সরকার গঠনের পর ব্যারাকে ফিরতে চায় সশস্ত্রবাহিনী

নির্বাচিত সরকার গঠনের পরপরই দীর্ঘ দেড় বছর পর এবার ঘরে ফিরবে সশস্ত্রবাহিনী। তবে ঠিক কবে নাগাদ পর্যন্ত সশস্ত্রবাহিনী মাঠে থাকবে তা নিশ্চিত করা যায়নি। অপর দিকে নির্বাচনের আগে, নির্বাচনের দিন এবং নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা ঠেকাতে সরকার গঠনের পর বিজিবি সদস্যরাও ব্যারাকে ফিরবে বলে জানিয়েছে বিজিবি সূত্র।

এস এম মিন্টু
Printed Edition

  • নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা ঠেকাতে কঠোর অবস্থান
  • সেনা, বিমান, নৌবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব পুলিশের টহল অব্যাহত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশন কর্তৃক তিন হাজারের বেশি বেশি ঝুঁকি কেন্দ্র শনাক্ত করা হয়েছে। নির্বাচনের আগের রাতে এবং নির্বাচনের দিন প্রায় ৩০০ কেন্দ্রে বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও বড় কোনো সহিংসতা ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে এবারের নির্বাচন। এই নির্বাচনকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সেরা নির্বাচন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কোনো রক্তপাত বা খুনোখুনি ছাড়া এমন নির্বাচন অতীতে রেকর্ডে নেই। আর এই সহিংসতা বা নাশকতা রোধে সশস্ত্রবাহিনী ছাড়াও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কারণে সম্ভব হয়েছে বলে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশংসা করা হয়েছে। নির্বাচন পরবর্তী নাশকতা-সহিংসতা ঠেকাতে গতকাল পর্যন্ত মাঠে কাজ করেছে সেনাবাহিনী, বিমান ও নৌ বাহিনীসহ অন্যান্য বাহিনী।

সেনাবাহিনী সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচিত সরকার গঠনের পরপরই দীর্ঘ দেড় বছর পর এবার ঘরে ফিরবে সশস্ত্রবাহিনী। তবে ঠিক কবে নাগাদ পর্যন্ত সশস্ত্রবাহিনী মাঠে থাকবে তা নিশ্চিত করা যায়নি। অপর দিকে নির্বাচনের আগে, নির্বাচনের দিন এবং নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা ঠেকাতে সরকার গঠনের পর বিজিবি সদস্যরাও ব্যারাকে ফিরবে বলে জানিয়েছে বিজিবি সূত্র।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দেড় বছর যাবৎ সেনাবাহিনী মাঠে কাজ করছে। বিশেষ করে দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি মোকাবেলা এবং আক্রান্ত ও অচল থানাগুলোকে সচল করতে পুলিশকে ঘুরে দাঁড়ানোসহ সার্বিক সহযোগিতা করে আসছে সেনাবাহিনী। এমনকি শীর্ষ সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারী ও মাদক ব্যবসায়ীসহ অপরাধীদের ধরতে যৌথ অভিযান চালিয়ে সারা দেশে সাফল্য অর্জন করে সেনাবাহিনী। নির্বাচনের আগে গত ১০ জানুয়ারির আগে ৩৫ হাজার সেনাসদস্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করে আসছিল। এরপর ৫০ হাজার সদস্য মাঠে নামানো হয়। ২০ জানুয়ারি ১ লাখ সেনাবাহিনীর সদস্য নির্বাচনী কাজে বিভিন্ন ধরনের মহড়া, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ও কেন্দ্রগুলোতে দফায় দফায় টহল দেয়া শুরু করে।

সেনাবাহিনী সারা দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৬২টি জেলায় ৪১১টি উপজেলায় এবং মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে সর্বমোট ৫৪৪টি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করে নিয়মিত টহল যৌথ অভিযান এবং চেকপোস্ট স্থাপনের মাধ্যমে নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি অস্ত্র উদ্ধার ও শীর্ষ সন্ত্রসীসহ বিভিন্ন অপরাধী গ্রেফতার কার্যক্রম চালিয়েছে। সুরক্ষা অ্যাপের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বডি-ওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। ড্রোন ও অন্যান্য প্রযুক্তির ব্যবহার করে দ্রুততম সময়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা হয়েছে।

অপর দিকে নৌবাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য উপকূলীয় এবং দ্বীপাঞ্চলীয় এলাকাগুলোতে স্ট্রাইকিং ফোস হিসেবে নিরাপত্তাবলয় তৈরি করে। নির্বাচনের আগে হাতিয়া এলাকায় দফায় দফায় সংঘর্ষের মোকাবেলায় নৌবাহিনীর সদস্যরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে নির্বাচনের দিন সেখানে কোনো অপ্রতিকর ঘটনা ঘটেনি। উপকূলীয় ও দ্বীপাঞ্চল যেমন- ভোলা, হাতিয়া, সন্দ্বীপ, কক্সবাজার ও সেন্টমার্টিনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নৌবাহিনীর ও কোস্টগার্ডের জাহাজ মোতায়েন করা হয়। নৌবাহিনী পাঁচ হাজার ও কোস্টগার্ডের তিন হাজার সদস্য নির্বাচনী নিরাপত্তায় কাজ করেছে।

অপরদিক বিমান বাহিনীর সদস্যরা আকাশের বিমান, হেলিপপ্টার ও ড্রোনের সাহায্যে নিরাপত্তাবলয় সৃষ্টি করে। নির্বাচনী মাঠে এবারই প্রথম নতুন মাত্রা যোগ করেছে আকাশপথের নিরাপত্তা। স্থলবাহিনীর পাশাপাশি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সরাসরি মোতায়েন, হেলিকপ্টার ও পরিবহন বিমানের দ্রুত লজিস্টিক সহায়তা এবং ড্রোনভিত্তিক নজরদারি- সব মিলিয়ে নির্বাচনী নিরাপত্তাব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে এক কৌশলগত ‘ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার’ সক্ষমতা।

অপর দিকে প্যারা মিলিটারি হিসেবে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) শতভাগ প্রস্তুতি নিয়ে দেশের প্রায় প্রত্যেকটি নির্বাচনী এলাকায় দায়িত্ব পালন করেছে। এবারের নির্বাচনে বিজিবি সারা দেশে ১ হাজার ২১০ প্লাটুন এবং ৩৫ হাজার থেকে ৩৭ হাজারের বেশি বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তারা দেশের ৬৪টি জেলার ৪৯৫টি উপজেলার মধ্যে ৪৮৯টিতে দায়িত্ব পালন করেছেন। ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তসহ সব সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান, মাদক ও অস্ত্র পাচার রোধে নজরদারি জোরদার করা হয়। ওই সব এলাকায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিজিবি হেলিকপ্টার, ড্রোন, বডি-ওর্ন ক্যামেরা এবং ডগ স্কোয়াড (ক-নাইন) ব্যবহার করছে। তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য কুইক রেসপন্স ফোর্স (কিউআরএফ) এবং র‌্যাপিড অ্যাকশন টিম (র‌্যাট) সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ ছাড়াও দুর্গম পার্বত্য এলাকায় হেলিকপ্টার সহায়তায় বিশেষ নিরাপত্তা চৌকি ও ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে।

অপর দিকে নির্বাচনের দিন র‌্যাবের টহলটিম কেন্দ্রের বাইরে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় কাজ করেছে। পাশাপাশি নাশকতা ও সহিংসতা রোধে র‌্যাবের গোয়েন্দা কার্যক্রম অব্যাহত, সারা দেশে টহল, ড্রোনের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র পরিদর্শন ও গোয়েন্দা নজরদারিসহ সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবেলা করা হয়।