ক্রীড়া প্রতিবেদক
অতিরিক্ত সময়ের খেলা শেষের দিকে ডাচ ডিফেন্ডার জান পল ভ্যান হেকের সাথে পুরো ম্যাচ জুড়ে চলা শারীরিক লড়াইটা তখন রূপ নিয়েছে এক রক্তাক্ত সংগ্রামে। ডান চোখের ঠিক ওপরে এক গভীর ক্ষত থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে মরক্কোর ফরোয়ার্ড ইসমায়েল সাইবারির। সাদা জার্সিটা নিমেষেই ছেয়ে গেল লাল রক্তের ছোপ ছোপ দাগে। তবে উদ্বেগ ছাপিয়ে মাঠের ধারেই রক্তাক্ত জার্সি বদলে একটা একদম নতুন ফ্রেশ জার্সি গায়ে জড়ালেন ২৫ বছর বয়সী এই ফুটবলার।
এর মাত্র কয়েক মিনিট পরেই টাইব্রেকারের সাডেন ডেথে যখন পুরো আফ্রিকান মহাদেশের স্বপ্ন তার পায়ে, পরম শান্ত মাথায় ডাচ গোলরক্ষককে পরাস্ত করে বল জালে জড়ালেন। রক্তমাখা সেই ম্যাচ জেতানোর পর গায়ের নতুন জার্সিটি খুলে যখন বুনো উল্লাসে মাতলেন, তখন ফুটবলবিশ্ব দেখল এক অদম্য যোদ্ধার গল্প।
সাইবারি মরক্কোকে জেতালেন এমন এক দেশের বিরুদ্ধে, যে দেশটিকে তিনি নিজের হাতের তালুর মতো চেনেন। তার পুরো পেশাদার সিনিয়র ফুটবল ক্যারিয়ার কেটেছে এই নেদারল্যান্ডসের মাটিতেই। ডাচ জায়ান্ট পিএসভি আইন্দহোভেনের হয়ে গত মৌসুমে লিগ জিতিয়ে হয়েছেন ডাচ লিগের (এরদিভিসি) বর্ষসেরা খেলোয়াড়। যে দেশের মাটিতে ১৪২টি ম্যাচ খেলে তারকা হয়ে উঠেছেন, বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে সেই নেদারল্যান্ডসকে বিদায় করার নায়কও হলেন তিনি।
গ্রুপ পর্বে ব্রাজিলের বিপক্ষে ১-১ ড্রয়ের ম্যাচে সমতাসূচক গোলটি এসেছিল সাইবারির পা থেকেই। এরপর স্কটল্যান্ডকে ১-০ ব্যবধানে হারানোর ম্যাচে গোল করে হয়েছিলেন ম্যাচসেরা। হাইতির বিপক্ষে ৪-২ ব্যবধানের রোমাঞ্চকর জয়েও জালের ঠিকানা খুঁজে নিয়েছিলেন তিনি। আর নকআউট পর্বে ডাচদের কাঁদিয়ে প্রমাণ করলেন মরক্কো দলের প্রধান ভরসা তিনি। গত কাতার বিশ্বকাপে আফ্রিকান দেশ হিসেবে প্রথম সেমিফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়েছিল মরক্কো, আর এবার সাইবারির ডানায় ভর করে বিশ^কাপের শেষ ষোলোতে।
২০০১ সালে স্পেনের তেরাসায় এক অতি সাধারণ মরক্কো প্রবাসী পরিবারে জন্ম তার। ২০০৭ সালে স্পেনে তীব্র অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলে রাজমিস্ত্রি বাবার চাকরি চলে যায়। চরম সঙ্কটে পড়া পরিবারটি তিন সন্তানকে নিয়ে ভাগ্যের অন্বেষণে পাড়ি জমায় বেলজিয়ামে। সেখান থেকেই অ্যান্ডারলেখট ও খেঙ্কের যুবদলে সাইবারির ফুটবলের হাতেখড়ি। ২০২২ সালে বেলজিয়ামের তৎকালীন কোচ রবার্তো মার্তিনেজ তাকে বেলজিয়ামের হয়ে খেলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু বুকভরা দেশপ্রেম আর পরিবারের স্বপ্নকে সম্মান জানাতে বেলজিয়ামের মতো বড় দলের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে মরক্কোর জার্সি গায়ে জড়ান।
চোখের ওপরের ক্ষত আর রক্তকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে ডাচ-বধের যে মহাকাব্য মেক্সিকোর মাটিতে লিখলেন, তা ফুটবল ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকবে।



