সাক্ষাৎকার : আবু হেনা রাজ্জাকী

গণভোট ছাড়া সংসদের বৈধতাই প্রশ্নবিদ্ধ হবে

ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর দিকে কঠিন নজর রাখতে হবে। কারণ সংস্কারের নামে, ঐকমত্যের নামে দীর্ঘ সময় গেলেও, আলটিমেটলি আমরা ৫ আগস্টের পরদিন যে জায়গাটায় ছিলাম, এখনো সে জায়গাতেই অবস্থান করছি।

রাশিদুল ইসলাম
Printed Edition

সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী আবু হেনা রাজ্জাকী বলেছেন, ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর দিকে কঠিন নজর রাখতে হবে। কারণ সংস্কারের নামে, ঐকমত্যের নামে দীর্ঘ সময় গেলেও, আলটিমেটলি আমরা ৫ আগস্টের পরদিন যে জায়গাটায় ছিলাম, এখনো সে জায়গাতেই অবস্থান করছি। নয়া দিগন্তকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আবু হেনা রাজ্জাকী এ কথা বলেন।

নয়া দিগন্ত : দেখতে দেখতে নির্বাচন সামনে এসে গেছে মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। প্রচারণা জমজমাট, কোথাও কোথাও সহিংসতাও দেখা যাচ্ছে। লক্ষ করলে দেখা যায়, নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর ভাষা ও বক্তব্যে পুরনো শত্রুতা ও আক্রমণাত্মক প্রবণতাই ফিরে এসেছে।

কিন্তু এবারের নির্বাচন তো ছিল ব্যতিক্রমী সংস্কার, গণভোট, জুলাই আন্দোলনের লক্ষ্য বাস্তবায়ন- এ বিষয়গুলো নিয়ে তেমন কোনো গভীর রাজনৈতিক আলোচনা বা ব্রেইনস্টর্মিং দেখা যাচ্ছে না। এমনকি মিডিয়ার আলোচনাতেও বিষয়গুলো অনুপস্থিত। আপনার চোখে বিষয়টি কিভাবে ধরা পড়ছে?

অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী : আমরাও পরিবর্তনের আশা করেছিলাম। কিন্তু ৫ আগস্টের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বাস্তবতা হলো আমরা আজও সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। সংস্কারের নামে আট মাস গেল, ঐকমত্যের নামে আট মাস গেল কিন্তু বাস্তবে কোনো সংস্কার হয়নি। গণভোট হলে পরে হবে বলা হচ্ছে, তাও ‘হ্যাঁ’ হলে। অথচ রাজনৈতিক দলগুলো যদি ঐকমত্যে পৌঁছে জুলাই সনদ অনুমোদন করত, তাহলে গণভোটেরও প্রয়োজন পড়ত না। শেষ পর্যন্ত সব দায় গিয়ে পড়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ঘাড়ে। তারা গণভোট আয়োজন করবে, সিদ্ধান্ত নেবে। অথচ রাজনৈতিক দলগুলোর চাওয়াতেই নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে হয়েছে। বাস্তবে বিএনপি যা চেয়েছে, সেটাই ঘটেছে।

এমনকি রাষ্ট্রপতি অপসারণের মতো বড় ইস্যুতেও বিএনপি আগ্রহ দেখায়নি ফলে সেটাও হয়নি।

নয়া দিগন্ত : আপনি বলছেন, রাজনৈতিকভাবে সবকিছু আবার পুরনো ছকে ফিরে যাচ্ছে?

অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী : ঠিক তাই। নির্বাচন তফসিল ঘোষণার সময়ও সংবিধানের কোন অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তফসিল ঘোষণা করা হলো তা স্পষ্ট করা হয়নি। এটা খুবই গুরুতর বিষয়। একটা সাধারণ চাকরিচ্যুতির ক্ষেত্রেও আইনের ধারা উল্লেখ থাকে, অথচ জাতীয় নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সেই স্বচ্ছতা নেই। তাহলে আমরা কোন আইনি কাঠামোর ভেতরে নির্বাচন করছি এই প্রশ্ন থেকেই যায়।

নয়া দিগন্ত : নির্বাচনের মাঠে এখন যা দেখা যাচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে তীব্র পাল্টাপাল্টি আক্রমণ- এটাকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী : আমার কাছে মনে হয়, রাজনীতির মাঠ এখন ভোটক্যাচিংয়ের জায়গা। ভোটারকে আকৃষ্ট করতে হবে নিজের কর্মসূচি, দর্শন দিয়ে, প্রতিপক্ষকে গালি দিয়ে নয়। মার্কেটিংয়ের নিয়মেও বলা আছে নিজের পণ্য কেন ভালো, সেটাই বলতে হবে; অন্যের পণ্য খারাপ বলার অধিকার আপনার নেই। কিন্তু রাজনীতিতে সেই শিষ্টাচার আমরা দেখছি না।

এখন তো মনে হচ্ছে, নির্বাচন নয়, বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে এক ধরনের যুদ্ধ চলছে।

নয়া দিগন্ত : জামায়াতকে যুদ্ধাপরাধী ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। কিন্তু বিএনপির অবস্থান নিয়ে আপনি ডাবল স্ট্যান্ডার্ডের অভিযোগ তুলছেন কেন?

অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী : কারণ জামায়াতের অবস্থান সবসময়ই একই। তারা কখনোই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দাঁড়ায়নি। কিন্তু বিএনপির অবস্থান সময়ের সাথে বদলেছে।

২০০১ সালে বিএনপি জামায়াতকে সাথে নিয়ে আওয়ামী লীগকে যাদের তারা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি বলত তাদের পরাজিত করেছিল। তখন কি বিএনপি স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ায়নি?

আজ আবার এসে বলা হচ্ছে, বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি, জামায়াত বিপক্ষের। তাহলে এই দ্বিচারিতা কেন?

যখন জামায়াত দরকার, তখন গন্ধ লাগে না; যখন দরকার নেই, তখন গন্ধ লাগে, এই রাজনীতি দীর্ঘদিন টেকে না।

নয়া দিগন্ত : গণভোট নিয়ে বড় দলগুলোর অবস্থান অস্পষ্ট। ‘হ্যাঁ’ না ‘না’ এই দ্বিধা কি রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করছে?

অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী : গণভোট ছাড়া সংসদের বৈধতাই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। গণভোট পাস হলে সংবিধান সংস্কারের দরজা খুলবে। আপার হাউজ, লোয়ার হাউজ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমা সবকিছুর সুযোগ তৈরি হবে।

গণভোট ফেল করলে সংবিধান পুরোপুরি লক হয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রী ছাড়া সংবিধানে ঢোকার কোনো রাস্তা নেই।

এই অবস্থায় নির্বাচন হলে সংসদের বৈধতা নিয়ে ভয়াবহ প্রশ্ন উঠবে, যা সামাল দেয়া সম্ভব হবে না।

নয়া দিগন্ত : তার মানে রাজনৈতিক ঐকমত্য এখন সবচেয়ে জরুরি?

অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী : নিশ্চয়ই। আট মাসেও যদি রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে এর দায় সরকারের নয়। দায় পুরোপুরি রাজনৈতিক দলগুলোর।

সবকিছুর জন্য সরকারকে দোষ দিলে নিজের ব্যর্থতা ঢেকে রাখা হয় মাত্র।

নয়া দিগন্ত : আপনি বারবার ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর কথা বলছেন। এটি কতটা বড় ঝুঁকি?

অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী : ভোট কারচুপি আর ইঞ্জিনিয়ারিং আলাদা বিষয়। কারচুপি করে দলীয় কর্মীরা কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ভরা ইত্যাদি।

কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিং করে প্রশাসন। ভোটকেন্দ্রে ফলাফল ঠিক থাকে, কিন্তু উপরের স্তরে গিয়ে সংখ্যার অদলবদল হয়।

এই জায়গাটা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর, কারণ এটা চোখে ধরা পড়ে না, প্রমাণও করা যায় না।

আমি সবাইকে আহ্বান জানাই প্রশাসনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিষয়ে কঠোর নজর রাখুন।

নয়া দিগন্ত : ফ্যাসিস্ট শক্তি এখনো সক্রিয়। নির্বাচন ঠেকানোর চেষ্টাও চলছে বলে অভিযোগ আছে। এতে নির্বাচন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা কি আছে?

অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী : অবশ্যই আছে। কারণ যারা পতিত হয়েছে, তারা জানে, একটি নির্বাচিত সরকার পাঁচ বছর টিকে গেলে তারা দীর্ঘদিনের জন্য বাইরে চলে যাবে। তাই তারা চায় নির্বাচন ভণ্ডুল হোক, অথবা এমনভাবে হোক যাতে নতুন শক্তি স্থায়ী না হয়। যদি নতুন সরকার স্লিপ করে, তখনই পুরনো শক্তিকে আবার চাঙ্গা করা হবে।

নয়া দিগন্ত ডেস্ক : সবশেষে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ না এলে কি ফ্যাসিবাদ ফেরার ঝুঁকি বাড়বে?

অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী : গণভোটে ‘হ্যাঁ’ মানে, রাষ্ট্র রূপান্তরের একটি বৈধ দরজা খুলে যাওয়া।

আর ‘হ্যাঁ’ না হলে সবাই বিপদে পড়বে। সংবিধান এমনভাবে ব্লক করা আছে যে ভেতরে ঢোকার উপায় থাকবে না।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সব কাজ তখন আইনি প্রশ্নের মুখে পড়বে।

এই বৈধতার একমাত্র পথ গণভোটে ‘হ্যাঁ’।

নয়া দিগন্ত : জনাব আবু হেনা রাজ্জাকী, সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী : আপনাদেরও ধন্যবাদ। এত কষ্ট করে সময় দেয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা।