নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকার কার্যত চলেছে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে শলাপরামর্শ ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে। শেখ হাসিনা ভারতে পালানোর মাধ্যমে বাহাত্তরের সংবিধানকে অকার্যকর করে গেছেন। ফলে একটা অলিখিত সংবিধানের অধীনে চলতে হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারকে। ওই সংবিধানের দোহাই দিয়ে ফ্যাসিস্ট রাজনৈতিক শক্তি ফিরে আসতে চাইলেও অবৈধ এ সংবিধানটিকে বৈধ ও সক্রিয় করে তোলার জোর প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে দেশের ভেতরে এবং বাইরে থেকে। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সংসদ নির্বাচন ও গণভোট থেকে শুরু করে যা কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে তা রাজনৈতিক ঐকমত্য ও ক্ষমতার ভারসাম্য সৃষ্টির কৌশল থেকেই হয়েছে। পরিকল্পনামাফিক এই রাজনৈতিক পরিবর্তন সংস্কারের দাবিকে জোরদারের পাশাপাশি বাহাত্তরের সংবিধানকে অকার্যকর করে দিয়েছে। তারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার প্রধানের শপথ থেকে শুরু করে সরকার পরিচালনা, সংস্কার প্রস্তাব বা নির্বাচন সব কিছুই বাহাত্তরের সংবিধান অনুযায়ী অবৈধ। কিন্তু তা বৈধ করার মধ্য দিয়ে কার্যত বাহাত্তরের সংবিধান ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নিয়ে রাজনৈতিকভাবে ব্যাকফুটে চলে গিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবার রাজনৈতিক সঙ্ঘাতে বাংলাদেশ ফিরে যাক একমাত্র ফ্যাসিস্ট শক্তি ছাড়া তা কেউ চায় না। বিরোধী দলগুলো ইতোমধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হয়েছেন শপথ নেয়ার মাধ্যমে। এখন তারা কৌশল নির্ধারণ করছে আগামীতে কিভাবে সংস্কার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া হবে তা নিয়ে। সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার পর বিএনপি দ্বিতীয় শপথের ট্রেনটি মিস করে রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বেশ কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। অনেকে মনে করছেন, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে বিএনপি ইস্যুটিকে অবজ্ঞা করেনি বরং দলটির ভেতর এ নিয়ে দ্বিধাবিভক্তি সৃষ্টি হওয়ায় শেষ পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ১৮০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া মাথায় রেখেই আগাবে বিরোধী দলগুলো। প্রয়োজনীয় কোরামের শর্ত হিসেবে ৬০ জন সংসদ সদস্যের বেশি সদস্য তাদের হাতে। কিন্তু এ নিয়ে সরকারি দল বাধার সৃষ্টি করলে বিষয়টি রাজপথে গড়াবে এবং সঙ্ঘাতের শঙ্কা রয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত পরিস্থিতিতে নতুন রাজনৈতিক সঙ্ঘাতে যে চরম সঙ্কট তৈরি হবে তা কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে সামাল দেয়া সম্ভব হবে না।
এ ছাড়া ব্যারিস্টার তানিয়া আমির দেশের বাইরে থেকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনে বিরোধী দল দ্বিতীয় শপথ নেয়ায় সংসদ সদস্য হিসেবে প্রথম শপথটি অকার্যকর হয়ে যাওয়ার যে কথা বলেছেন তা হাস্যকর বলে নাকচ করে দিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির বলেন, বাহাত্তর সালে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কোনো শপথ না হওয়ায় শেখ মুজিবুর রহমান নিজেই অবৈধ ছিলেন। তানিয়া আমির আদেশ ও অর্ডিনেন্সের মধ্যে পার্থক্য বোঝেননি। একটা অলিখিত সংবিধানের অধীনে চলছি। ইউনূস সরকার চলেছে। সেই কারণে জুলাই সনদ ইটসেল্ফ ইউনূস সরকারের বৈধতা। পঞ্চম বা সপ্তম সংশোধনীর মতো পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশনে ইউনূস সরকারের সব কাজকে বৈধতা দিতে হবে এমন কোনো বিষয় নেই। জুলাই সনদে বলাই আছে শপথ কার কাছে নিতে হবে। বিএনপি যে বলছে আইন করবে, পাস করবে- এটা তো তফসিলে নেই। কার অধীনে শপথ নেবেন এটা অলরেডি জুলাই সনদে বলা আছে। এর বাইরে গিয়ে শপথ নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। সংবিধানে নব্বই দিনের মধ্যে শপথ নেয়ার বাধ্যবাধকতা থাকায় এ সময়সীমা পার হলে বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদে শপথ নিতে পারবে না। ম্যান্ডেটরি হচ্ছে প্রথম অধিবেশন থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করতে হবে। নব্বই দিনের মধ্যে যদি বিএনপি শপথ না নেয় তা হলে ১৮০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় কোরাম বিরোধী দলের হাতে থাকায় সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন অটোমেটিক্যালি হয়ে যাবে। এখানে দুই-তৃতীয়াংশের কথা বলা হয় নাই, বলা হয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট। ৬০ জন সংসদ সদস্যের কোরামে আরো কয়েকজন সমর্থন দিলেই এ পরিষদ গঠন করা যাবে। বিএনপি জুলাই সনদকে চ্যালেঞ্জ করলে নির্বাচনই অবৈধ হয়ে যাবে। এসব বিষয় নিয়ে রিট দায়েরকে চক্রান্ত হিসেবে অভিহিত করেন তিনি।
শাহরিয়ার কবির বলেন, চতুর্থ সংশোধনীর পর সংবিধান খেয়াল করলে দেখবেন সিএমএলের (চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর) রাষ্ট্রপতি হওয়ার কোনো বিধান তাতে ছিল না। ১৯৭৭ সালে জাতির প্রয়োজনে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সিএমএল থেকে রাষ্ট্রপতি হলেন। তিনি সে সময় রাষ্ট্রপতি না হলে বাংলাদেশ অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়ত। ওই তৃতীয় তফসিলে সিএমএলের শপথ রাষ্ট্রপতি হিসেবে নেবেন ছিল না। দ্বিতীয়ত, পঁচাত্তর সালে তখন সেখানে রেফারেন্ডামের কোনো প্রবিধান ছিল না। বাংলাদেশের প্রথম রেফারেন্ডাম দেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। রেফারেন্ডামে আপনি আমাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে গ্রহণ করেন কি করেন না সেই হ্যাঁ/না ভোট। শহীদ রাষ্ট্রপতি ছাড়া তো বিএনপি নেই। তা হলে বিএনপির জন্মই হলো সংবিধানের বাইরে থেকে। এবার নির্বাচনের আগে বলা হলো জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হবে গণভোটের মাধ্যমে। তারও আগে অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস সংবিধানের থার্ড শিডিউল অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নিলেন। কিন্তু সংবিধানে কেয়ারটেকার সরকার বা ইনটেরিম সরকারের কিছু কি ছিল? সংবিধানের একটি মানবেন অপরটি মানবেন না তা কী করে হয়? ইউনূস সরকার সংবিধানের তৃতীয় তফসিল অনুযায়ী গঠিত হয় নাই। তা হলে গত আঠারো মাসে ইউনূস সরকার যা কিছু করেছেন সব অবৈধ, নির্বাচন অবৈধ, ক্যাবিনেট গঠন অবৈধ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অবৈধ। জুলাই তফসিলে দেখেন সংবিধান সংস্কার পরিষদের ফর্ম দেয়া আছে। জুলাই সনদ ও সংবিধান অনুযায়ী গত ১৮ মাস অন্তর্বর্তী সরকার চলেছে। ঐকমত্যের ভিত্তি থেকেই সংবিধান অনুসারে নির্বাচন ২০২৯ সালে না করে গত ১২ ফেব্রুয়ারি করলাম। কনসেনসাস কমিশন ঐকমত্যের ভিত্তিতে করলাম। জুলাই সনদ স্বাক্ষর করলাম। কোনো কিছুই সংবিধানে ছিল না। এখন হঠাৎ সকালে বলছেন সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন, আঠারো মাস তাই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হতে শপথ নিতে পারব না। এ কথা গণভোট হওয়ার আগে কেনো বললেন না। আর শিডিউল দেয়া হলো গত বছর ১৩ নভেম্বর। এর পর এত রিট হলো ১৩ নভেম্বরের শিডিউল নিয়ে চ্যালেঞ্জ করলেন না কেনো? বরং এক আইনজীবী রিট করলেন এই নির্বাচন হবে না, এটা অবৈধ। সেই রিট খারিজ করে দেয়া হলো। নির্বাচন কমিশনের হাতে সব ক্ষমতা। আগের দিন চিঠি দিয়ে নির্বাচন কমিশন দুইটি শপথ নেয়ার কথা বললেন। আপনি শপথ নেয়ার আগেও বললেন না একটি নিবেন আরেকটি নিবেন না। এখন শপথ না নিলে কী হবে, যেমন আমরা বলি হাসিনা ফেরত আসল, না ফেরত গেল তাতে কী হবে।
সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সংসদকে অবজ্ঞা : সুুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আবু হেনা রাজ্জাকী বলেন, সংসদে যখন কেউ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যায় তখন যদি সে কোনো কিছু কেয়ার না করে, অবহেলা করে, অবজ্ঞা করে কিছু করার নাই। আইনে সব কিছু থাকে না। সমঝোতার ভিত্তিটাই আসল। এখন কথা তুলছি আইনে গণভোট নাই, কিন্তু গণভোট মেনে নিয়েছি, সরকার গণভোট নিয়ে একটা অধ্যাদেশও জারি করেছে। তাতে বলা আছে গণভোট কিভাবে কার্যকর হবে। না হলে সেটা ভিন্ন কথা। গণভোট মেনে নিয়ে নির্বাচনের সময় বললাম ‘হ্যাঁ’ ভোট দাও। নির্বাচনের পর দুইটি শপথ নেয়ার কথা। একটি নিলেন অন্যটি নিচ্ছেন না, কী করার আছে? আপনি শপথ নিলেন না বলে কেউ যদি মন্ত্রিপরিষদের শপথে না যায় তো তাদেরইবা কী করার আছে? ফ্রম ডে ওয়ান একটা মতবিরোধ, একটা অনৈক্য যেটা চলমান ছিল আট মাস, সেই শঙ্কার জায়গা তো রয়েই গেল। পার্লামেন্টে আইনী লড়াইটাও তো একটা শঙ্কা। সংবিধানে দুইটা শপথের কথা নাই তো সেই সংবিধান অনুযায়ী তো নির্বাচনটা হতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় তিন মাস থাকতে তো সেই নির্বাচন হওয়ার কথা। সেই সংবিধান থাকলে তো নব্বই দিন বা কোনো কারণে না হলে আরো নব্বই দিন বা ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা। সেখানে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন করলাম কী হিসাবে? আমরা মেনে নিয়েছি বলে। এটাই আইন। তো লিখিত নাই যদি বলেন তো অন্তর্বর্তী সরকারের কথা কি সংবিধানে লিখিত ছিল? অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন দিলো, আমার পক্ষে এলো আমি মেনে নিলাম, কিন্তু গণভোট মানলাম না, শপথ নিলাম না, কিছু করার নাই। বাংলাদেশে এসব নতুন নয়, ৫৩ বছরের ইতিহাসই এরকম। কিন্তু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে সংবিধানে ঢুকবেন কিভাবে? নির্বাচন ওই সংবিধানের আলোকে দেয় নাই। আইনের বিধানটাই এমন যে দুই পক্ষ আপসে এলে কারো কিছু করার নাই। গণভোট, নির্বাচন নিয়ে আপসে আসার পর এখন এখান থেকে সরে গেলে সেটা ভিন্ন কথা। তাতে নতুন কিছু পাওয়া গেল না। দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ে সংসদে বসে গেলে ভবিষ্যতে কী কনসিয়েন্স হয় সেটা ভবিষ্যতেই দেখা যাবে।
বিএনপির হঠকারী সিদ্ধান্ত : সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিশির মনির জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে পদ্ধতিগত জটিলতা হতাশাজনক উল্লেখ করে বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে স্পষ্ট করে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা, অভিপ্রায়ের ভিত্তি ও অন্তর্বর্তী সরকারের পরামর্শের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতির আদেশের কথা উল্লেখ রয়েছে। রাষ্ট্রপতি আদেশ জারির এ ক্ষমতা পেয়েছে অভ্যুত্থান থেকে। কোনো ব্যক্তি বা সরকার থেকে নয়। এই আদেশে বলা আছে যারা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন, তারা একই দিন সংবিধান সংস্কার সভার শপথ গ্রহণ করবেন। সংসদ সদস্যদের যিনি শপথ পড়ান তিনিই এ শপথ পড়াবেন। বিএনপি এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত নেবে স্বপ্নেও ভাবিনি। বিএনপি নেতা বলছেন, সংবিধানে সংস্কার পরিষদের কথা উল্লেখ নাই, কোথায় নাই, উনি রাষ্ট্রপতির আদেশের আট নম্বর পড়েন নাই? সংবিধানে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হবে এটা ছিল? সংবিধানে গণ-অভ্যুত্থান ছিল? সংবিধানে এত লোক মারা যাওয়ার পর সরকার পালিয়ে যাবে এটা ছিল? সংবিধানে প্রধান বিচারপতি পালিয়ে যাবে এটা ছিল? সংবিধানে বায়তুল মোকাররমের খতিব পালিয়ে যাবে এটা ছিল? এসব কিছুই মেনে নিয়ে এখন সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে বলছেন সংবিধানে নাই।
ঐকমত্যের জায়গায় নোট অব ডিসেন্ট প্রসঙ্গে শিশির মনির বলেন, প্রশ্নটা হচ্ছে যেসব বিষয়ে একমত হয়েছেন সেগুলোতে কী করবেন? এগুলো বাস্তবায়নের তরিকা হচ্ছে সংবিধান সংস্কার সভা। নরমালি দেখা গেছে, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে পার্লামেন্টে যে কয়টা সংশোধন হয়েছে তার সবগুলো পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ হয়ে অসাংবিধানিক ঘোষণা হয়ে গেছে। পঞ্চম সংশোধনী, অষ্টম সংশোধনীর মতো বেশ কিছু সংশোধনী পরবর্তীতে অসাংবিধানিক হয়ে গেছে। ওগুলোতো সংসদেই পাস করা হয়েছিল। অবশ্যই করেছে। এই জন্য সংবিধান সংস্কার সভার কথা চিন্তা করেছিলাম যেখানে আলোচনার ভিত্তিতে সংশোধন হলে পরবর্তীতে তা আদালতে চ্যালেঞ্জযোগ্য হবে না। এই প্রটেক্টিভ মেজারটা নেয়া হলো। আসলেন ক্ষমতায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠে, অথচ গত বছর ১৩ নভেম্বর আদেশ জারি করা হয়েছে। তো এত দিন বলেননি কেনো মানবেন না? যেই ইলেকশন হয়ে গেল, দুই শতাধিক আসন পেয়ে গেলেন, পুরোপুরি চেহারা চেঞ্জ হয়ে গেল! আইনে বলা আছে যে দিন সংসদ সদস্যদের শপথ হবে, একই শপথ অনুষ্ঠানে এই আদেশের সংবিধান সংস্কার সভার শপথ নিতে হবে। একই শপথ অনুষ্ঠান আবার একটি পাবেন? সংসদে বসে আলোচনার মাধ্যমে শপথ নেয়ার কথা বলা হচ্ছে কিন্তু আপনি যে আইনটি মানলেন না প্রথম দিনই। কেনো এই ছক্কা পেটাতে গেলেন, কেনো হাম্বল হলেন না? অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে এ নিয়ে কোনো আলোচনা করা হয়নি। আলোচনা করে বলতে পারতেন সংসদে আলোচনা করেই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। পরবর্তী সংসদের অধিবেশনে এর ফয়সালা হয়ে যেত। হঠকারী অহঙ্কারী সিদ্ধান্ত দেখালেন, সেটা কী? দুই শতাধিক সিট পেয়ে গেছি, বাকিরা? মিয়া বিবি রাজি তো কেয়া কোরেগা কাজী, তো তাই হবে।
আন্তর্জাতিক মিডিয়ার পর্যবেক্ষণ : সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে বিএনপির শপথ না নেয়ার দিকে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলো। দি ডিপ্লোম্যাট, ডয়েচে ভেলে, আলজাজিরা থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়া দ্বিতীয় শপথ থেকে বিএনপির সরে আসার বিষয়টি বিশ্লেষণ করে বলছে, নির্বাচনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি শুরুতেই হোঁচট খেয়েছে। এখন এ পরিস্থিতি বিপজ্জনক দিকে মোড় নিতে পারে।
দি ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের গভর্নেন্স অ্যান্ড পলিটিক্স ক্লাস্টারের উপদেষ্টা মির্জা এম হাসান বলেন, বিএনপি যদি একটি সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করত তবে এটি গণতন্ত্রের জন্য স্বাস্থ্যকর হতো, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিযোগিতা হ্রাস করে এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে এই ধরনের অপ্রতিরোধ্য ম্যান্ডেট প্রায়ই অপব্যবহার করা হয়েছে। শেখ হাসিনার আমল ছিল এর সবচেয়ে চরম উদাহরণ। এই ধরনের আধিপত্য ক্ষমতাসীন দলকে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতায় বিস্তৃত করে। তিনি বলেন, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা স্বভাবতই বিপজ্জনক, কারণ এটি সরকারকে সংবিধান সংশোধন, আইন পরিবর্তন করতে- মূলত তার স্বার্থ অনুসারে ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করতে দেয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রেও, বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক প্রকৌশল থাকতে পারে। এখন আমরা বিএনপির প্রকৃত রাজনৈতিক চরিত্র দেখতে পাবো, কিন্তু এখন থেকে দুই বছর পর কী হবে তা অনিশ্চিত। বাংলাদেশের অস্থিরতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে এবং বিএনপি সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শাসন করতে পারবে কি না তা এখনো একটি উন্মুক্ত প্রশ্ন।
ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের গ্লোবাল স্টাডিজ অ্যান্ড গভর্নেন্সের প্রভাষক খন্দকার তাহমিদ রেজোয়ান সংবাদ মাধ্যম আলজাজিরাকে বলেন, গণভোট আগামী মাসগুলোতে বিশেষ করে বিএনপি এবং জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে একটি প্রধান বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।
ডয়েচে ভ্যালের এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম হচ্ছে, ‘বেঁকে বসেছে বিএনপি, জুলাই সনদ নিয়ে রাজনৈতিক সঙ্কটের আভাস?’
টকশোতে তুমুল বিতর্ক : টেলিভিশনগুলোর বিভিন্ন টকশোতে তুমুল বিতর্ক চলছে বিষয়টি নিয়ে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক আশরাফ কায়সার বলেন, জুলাই সনদ সংবিধান অনুযায়ী হয়নি। নির্বাচনও হয়নি। সাংবিধানিকভাবে হলে তো ২০২৯ সালে হবার কথা নির্বাচন। সরকার ও বিরোধী দলকে নতুন বাস্তবতা উপলব্ধি করতে হবে, মৌলিক জায়গায় একমত হতে হবে সংবিধানের দোহাই দেবো কি না। সংসদ সদস্যের শপথ নিয়েও বিতর্ক উঠতে পারে। অতীতে সংবিধানের দোহাই শুনতে শুনতে বাংলাদেশের মানুষের কান ঝালাপালা হয়ে গিয়েছিল। শেখ হাসিনা সব অত্যাচার ও অনিয়ম করার সময় প্রায়ই সংবিধানের কথা বলতেন। এটার রেফারেন্স অত ভালো না। এখন রাষ্ট্র সংস্কার ও সংসদকে প্রাণবন্ত রাখা, সংসদে বিরোধী দলের জন্য সম্মানজনক ভূমিকা তৈরি করা যাবে না যদি না সংস্কার প্রক্রিয়াকে মেনে না নেন। সরকারি ও বিরোধী দলকে টেবিলে বসে একমত হতেই হবে। রাজপথে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। জাতীয় ঐকমত্য ও ক্ষমতার ভারসাম্য খুবই জরুরি।
মাঠ গরম হচ্ছে : মাঠের বক্তৃতায় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ প্রশ্ন তুলেছেন, ‘তারেক রহমান স্পষ্ট করুন আপনার মুখ ও বিবেক কোথায় বর্গা দেওয়া আছে। দীর্ঘ সতেরো বছর বিএনপি জামায়াতের অসংখ্য নেতাকর্মী গুম হয়েছে, খুন হয়েছে এই রাষ্ট্র ব্যবস্থা সংস্কারের জন্য। আজকে রাষ্ট্র ব্যবস্থা সংস্কারের সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হওয়ার পর অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় কিছ ুদিন পর শুনতে পাব হাসিনা ছাড়া ফ্যাসিবাদ ব্যবস্থার সব কিছুই রেখে দেওয়া হবে। তারা লজ্জায় বলতে পারছে না হাসিনা ব্যবস্থার বিচার ব্যবস্থা ভালো, হাসিনার পুলিশ ভালো, হাসিনার প্রশাসন ভালো, কেবলমাত্র হাসিনাই ভালো না। আজকে হাসিনার সব ব্যবস্থাই টিকিয়ে রাখতে চাচ্ছেন। এই তরুণ প্রজন্মের কাঠগড়ায় আপনাদের দাঁড়াতে হবে। অসংখ্য লক্ষ তরুণ প্রজন্ম যারা প্রধানমন্ত্রী হতে আসে নাই, শুধু দেশকে ভালোবেসে, বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে হাসিনাকে ভারতে পালাতে বাধ্য করেছে। যারা হাসিনার ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে চাইবে, আমার ভাই আবরার ফাহামের মতো, হাদির মতো, আলিফের মতো আমরা যুগে যুগে রাস্তায় নেমে আসব ইনশা আল্লাহ।’ হাসনাত বলেন, বাংলাদেশ দুই ভাগে স্পষ্টতই বিভক্ত। এক ভাগ গোলামিকে বরণ করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, আরেক ভাগ আজাদীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এক ভাগ ভারতীয় আধিপত্যের কাছে মাথা নত করেছে, আরেক ভাগ ভারতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। আমাদের পথ লম্বা, চলার পথ অনেক দীর্ঘ, আমাদেরকে সুপ্ত, গুপ্ত এই ধরনের তৃতীয় শ্রেণীর ভাষা দিয়ে আবার হত্যাযোগ্য করে তোলার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।



