ক্রীড়া প্রতিবেদক
বাংলাদেশে কাজ করতে এসে মাঠের চেয়ে মাঠের বাইরের ঘটনাতেই বেশি আলোচনায় ছিলেন বাংলাদেশ অনুর্ধ্ব-২০ ফুটবল দলের প্রধান কোচ জেরার্ড জোন্স। দায়িত্ব নেয়ার মাত্র দুই মাসের মধ্যে তার অধ্যায় শেষ হয়ে যেতে পারে। সহকারী কোচের সাথে টিম হোটেলে হাতাহাতি, পুলিশ ডাকা এবং পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ- সবকিছুর পরই অনিশ্চয়তায় জোন্স জেরার্ড। এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপের বাছাইপর্ব খেলতে বাংলাদেশ দল উজবেকিস্তানের উদ্দেশে দেশ ছাড়ার ঠিক আগেই এমন এক অনাহুত পরিস্থিতির সামনে সবাই।
গতকার দুপুরে খবর ছড়িয়ে পড়ে, জেরার্ডকে নাকি বরখাস্ত করেছে বাফুফে। তবে বাফুফে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি। এদিকে নিজের ফেসবুক পেজে দেয়া এক ভিডিও বার্তায় বরখাস্তের খবরটি নাকচ করেছেন এই ইংলিশ কোচ। জোন্স জানিয়েছেন, বরখাস্ত করার বিষয়ে বাফুফে তাকে কিছুই জানায়নি।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- যদি এমন ঘটনা হয়েও যায়, তাহলে এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপের বাছাইপর্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতার আগে কোচ ছাড়া কিভাবে প্রস্তুতি সামলাবে বাংলাদেশ? ৩১ আগস্ট উজবেকিস্তানে শুরু হতে যাওয়া সেই পরীক্ষায় মাঠের লড়াইয়ের আগে কোচের চেয়ার নিয়েই বড় ধাক্কা খাওয়ার সামনে দেশের যুব ফুটবল।
গত বুধবার টিম হোটেলে জেরার্ড জোন্স ও সহকারী কোচ আতিকুর রহমান মিশুর মধ্যে কথা কাটাকাটি থেকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়। একপর্যায়ে দু’জনের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি হয়। এরপর ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশ ডাকেন জেরার্ড। পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়ার পর ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত শুরু করে বাফুফের ডেভেলপমেন্ট কমিটি। বিষয়টি যখন ফেডারেশনের অভ্যন্তরীণ তদন্তের পর্যায়ে, তখনই নতুন করে আলোচনার জন্ম দেন জেরার্ড নিজেই। গত সোমবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া ভিডিও বার্তায় কর্মক্ষেত্রে হামলার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, বাংলাদেশে নিজেকে নিরাপদ মনে করছেন না।
জেরার্ড বলেন, ‘কর্মক্ষেত্রে আমার ওপর হামলা চালানো হয়েছে। আত্মরক্ষার্থেই আমাকে পুলিশ ডাকতে হয়েছিল। আমি বাফুফেকে আমার প্রাপ্ত আঘাতের ছবি পাঠিয়ে বিষয়টি জানিয়েছিলাম, কিন্তু সেখান থেকে কোনো সাহায্য বা সমর্থন পাইনি। আমি এখনো নিরাপদবোধ করছি না। এমন একটি দেশে আছি যেখানে প্রতিনিয়ত সাহায্যের জন্য আকুতি জানাতে হচ্ছে।’
তবে একই ভিডিও বার্তায় সহকারী কোচের সাথে বিরোধের বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি। মিশুর সাথে নিজের সম্পর্ক ভালো বলেই দাবি করেন জেরার্ড। ‘তার সাথে আমার কোনো বিরোধ নেই। আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত চমৎকার। আমরা হাসাহাসি করি, একে অপরের রুমে যাতায়াত করি এবং ম্যাচে কৌশলগত বিষয় শেয়ার করি। কিন্তু একটি পক্ষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে।’
নিজের ক্যারিয়ারে এমন ঘটনা নজিরবিহীন দাবি করে তিনি আরো বলেন, ‘আমার পুরো ক্যারিয়ারে কখনোই কাজের জায়গায় শারীরিক আক্রমণের শিকার হতে হয়নি বা সুরক্ষার জন্য পুলিশ কিংবা ব্রিটিশ দূতাবাসের সহায়তা নিতে হয়নি। যখন এএফসি প্রতিযোগিতায় ভালো কিছু করার সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে, তখন কেন এমনটা করা হচ্ছে তা বোধগম্য নয়।’
জেরার্ডের বক্তব্যের পর পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে ওঠে। কারণ একদিকে তিনি গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যকে বিভ্রান্তিকর বলেছেন, অন্যদিকে টিম হোটেলে সংঘর্ষ ও পুলিশ ডাকার ঘটনাও তার বক্তব্যে উঠে এসেছে। সাথে যোগ হয়েছে বাফুফের সাথে বেতন নিয়ে তার আগের বিতর্ক। বেতন না পাওয়ায় পরিবার আর্থিক সঙ্কটে রয়েছে বলে ফেসবুকে পোস্ট করেছিলেন তিনি। পরে বাফুফে জানায়, যথাসময়েই তার অ্যাকাউন্টে বেতন জমা দেয়া হয়েছিল।
বাংলাদেশে নিরাপত্তা নিয়ে জেরার্ডের অভিযোগও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই দেশের আরো কয়েকজন বিদেশী কোচ বাংলাদেশের ফুটবলে ও অন্যান্য খেলায় দায়িত্ব পালন করছেন। নারী ফুটবল দলের কোচ পিটার বাটলার এবং জাতীয় দলের কোচ থমাস ডুলির পাশাপাশি আরচারি ফেডারেশনে দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করছেন মার্টিন ফ্রেডরিক। শেষ পর্যন্ত জেরার্ডের অভিযোগ, হোটেলের ঘটনা এবং বাফুফের তদন্ত- সবকিছুর সমাপ্তি ঘটতে পারে বড় কোনো সিদ্ধান্তে। গত জুনে দুই বছরের চুক্তিতে বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-২০ দলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি।



