পশ্চিমতীরের ইসরাইলি বসতিতে ব্রিটেন-ফ্রান্স-কানাডার নিষেধাজ্ঞা

দ্বিরাষ্ট্র সমাধান রক্ষার উদ্যোগ

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

অধিকৃত পশ্চিমতীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে দ্বিরাষ্ট্র নীতি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিয়েছে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও কানাডা। দেশগুলো অবৈধ বসতিতে উৎপাদিত পণ্য আমদানির ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। রয়টার্স।

ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড মিলিব্যান্ড এই সিদ্ধান্ত জানিয়ে বলেন, মানবিক বিপর্যয় এবং দ্বিরাষ্ট্র নীতি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঘটনা লন্ডন আর নীরবে মেনে নেবে না। একই সাথে তিনি পশ্চিম তীরে ইসরাইলি দখলদারিত্বকে সম্পূর্ণ বেআইনি এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর জাতিগত নিধনের শামিল বলে উল্লেখ করেন। তবে বার্ষিক প্রায় ৮১২ কোটি ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে এই নিষেধাজ্ঞার প্রভাব সামান্যই পড়বে, কারণ বসতি এবং মূল ভূখণ্ডের পণ্যের পার্থক্য নির্ধারণের স্পষ্ট রূপরেখা এখনো তৈরি হয়নি।

লন্ডনের হোয়াইট হল সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক আদালত (আইসিজে) কর্তৃক দেয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আলোকেই এ পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। ওই নির্দেশনায় ফিলিস্তিনি জমিতে ইসরাইলের অবস্থানকে বেআইনি আখ্যা দিয়ে বিশ্বের অন্য দেশগুলোকে বসতি বিস্তারের বিপক্ষে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার তাগিদ দেয়া হয়েছিল। প্রস্তাবিত এই আইন বলবৎ হলে অননুমোদিত এসব বসতির বাণিজ্যিক কোনো খাতে ব্রিটেনের নাগরিক কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ সম্পূর্ণ রুদ্ধ হয়ে যাবে।

ইতোমধ্যেই অধিকৃত ফিলিস্তিন সম্পর্কিত জাতিসঙ্ঘের বিশেষ প্রতিনিধি ফ্রান্সেসকা আলবানিজ মন্তব্য করেছেন যে, অবৈধ দখলদারিত্ব সমর্থন না করা রাষ্ট্রগুলোর আইনি বাধ্যবাধকতা। তিনি উল্লেখ করেন, এটিকে কোনোভাবেই সাধারণ পছন্দ হিসেবে নেওয়ার সুযোগ নেই এবং আন্তর্জাতিক আদালতের রায় কার্যকর করতে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। পাশাপাশি লেবার মুসলিম নেটওয়ার্ক ও ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার অব জাস্টিস ফর প্যালেস্টিনিয়ানস নামের দু’টি সংস্থা যুক্ত বিবৃতি জারি করে ব্রিটেনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার জন্য সরকারের ওপর জোর দাবি জানিয়েছে। সংস্থাগুলো জেনেভা সনদ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অক্ষুণœ রাখার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে। মূলত জেরুসালেমের পূর্ব অঞ্চলে কৌশলগত ‘ই-ওয়ান’ বসতি নির্মাণ পরিকল্পনা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের মধ্যে লন্ডনের এই সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। লন্ডনের এই মনোভাব সামনে আসতেই চরম উষ্মা প্রকাশ করেছে তেল আবিব। ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ব্রিটেনের যেকোনো বৈরী তৎপরতার বিপরীতে পাল্টা পদক্ষেপ নেয়া হবে।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী জাতিসঙ্ঘ ও অধিকাংশ দেশ এসব বসতিকে অবৈধ মনে করলেও ইসরাইল তা অস্বীকার করে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গাজায় সামরিক অভিযান ও পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের আগ্রাসন বৃদ্ধি পাওয়ায় লন্ডনের সাথে তেল আবিবের কূটনৈতিক সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। এ দিকে ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি এই নিষেধাজ্ঞাকে ইহুদিদের প্রতি বৈষম্যমূলক বলে দাবি করেছেন। তিনি সতর্ক করেন, ইসরাইলকে বয়কট করা সংস্থাকে বাদ দেয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকা মার্কিন অঙ্গরাজ্যগুলোতে ব্রিটিশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বাধার মুখে পড়তে পারে। বর্তমানে এই নতুন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় নেদারল্যান্ডস, আয়ারল্যান্ড, বেলজিয়াম, স্পেন ও নরওয়ের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হলো ব্রিটেন, ফ্রান্স ও কানাডা।

এই ঘোষণার পর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেল আবিব। ইসরাইলি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কারের দাবি জানিয়েছেন এবং জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির পূর্ব জেরুসালেমে অবস্থিত ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্য দিকে ইসরাইলি প্রেসিডেন্ট আইজাক হারজোগ এ পদক্ষেপকে দেশের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে ব্রিটেনের সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। মূলত জেরুসালেমের কাছে ইসরাইলের বিতর্কিত ‘ই-ওয়ান’ বসতি সম্প্রসারণ প্রকল্প নিয়ে সাম্প্রতিক এই উত্তেজনা। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রস্তাবিত স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ভূখণ্ড খণ্ডিত হয়ে যাবে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্যের জবাবে অর্থমন্ত্রী স্মোটরিচ গতকাল মঙ্গলবার পশ্চিমতীরের দু’টি আলাদা এলাকায় আরো এক হাজার নতুন আবাসন তৈরির পরিকল্পনা অনুমোদনের ঘোষণা দেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ফকল্যান্ড ইস্যুতে চাপ

এই চরম কূটনৈতিক উত্তেজনার পারদ আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ছেলে ইয়ার নেতানিয়াহু। বিতর্কিত ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টিনার অংশ হতে পারে বলে তিনি পরোক্ষ ইঙ্গিত দেন। এর পরই ওয়াশিংটনের সুরে পরিবর্তন দেখা যায় এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই দ্বীপপুঞ্জে লন্ডনের কর্তৃত্বের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আভাস দেন। একটি গণমাধ্যম সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্পষ্ট জানান, আর্জেন্টিনা যদি ফকল্যান্ডে নতুন করে আক্রমণ চালায়, তবে ব্রিটেনকে সমর্থন দেয়ার বিষয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি তিনি দেবেন না। ইরানের ওপর মার্কিন ও ইসরাইলি যৌথ সামরিক অভিযানের সময় যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা না পাওয়ার ক্ষোভও তিনি প্রকাশ করেন। অন্য দিকে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই সম্প্রতি বেশ কঠোর ভাষায় জানিয়েছেন, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে তাদের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণœ রাখতে তেল অনুসন্ধানকারী বিদেশী সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। পেন্টাগনের ফাঁস হওয়া নথিতেও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দরকষাকষিতে দ্বীপপুঞ্জটির নিয়ন্ত্রণকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা চলছে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট জটিল হলেও গাজার মানবিক পরিস্থিতির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ থেকে সরে আসেননি ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এডওয়ার্ড মিলিব্যান্ড। গাজায় দায়িত্ব পালনকারী ত্রাণকর্মীদের সাথে আলোচনা শেষে এক ভিডিওবার্তায় সেখানে চরম ভয়াবহতার চিত্র তুলে ধরে ব্রিটেনের শক্তিশালী ভূমিকার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি। যদিও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিলিব্যান্ড নিজে ইহুদি বংশোদ্ভূত এবং তার স্বজনরা ঐতিহাসিক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নির্মম গণহত্যার শিকার হয়েছিলেন।