মুফতি আহমাদুল্লাহ মাসউদ
রিজিক হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে সেই সব অনুগ্রহ ও উপকরণ যা মানুষের জীবনকে উপকৃত করে। এটি শুধু টাকা-পয়সার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং রিজিকের মধ্যে রয়েছে শস্যের শাক-সবজি, ফল, ব্যবসায়-বাণিজ্য, এমনকি সুস্থ দেহ-মন, উত্তম স্ত্রী, নেক সন্তান এবং আধ্যাত্মিক কল্যাণও। বলা হয়ে থাকে : রিজিকের সর্বনিম্ন স্তর হচ্ছে টাকা-পয়সা, অর্থ-সম্পদ। আর সর্বোচ্চ স্তর হচ্ছে : শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা। এমনিভাবে রিজিকের সর্বোত্তম স্তর হচ্ছে- পুণ্যবান স্ত্রী এবং পরিশুদ্ধ নেক সন্তান এবং রিজিকের পরিপূর্ণ স্তর হচ্ছে, মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি।
আল্লাহ তায়ালা প্রতিটি প্রাণীর জন্য নির্দিষ্ট করেছেন রিজিকের সীমা। কোনো প্রাণই মৃত্যুবরণ করবে না যতক্ষণ না তার ভাগ্যে নির্ধারিত রিজিক সে গ্রহণ করে।
নির্ধারিত রিজিক আসবেই : আল্লাহ তায়ালা তাঁর অসীম হিকমতে প্রতিটি বান্দার জন্য রিজিক আগে থেকেই নির্ধারণ করে রেখেছেন। কুরআনে তিনি ঘোষণা করেছেন, পৃথিবীতে যত জীবজন্তু আছে, তাদের রিজিক আল্লাহর ওপরই ন্যস্ত। (সূরা হুদ-৬)
এক হাদিসে রাসূল সা: হজরত ইবনে আব্বাস রা:-কে বলেছেন, ‘হে আব্বাস তনয়! জেনে রেখো, সমগ্র বিশ্ব যদি একত্র হয়ে তোমাকে কিছু দিতে চায়, তাহলে তারা কেবল সেটুকুই দিতে পারবে, যা আল্লাহ তায়ালা তোমার জন্য নির্ধারণ করেছেন (এর চেয়ে বেশি কিছু তোমাকে তারা দিতে পারবে না)। এমনিভাবে সমগ্র বিশ্ব যদি একত্র হয়ে তোমার কোনো ক্ষতি করতে চায় (বা তোমার কোনো নির্ধারিত কোনো রিজিক ছিনিয়ে নিতে চায়), তারা কেবল সেটুকুই পারবে, যা আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন (এর বেশি কিছু তারা পারবে না)। (তিরমিজি-২৫১৬) অন্য এক হাদিসে রাসূল সা: বলেন, ‘কোনো প্রাণ মৃত্যুবরণ করবে না, যতক্ষণ না সে তার নির্ধারিত রিজিক ও সময় পূর্ণ করে নেয়। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো এবং হালাল পথে রিজিক অনুসন্ধান করো।’ (মুসতাদরাকে হাকিম-২১৪৬)। এ থেকে স্পষ্ট হয়, বান্দার জন্য আল্লাহ যে রিজিক নির্ধারণ করেছেন তা তার কাছেই পৌঁছাবে। মানুষ যতই ছুটোছুটি করুক কিংবা অন্য কেউ যতই কৌশল অবলম্বন করুক, তার নির্ধারিত রিজিক কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না। বান্দার কর্তব্য শুধু হালাল পথে চেষ্টা করা, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং সন্তুষ্টচিত্তে তাঁর লিখে দেয়া তাকদির মেনে নেয়া।
রিজিকের প্রকারভেদ : অনেক মানুষ মনে করে রিজিক শুধু অর্থ-সম্পদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এটি রিজিকের একটি সঙ্কীর্ণ ধারণা মাত্র। রিজিকের ধরন এত বৈচিত্র্যময় যে, তা কেবল অর্থের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের জীবনের প্রায় সব দিককেই তা অন্তর্ভুক্ত করে। মানুষের যা কিছু তার জন্য কল্যাণকর ও উপকারী, এই সব কিছুই রিজিকের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দার জীবনযাত্রা সহজ করার জন্য যে অনুগ্রহগুলো দান করেন, সেগুলোই নানা প্রকারের রিজিক। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো :
ঈমানের রিজিক : যে ব্যক্তি তার রবের প্রতি ঈমান আনে, আল্লাহতে বিশ্বাস করে, সে প্রকৃত অর্থে মহান রিজিকের অধিকারী। কেননা, রিজিকের মূল বৈশিষ্ট্য হলো- এটি মানুষের উপকারে আসে এবং কল্যাণ বয়ে আনে। আর ঈমান এমন এক রিজিক, যা মানুষকে জান্নাতে প্রবেশ করায় এবং দুনিয়া ও আখিরাতে পরম সুখ দান করে।
জ্ঞান ও প্রজ্ঞার রিজিক : জ্ঞান ও প্রজ্ঞা হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান দান। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন- যাকে প্রজ্ঞা দান করা হয়েছে, তাকে বাস্তবিক অর্থেই বিপুল কল্যাণ দান করা হয়েছে। একইভাবে দ্বীনের গভীর উপলব্ধি ও ফিকহও এক বিশাল রিজিক। রাসূল সা: বলেছেন, ‘আল্লাহ যার জন্য কল্যাণ চান, তাকে দ্বীনের ফিকহ (বিশুদ্ধ গভীর বুঝ) দান করেন।’
স্বাস্থ্য ও সুস্থতার রিজিক : স্বাস্থ্য এমন এক মহামূল্যবান রিজিক, যা অনেক মানুষের কপালে জুটে না। যার শরীর সুস্থ, সে যেন পুরো দুনিয়ার মালিক। ঈমানের পর দুনিয়ায় এমন আর কোনো নিয়ামত নেই, যা সুস্থতা ও নিরাপদ দেহের সমকক্ষ হতে পারে।
ধন-সম্পদের রিজিক : এটিই মানুষের কাছে সবচেয়ে পরিচিত রিজিক। মানুষ এর মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে, প্রয়োজন মেটায় এবং নিজে ও পরিবার-পরিজনকে নিয়ে উপকৃত হয়।
পুণ্যবতী স্ত্রীর রিজিক : একজন নেককার স্ত্রী আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত এক বিশেষ রিজিক। এ বিষয়ে রাসূল সা: বলেন, ‘দুনিয়াতে উপকার অর্জনের অনেক সামগ্রী রয়েছে। তবে, তার মধ্য থেকে পুণ্যবতী স্ত্রীর তুলনায় উত্তম আর কিছু নেই।’ (মুসলিম-৩৫৩৫)
নেককার সন্তানের রিজিক : সৎ-ধার্মিক সন্তান দুনিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ রিজিক। কারণ বদকার সন্তান বাবা-মা ও সমাজ উভয়ের জন্য কষ্ট ও দুর্দশার কারণ হয়। পক্ষান্তরে সৎ ও নেককার সন্তান বাবা-মায়ের চোখের শীতলতা, দুনিয়া ও আখিরাতের সুখের উৎস হয়ে ওঠে।
মানুষের ভালোবাসার রিজিক : মানুষের ভালোবাসার পাত্র হওয়া। এটিও আল্লাহর এক মহান রিজিক। যে ব্যক্তি অন্যদের মন ও হৃদয়ে প্রিয় হয়ে ওঠে, যার প্রতি মানুষ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে, সে প্রকৃতপক্ষেই ভাগ্যবান। মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারা সহজ কথা নয়; এটি কেবল আল্লাহ প্রদত্ত সৌভাগ্য ও অনুগ্রহের ফল। তবে এই ভালোবাসা ও মর্যাদার উৎস হতে হবে শরিয়াহ-সম্মত। যদি তা নৈতিক ও ধর্মীয় সীমানার বাইরে হয়, তাহলে তা কখনো গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, বদকার ব্যক্তি তার সমকক্ষ বা অনুরূপ মানুষের প্রতি ভালোবাসা দেখাতে পারে, কিন্তু নেককারকে ঘৃণা করে। এ ধরনের অনুভূতি সত্যিকারের ভালোবাসা বা সম্মানের প্রতিফলন নয়। অতএব, মানুষের হৃদয়ে গ্রহণযোগ্য ও প্রশংসিত হওয়া কেবল বাহ্যিক জনপ্রিয়তা নয়; এটি হতে হবে সত্যিকারের সততা, শালীনতা ও ঈমানের প্রতিফলনের ভিত্তিতে। যখন মানুষ শরিয়াহ-সম্মত চরিত্র ও আচরণের কারণে অন্যের হৃদয়ে স্থান করে নেয়, তখন সেই মহব্বত স্থায়ী হয় এবং আল্লাহর বিশেষ বরকত ও রিজিক হিসেবে বিবেচিত হয়।
রিজিক নির্ধারিত, অন্বেষণ অপরিহার্য : রিজিক আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত এটি এক অনুপম সত্য। যা আমাদের বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, আমরা শুধু বসে বসে অপেক্ষা করব; বরং নির্ধারিত রিজিক অর্জন করার জন্য অন্বেষণ অপরিহার্য। মানুষ এই বিষয়ে সাধারণত দুই ধরনের ভুল ধারণায় বিভ্রান্ত হয়। উদাসীনতাকে তাওয়াক্কুল মনে করা : কিছু মানুষ মনে করেন, যেহেতু রিজিক আল্লাহ কর্তৃক বরাদ্দই আছে। তাই তাদের শুধু বসে থাকলেই চলবে। তারা কাজ-কর্ম বন্ধ করে রাসূল সা:-এর হাদিসকে ভুলভাবে ব্যবহার করে। রাসূল সা: বলেন, ‘যদি তোমরা আল্লাহর ওপর প্রকৃতভাবে তাওয়াক্কুল (নির্ভরশীল হও) করো, তাহলে তোমরা রিজিক পাবে। যেমনভাবে পাখিরা রিজিক পায়। সকালবেলা খালি পেটে পাখিরা বাসা থেকে বের হয় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে তারা নীড়ে ফিরে আসে। তারা হাদিসটি পেশ করে বলে- ‘সুতরাং, আমাদের কাজ-কর্মের কোনো দরকার নেই। আল্লাহ-ই আমাদেরকে রিজিক দেবেন।’ অথচ তারা বুঝতে পারে না, ওই হাদিসটি তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়। পাখিরা কখনো বসে থাকে না; বরং তারা প্রতিদিন সকালবেলায় খাদ্য সংগ্রহ করার জন্য বের হয়ে যায় আল্লাহর ওপর ভরসা করে। এরপর আল্লাহ তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী দান করেন; বরং হাদিসের মূল শিক্ষা হলো, পরিশ্রম এবং তাওয়াক্কুল একসাথে করতে হয়।
শুধু বস্তুর ওপর নির্ভরশীলতা : অন্য দিকে যারা শুধু বস্তু বা কারণের ওপর নির্ভর করে, তারা ভাবেন যে ফলাফলের উপর কেবল কারণের-ই প্রভাব রয়েছে। তারা ভুলে যায় যে প্রতিটি কারণের পেছনে একজন নিয়ামক আছেন, আর তিনি হলেন আল্লাহ তায়ালা। অথচ তাদের ভাবা উচিত যে, হাসপাতালের একই রুমে দুই রোগী, একই চিকিৎসক, একই ওষুধে একজন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আসে, আর অন্য জনকে কাফনের কাপড় মুড়িয়ে কবরে রাখা হয়। (চলবে)



