সোহাগ খন্দকার সাঘাটা (গাইবান্ধা)
জন্মের পর দুই হাতহীন নবজাতককে দেখে অনেকেই তার বেঁচে থাকা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিলেন। কেউ কেউ নিষ্ঠুরভাবে তাকে মেরে ফেলার পরামর্শও দিয়েছিলেন। কিন্তু সব প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে মেয়েকে আগলে রেখেছিলেন মা সাজেদা বেগম। সেই শিশুই আজ পা দিয়ে লেখাপড়া করে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করে সংগ্রাম, সাহস ও আত্মবিশ্বাসের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার কচুয়া গ্রামের আয়েশা আক্তার (২৮) জন্মগতভাবে দুই হাত ছাড়াই পৃথিবীতে আসেন। তবে শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাকে কখনো থামাতে পারেনি। ছোটবেলা থেকেই পায়ের আঙুলে কলম ধরে লেখালেখি শিখেছেন তিনি। অন্য শিশুরা যখন হাতে কলম ধরা শিখেছে, তখন আয়েশা পা দিয়েই নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার লড়াই শুরু করেন।
গাইবান্ধা সরকারি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন তিনি। বর্তমানে পরিবারের প্রধান ভরসা তার মা সাজেদা বেগম। চার বোনের মধ্যে আয়েশা তৃতীয়। প্রায় দেড় বছর আগে তার বাবা আব্দুল লতিফ মারা যান।
সরেজমিনে দেখা যায়, দুই হাত না থাকলেও দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব কাজই পা দিয়ে করেন আয়েশা। রান্না, তরকারি কাটা, চাল বাছাই, ঘর গোছানো থেকে শুরু করে লেখালেখিসহ সংসারের বিভিন্ন কাজে দক্ষতার সাথে অংশ নেন তিনি।
মা সাজেদা বেগম বলেন, জন্মের পর অনেকেই মেয়েকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই বলে মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু তিনি কখনো মেয়েকে বোঝা মনে করেননি। আজ পা দিয়ে লেখাপড়া করে মাস্টার্স সম্পন্ন করায় তিনি গর্বিত।
চাচা জহুরুল ইসলাম বলেন, আয়েশা কঠোর পরিশ্রম করে পড়াশোনা শেষ করেছে। তার যোগ্যতা অনুযায়ী একটি স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হলে সে সম্মানের সাথে জীবনযাপন করতে পারবে।
প্রতিবেশী বিলা বেগম বলেন, অনেকেই ছবি ও ভিডিও ধারণ করে নিয়ে যান, কিন্তু বাস্তবে সহযোগিতার হাত খুব কম মানুষই বাড়িয়ে দেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে আয়েশা বলেন, ‘আমি ভিক্ষা চাই না, আমি আমার যোগ্যতায় একটি চাকরি চাই। সরকার যদি আমার মতো শিক্ষিত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে মায়ের দায়িত্ব নিতে পারব।’
সাঘাটা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার আজহার আলী বলেন, আয়েশার জীবনসংগ্রাম সমাজের জন্য অনুপ্রেরণার উদাহরণ। রাষ্ট্রীয় সহায়তা পেলে তিনি অন্যদের জন্যও প্রেরণার উৎস হয়ে উঠতে পারেন।
সাঘাটা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন সুইট বলেন, আয়েশার মতো মেধাবী ও সংগ্রামী মানুষের পাশে সমাজের সবাইকে দাঁড়ানো উচিত।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আশরাফুল কবীর জানান, আয়েশার বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে। তাকে সরকারি সহায়তার আওতায় আনা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায় কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দফতরের সাথে আলোচনা করা হবে।



