দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এই দু’টি মৌলিক সেবার সরবরাহ এখনো স্থিতিশীল হয়নি। প্রাথমিক জ্বালানি নিশ্চিত না করেই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। এতে দেশের চাহিদার চেয়ে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে ৫০ শতাংশ। কিন্তু এ উৎপাদন সক্ষমতার সাথে বিনা দরপত্রে দায়মুক্তি আইনে দলীয় লোকদের অনুমোদন দেয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বাড়তি কেন্দ্রভাড়া যুক্ত করে চুক্তি করা হয়। এর ফলে প্রতি বছরই বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেই ক্যাপাসিটি চার্জের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে নেয়া হচ্ছে। এক পরিসংখ্যান মতে, আওয়ামী লীগের দেড় দশকের মধ্যে শেষ ১০ বছরে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বাড়তি দেয়া হয়েছে এক লাখ কোটি টাকার ওপরে। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে দেয়া এ বিপুল অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বাস্তবতায় নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে দায়মুক্তি আইনে দেয়া বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করা। ইতোমধ্যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এ খাতে বছরে লোকসান গুনছে ৫০ হাজার কোটি টাকা।
কী পরিমাণ বাড়তি সক্ষমতা রাখতে হয় : বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রো-ভিসি ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরীর মতে, বিদ্যুতের চাহিদার চেয়ে সাধারণত বাড়তি উৎপাদন সক্ষমতা ২০ থেকে ২৫ শতাংশ রাখতে হয়। সে অনুযায়ী আমাদের গড় চাহিদার চেয়ে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে ৫০ শতাংশ বেশি। বর্তমানে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াট। বাড়তি উৎপাদন সক্ষমতার কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া বেড়ে যাচ্ছে। পিডিবির পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, গত দেড় দশকে বিদ্যুৎকেন্দ্রকে পরিশোধ করা বিল ১১ গুণ বাড়লেও কেন্দ্রভাড়া বেড়েছে প্রায় ২০ গুণ। বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানিকে পরিশোধ করা বিলের সবচেয়ে প্রধান অংশ এখন কেন্দ্রভাড়া। পিডিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন না বাড়লেও বা কমলেও চুক্তির কারণে কেন্দ্রভাড়া বেড়েই চলছে। কিছু নির্দিষ্ট প্রকল্পের ক্ষেত্রে এই অসামঞ্জস্য অত্যন্ত বেশি। বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করে গত ২৫ জানুয়ারি বিদ্যুৎ এ সংক্রান্ত কমিটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে প্রায় সাত হাজার ৭০০ থেকে সাড়ে ৯ হাজার মেগাওয়াট অতিরিক্ত বা অলস বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। অলস বসে থাকা এ সক্ষমতার পেছনে বছরে ৯০ থেকে ১৫০ কোটি ডলার (১১ হাজার থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা) কেন্দ্রভাড়া দিতে হচ্ছে।
১০ বছরে কী পরিমাণ ভাড়া পরিশোধ করা হয়েছে : পিডিবির পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরের মধ্যে শেষ ১০ বছর সময়ে (২০১৪ থেকে ২০২৪) ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করা হয়েছে এক লাখ কোটি টাকার ওপরে। বিদ্যুৎ না নিয়েই ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পিডিবির লোকসান বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। গত এক বছরের ব্যবধানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ বেড়েছে প্রায় ৮ শতাংশ। এক বছরে শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া বেড়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। গত বছরে এ ভাড়া পরিশোধ করা হয়েছে ৪২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ আগের বছরের চেয়ে ১০ হাজার কোটি টাকা বেশি।
উৎপাদন ব্যয়বৃদ্ধির কারণ : তিনটি কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে বলে মনে করছেন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কর্মকর্তারা। তারা বলেন, তুলনামূলক সস্তা জ্বালানি হিসেবে পরিচিত গ্যাসের সরবরাহ কমেছে। এর ফলে গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমেছে। এর বিপরীতে উচ্চমূল্যের জ্বালানি তেল দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সচল রাখা হয়েছে। এসব কারণে উৎপাদন খরচ কমানো যায়নি। ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় যুক্ত হয়েছে বাড়তি খরচ।
চুক্তি অনুসারে সরকারি-বেসরকারি সব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনে নেয় পিডিবি। বিদ্যুৎ উৎপাদন করুক আর না করুক, প্রতিটি কেন্দ্রে চুক্তি অনুসারে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়। এটি কেন্দ্রভাড়া হিসেবে পরিচিত।
পিডিবি সূত্র বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ২৪ হাজার ৯১১ মেগাওয়াট। ওই বছর কেন্দ্রভাড়া দিতে হয়েছে ২৫ হাজার কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়ায় ২৮ হাজার ৯৮ মেগাওয়াট, কেন্দ্রভাড়া ছিল ৩২ হাজার কোটি টাকা। ১০টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি নবায়ন না করায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সক্ষমতা কমে হয় ২৭ হাজার ৪১৪ মেগাওয়াট। এবার কেন্দ্রভাড়া দিতে হয়েছে ৪২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কেন্দ্রভাড়া বেড়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা।
ভারত থেকে প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করা হয় প্রতিদিন। এ বিল ডলারে পরিশোধ করতে হয়। এ ছাড়া যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদেশী ঋণ আছে, তার কিস্তি পরিশোধ করতে হয় ডলারে। আগের বছরের তুলনায় ডলারের দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১২ টাকা। এতে পিডিবির খরচ বেড়ে গেছে।
বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্র ১৩৫টি। এর মধ্যে বেসরকারি হলো ৬৮টি। পিডিবির দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, টাকায় পরিশোধ করা হলেও বেসরকারি সব বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল হিসাব করা হয় ডলারে। পিডিবির বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, গত অর্থবছরে বাংলাদেশ পিডিবির বিদ্যুৎ উৎপাদন ও কেনার পেছনে খরচ বেড়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ। এতে খরচ হয়েছে এক লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা। আগের বছর এটি ছিল এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা। মূলত বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ কিনতে গিয়েই খরচটা বেড়েছে। বেসরকারি খাতে স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের (আইপিপি) কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার খরচ বেড়েছে ২৫ দশমিক ৬১ শতাংশ। এ খাতেই খরচ হয়েছে ৭২ হাজার কোটি টাকা। প্রতি ইউনিট (কিলোওয়াট-ঘণ্টা) আইপিপি বিদ্যুতের দাম পড়েছে ১৪ টাকা ৫৬ পয়সা, যা আগের বছর ছিল ১৩ টাকা ১৬ পয়সা।
প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ১২ টাকার বেশি খরচ হলেও পিডিবি বিক্রি করে ৭ টাকা ৪ পয়সায়। প্রতি বছর পিডিবির আর্থিক সঙ্কট বাড়ছে। সরকারের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি নিতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতে গত অর্থবছরে ভর্তুকি নিয়েছে ৫৯ হাজার কোটি টাকা।
নতুন সরকারের জন্য এ বাড়তি ক্যাপাসিটি চার্জ বহন করাই হবে অন্যতম চ্যালেঞ্জ। যদিও আন্তর্বর্তীকালীন সরকার শেষ সময়ে ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা কমানোর জন্য বেশ কিছু সুপারিশ করে গেছে। ধীরে ধীরে ক্যাপাসিটি চার্জ কমানোরও পরামর্শ দেয়া হয়েছে। নতুন সরকার এসব সুপারিশ কতটুকু বাস্তবায়ন করে সেটাই এখন দেখার বিষয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বছরভিত্তিক ক্যাপাসিটি চার্জ
অর্থবছর টাকা (কোটি)
২০১৪-১৫ ৬,৫০০
২০১৫-১৬ ৮,৯০০
২০১৬-১৭ ১০,২০০
২০১৭-১৮ ১২,০০০
২০১৮-১৯ ১৩,৫০০
২০১৯-২০ ১৫,০০০
২০২০-২১ ১৬,০০০
২০২১-২২ ১৭,০০০+
২০২২-২৩ ২০,০০০+
২০২৩-২৪ ২৬০০০



