রুপারচর তলিয়ে যাওয়া এখনো অবিশ্বাস্য

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী ইউনিয়নের চর মোন্তাজের দক্ষিণে অবস্থান ছিল সোনার চর ও রুপারচরের। সোনার চরের ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণে ছিল রুপারচরের অবস্থান। ২০০৭ সালে দেশের উপকূলীয় এলাকা দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরের আগ পর্যন্ত ট্যুর গাইড কোম্পানিগুলো এই দুই চরে পর্যটকদের ঘুরতে নিয়ে যেত। কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত ভ্রমণে যাওয়া পর্যটকদের এই দুই সোনার চর ও রুপারচর ভ্রমণে প্রলুব্ধ করা হতো। তবে সিডরের পর আর রুপারচরের কথা বলে না ট্যুর গাইড প্রতিষ্ঠানগুলো। বলবে কিভাবে! সোনার চর জীববৈচিত্র্য বজায় রেখে এখনো টিকে থাকলেও সিডরে তলিয়ে গেছে রুপারচর।

Printed Edition
বঙ্গপসাগরের বুকে গাছের ডাল পুঁতে চিহ্নিত করা হয়েছে রূপার চরের আবারও জেগে ওঠা  :  রফিকুল হায়দার ফরহাদ
বঙ্গপসাগরের বুকে গাছের ডাল পুঁতে চিহ্নিত করা হয়েছে রূপার চরের আবারও জেগে ওঠা : রফিকুল হায়দার ফরহাদ

রফিকুল হায়দার ফরহাদ চর মোন্তাজ, পটুয়াখালী থেকে ফিরে

‘মহান আল্লাহ যে কী করতে পারেন তা রুপারচরের তলিয়ে যাওয়াই একটি উদাহরণ। একটি ৩০ বছরের বন কিভাবে এক রাতেই তলিয়ে গেল, কোনো অস্তিত্ব না রেখেই পানিতে মিশে গেল রুপারচর।’ বঙ্গোপসাগরের যে স্থানে ছিল রুপারচর সেখানে ট্রলারের ওপর দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন মাঝি শহীদুল হাওলাদার। পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী ইউনিয়নের চর মোন্তাজের দক্ষিণে অবস্থান ছিল সোনার চর ও রুপারচরের। সোনার চরের ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণে ছিল রুপারচরের অবস্থান। ২০০৭ সালে দেশের উপকূলীয় এলাকা দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরের আগ পর্যন্ত ট্যুর গাইড কোম্পানিগুলো এই দুই চরে পর্যটকদের ঘুরতে নিয়ে যেত। কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত ভ্রমণে যাওয়া পর্যটকদের এই দুই সোনার চর ও রুপারচর ভ্রমণে প্রলুব্ধ করা হতো। তবে সিডরের পর আর রুপারচরের কথা বলে না ট্যুর গাইড প্রতিষ্ঠানগুলো। বলবে কিভাবে! সোনার চর জীববৈচিত্র্য বজায় রেখে এখনো টিকে থাকলেও সিডরে তলিয়ে গেছে রুপারচর।

সাগরের বুকে দ্বীপ তথা চরের তলিয়ে যাওয়া বা আবার নতুন করে জেগে উঠাটা নতুন কিছু নয়। কিছু কিছু চর বা দ্বীপ ভাঙনের শিকার হয়ে কমে ক্ষীণ হয়ে যায়। হারিয়ে ফেলে অস্তিত্ব। কিন্তু এক রাতেই ৮-১০ কিলোমিটারের একটি ৩০ বছরের বড় বড় গাছওয়ালা একটি চর কিভাবে বিলীন হয়ে যায় তা আজও অবিশ^াস্য মনে হচ্ছে চর মোন্তাজসহ সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের।

গাছপালাহীন চর এবং সবুজ গাছপালায় ভরা চর বা দ্বীপ। বঙ্গোপসাগরের বুকে এভাবেই দুই ধরনের চরের উপস্থিতি। শুধু বালু আর কাদাপানির উপস্থিতি মানে এই চরে এখনও গাছ লাগানোর মতো পরিবেশ তৈরি হয়নি। আর এসব চর যখন গাছ লাগানোর উপযোগী হয় তখনই সেখানে গাছ লাগানো শুরু করে বন বিভাগ। এভাবেই পুরো উপকূলীয় দ্বীপে কোটি কোটি গাছ, যা পরিবেশ রক্ষার্থে বিশাল ভূমিকা রাখে। এসব বনের কাঠ যেমন স্থানীয় লোকদের নানান প্রয়োজন মেটায় তেমনি এই গাছগুলোর ফুল ও ফল বন্যপ্রাণী পশু পাখির খাবার। মধু উৎপাদনের অন্যতম মাধ্যম এই উপকূলীয় বনাঞ্চল। তেমনই এক পরিবেশবান্ধব বন ছিল রুপারচরে। কেওড়া, গেওয়া, বাইন, হরগুজি কাটা, কেয়া, হেতাল, গোলপাতা, করমজা, ছৈলা, লটকি কাঁটা (স্থানীয় নাম, যে গাছ দেখতে গোলাপ গাছের মতো), বিষাক্ত উরমাইল গোটা কী ছিল না এই রুপারচরে! কিন্তু এক সিডরই এক রাতে সব পানিতে মিশিয়ে দিয়েছে।

গাছপালা ঘেরা চরে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি খাল থাকে। এই খাল দিয়ে জোয়ারের পানি ওঠা নামা করে। এই খালে থাকে প্রচুর মাছ এবং জলজপ্রাণী। সোনার চরের মতো এই রুপারচরেও ছিল বেশ কিছু খাল। এই খালে এসে সাগরের মাঝ ধরা ট্রলারগুলো আশ্রয় নিতো। তারা এখন সোনার চরে, চর হেয়ারে আশ্রয় নেয়। সাগরে মাছ ধরা শেষে ট্রলারগুলো মাছ বিক্রি করার জন্য এই খালে আসে। সেখানে কেনাবেচা শেষে আবার এই ট্রলারগুলো সাগরে চলে যায়। রুপারচরের বনে সোনারচরের মতোই বন্য মহিষ, হরিণ, ভোঁদড়, বানর, সাপ, নানান জাতের সামুদ্রিক পাখি ছিল। এই সব কিছুই শেষ হয়ে গেছে ২০০৭ সালের সিডরের রাতে।

মাঝি আবদুর রশীদ জানান, আমি রুপারচরের নামায় (দক্ষিণে) অনেকবার মাছ ধরেছি। সিডরের ঠিক আগে আমিও ওই এলাকায় ছিলাম। কিন্তু সাগরের অবস্থা বেগতিক দেখে দ্রুত বাড়ি ফিরে আসি। তা না হলে হয়তো আমিও ভেসে যেতাম।’ যোগ করেন, ‘রুপারচর ছিল সোনার চরের মতোই। কিন্তু এক রাতেই সব শেষ। কেউ কি ভেবে ছিল এভাবে একটি চর বিলীন হয়ে যাবে।’

সাগরপাড়ের জেলেদের বৈশিষ্ট্য হলো প্রলয়ঙ্করী ঝড় বয়ে যাওয়ার পরদিনই তারা ফের সাগরে ছুটে যায় মাছ ধরার জন্য। একেতো তাদের জীবন-জীবিকা সবই সাগরে মাছ ধরাকেন্দ্রিক। একদিন মাছ ধরা বন্ধ থাকলে অনেক জেলের চুলায় আগুনও জ্বলে না। দ্বিতীয়ত ঝড়ের পরপরই অনেক জেলে ভয়ে সাগরে যান না মাছ ধরতে। ট্রলার ডুবে মারা যাওয়ার শঙ্কা থাকে। আবার আরেক গ্রুপ জেলে আছে তারা এই সময়ে সাহস নিয়ে সাগরে যান ¯্রফে ফাঁকা মাঠে গোল দেয়ার জন্য। অর্থাৎ অন্য জেলেদের অনুপস্থিতিতে নিজেরা গিয়ে একা একা বেশি করে মাছ ধরা। সিডরের পরদিন এই লোভেই সাগরে ফের ট্রলার চালান কিছু জেলে। কিন্তু রুপারচরের এলাকায় গিয়ে রীতিমতো বিস্মিত। ‘হায় হায় কোথায় গেল রুপার চর। এখানে না বিশাল বন ছিল। বড় বড় গাছ ছিল। কোথায় গেল সব। সাগরতো সব গিলে ফেলেছে।’ মাঝি শহীদুল হাওলাদার জানান, আমি রুপারচরের এলাকায় মাছ কিনতে যাইনি। তবে যারা ওই এলাকায় মাছ ধরে সেই জেলেরাই আমাদের কাছে এসে বিস্ময়ের সাথে রুপারচরের হারিয়ে যাওয়ার কাহিনী শোনাতে থাকে। সাথে বারবার মহান আল্লাহতায়ালাকে স্মরণ করতে থাকে।

অবশ্য আশার কথা সেই রুপারচর আবার জেগে উঠছে। এই তথ্য গত বছরই দিয়েছিলেন চর কুকরিমুকরির মাঝি জাকির বক্স। কারণ তিনিও মাছ ধরার পাশাপাশি পর্যটকদের নিয়ে বিভিন্ন চরে ঘুরে বেড়ান। চর মোন্তাজের রশীদ মাঝিও নিশ্চিত করলেন, ‘ফের জেগে উঠতে শুরু করেছে রুপারচর।’ ফলে এবার রুপারচরের সেই স্থানের সন্ধানেই চর হেয়ার থেকে পশ্চিম-দক্ষিণের চর তুফানিয়া, মায়া চর হয়ে শহীদুল মাঝির ট্রলার ছুটলো রুপারচরের দিকে।

আমরা যখন রুপারচরের এলাকায় পৌঁছালাম তখন বেলা ১টা। তবে রুপারচরের ডুবে থাকা অংশে আমাদের ট্রলার আটকে যাওয়ায় আর এগোনো যাচ্ছিল না। দূরে গাছের ডাল পুঁতে জেলেরা চিহ্ন দিয়ে রেখেছে রুপারচরের ভেসে উঠার অস্তিত্ব। সেখানে হাঁটু পরিমাণ পানি। গত বছর থেকেই এখানে রুপারচরের ভেসে ওঠা শুরু। জানান মাঝি আবদুর রশীদ। মাঝি এবং স্থানীয়দের মতে, এই চর ফের তলিয়ে যেতে পারে। আবার আরো ভেসে উঠতে পারে। ঠিক যেমনটা চর বিজয়, শিপচরের ক্ষেত্রে হয়েছিল। এই চর দুু’টি জেগে ওঠার পর আবার বিলীন হয়ে ফের জেগে উঠেছে। উল্লেখ্য কুয়াকাটার দক্ষিণ পূর্বে বঙ্গোসাগরের বুকে জেগে ওঠা চর বিজয় (বর্তমান নাম ভিক্টরি আইল্যান্ড) পর্যটকদের প্রিয় একটি স্পট। ফলে এই রুপারচর যদি আরো ভেসে উঠে উঁচু হয় তখন বনায়ন শুরু হতে আরো বেশ কয়েক বছর লেগে যাবে। তবে আশপাশে যেভাবে নতুন নতুন চর জেগে উঠছে তাতে রুপারচরকে ঘিরেও আশা করা যায়। যা পর্যটকদের জন্য যেমন নতুন একটি ভেনু হবে তেমনি বন্যপ্রাণী ও পাখিদের জন্যও হবে আশ্রয়স্থল। সে সাথে চরে খাল থাকলে সেই খালে ফের বিশ্রাম ও আশ্রয় নেয়ার নিরাপদ আস্তানা হবে জেলেদের।