষয়ে মন্ত্রী সরকারের পরিকল্পনার কথা জানান।