পাঠক বৃদ্ধিতে শঙ্কা কাটছে

গ্রন্থমেলায় প্রাণের উৎসব.

আবুল কালাম
Printed Edition
একুশে বইমেলার শিশু প্রহরের একটি স্টলে দর্শনার্থীরা : নয়া দিগন্ত
একুশে বইমেলার শিশু প্রহরের একটি স্টলে দর্শনার্থীরা : নয়া দিগন্ত

মধ্য সময়ে পাঠক বৃদ্ধিতে শঙ্কা কাটছে বইমেলায়। বিক্রেতারা বলছেন মেলা শুরুর আজ ১০ দিন। বাকি আছে ৯দিন। তাই এখন মধ্য সময়ে এসে ক্রেতা বাড়তে শুরু করেছে। এতে বিক্রি নিয়ে তাদের যে শঙ্কা ছিল তা ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করেছে।

গতকাল সাপ্তাহিত ছুটির দিনে ক্রেতা সমাগম ছিল বেশ ভালো। শিশুপ্রহরে পুতুলনাট্য ঘিরে বইমেলা ছিল জমজমাট। সকাল থেকেই ছোটদের ভিড় দেখা যায় ‘কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটার’ চত্বরে। কেউ বাবা-মায়ের হাত ধরে হাঁটছিল, কেউ আবার বিভিন্ন স্টলে গিয়ে শিশুতোষ বইয়ের রঙিন মলাট উলটে দেখছিল। শত শত শিশুকিশোর তার বাবা-মায়ের সাথে পুতুলনাট্য উপভোগ করে।

অন্য দিকে সরকারি প্রতিষ্ঠান শিশু একাডেমি ও বাংলা একাডেমির পাশাপাশি কিছু প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের শিশু-কিশোরদের জন্য ভালো মানের বইও রাখা হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনা সংস্থার পাশাপাশি গত কয়েক বছরে শিশুদের বই বের করা কিছু নতুন প্রতিষ্ঠান ভালো বই এনেছে। আবার কিছু বইয়ে রঙচটা প্রচ্ছদে আকর্ষণ করা হয়েছে। তবে সেসব বইয়ের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

বেলা ২টা থেকেই মেলা প্রাঙ্গণে পাঠকের ভিড় জমে। এতে স্বস্তি পান বিক্রেতারা। কারণ বিগত কয়েক দিন ধরে সামান্য ক্রেতার আনাগোনা বিক্রেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছিল। গতকাল ক্রেতা সমাগমের মধ্য দিয়ে তাতে কিছুটা আশার আলো যুগিয়েছে।

তবে এরমধ্যেও মেলা নিয়ে একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে মেলার আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক বরাবর চিঠি দিয়েছে প্রকাশকদের সংগঠন ‘প্রকাশক ঐক্য’। এতে মেলার মাঠে ‘স্টল বরাদ্দে শর্তভঙ্গ ও বৈষম্য’, ‘অবকাঠামোগত ত্রুটি, মেলা প্রাঙ্গণে অবৈধ মাদক বিক্রি ও সেবন, হকারদের অবাধ বিচরণ, বাদাম-ঝালমুড়ি এমনকি সিগারেট বিক্রির ঘটনাও মেলার শৃঙ্খলা নষ্টের অভিযোগ তোলা হয়েছে।

‘প্রকাশক ঐক্য’ জানায়, নানাবিধ প্রতিকূলতা ও চরম সময়স্বল্পতার মধ্যেও মেলা এবং নতুন সরকারের প্রতি সহযোগিতার মনোভাব থেকেই তারা এবারের মেলায় অংশ নিয়েছেন। তবে মেলার প্রথম ছয় দিনের অভিজ্ঞতায় পাঠক সমাগম নিয়ে পূর্বে ব্যক্ত করা আশঙ্কা বাস্তবে পরিণত হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।

তাদের ভাষ্য, বাংলা একাডেমির সাথে সমঝোতা অনুযায়ী এবার সব প্যাভিলিয়ন বাতিল করে সর্বোচ্চ পাঁচ ইউনিটের স্টল বরাদ্দ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। দেশের ঐতিহ্যবাহী ও শীর্ষ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সে অনুযায়ী পাঁচ ইউনিট স্টল দেয়া হলেও, অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে ছয় ইউনিট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। প্রকাশকদের ভাষ্য, এটি সমঝোতার সুস্পষ্ট ব্যত্যয় এবং এ বিষয়ে বাংলা একাডেমির আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

এ ছাড়া মেলার মাঠের অবকাঠামোগত দুর্বলতার অভিযোগ তুলে বলা হয়, দুই সারির স্টলের মাঝের পথ ইটবিহীন ও অসমতল, খোঁড়াখুঁড়ির কারণে গর্ত ও মাটির ঢেলা পড়ে থাকায় চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নিয়মিত পানি না ছিটানোয় ধুলাবালু উড়ছে, যা পাঠক, দর্শণার্থী ও স্টলকর্মীদের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।

মেলা প্রাঙ্গণে অবৈধ মাদক বিক্রি ও সেবনের অভিযোগ করে বলা হয়, হকারদের অবাধ বিচরণ, বাদাম-ঝালমুড়ি এমনকি সিগারেট বিক্রির ঘটনাও মেলার শৃঙ্খলা নষ্ট করছে। রাতে স্টল বন্ধ হওয়ার পর মেলা প্রাঙ্গণে ছিন্নমূল ও বহিরাগত ব্যক্তিদের প্রবেশের কারণে প্রকাশকদের বই ও সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব সেলিম রেজা বলেন, এটি মেলা কমিটির সভায় উপস্থাপন করা হবে এবং এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

মেলায় প্রথমা প্রকাশন নিয়ে এসেছে রুমিন ফারহানার বই সংসদের দিনগুলো। বিরোধীদলীয় সদস্য হিসেবে রুমিন ফারহানা একাদশ জাতীয় সংসদে তার স্পষ্টবাদী ও সাহসী ভূমিকার মাধ্যমে দেশবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। এই বই রুমিন ফারহানার সেই প্রথমবারের সাংসদ জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে। ‘মধ্যরাতের নির্বাচন’ খ্যাত ২০১৮ সালের পাতানো নির্বাচনে বিএনপি পেয়েছিল মাত্র সাতটি আসন। সেই সাতটি আসনের বিপরীতে একটি সংরক্ষিত মহিলা আসন পায় দলটি। দলের সিদ্ধান্তে এই আসনে মনোনয়ন দেয়া হয় রুমিন ফারহানাকে। সংসদের প্রায় ৩০০ আসনই তখন আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী দলগুলোর দখলে। সরকারের সমালোচনা বা সামান্য ভিন্নমতও শুনতে অভ্যস্ত নয় তারা। এ রকম একটি বৈরী পরিবেশে সংসদে গিয়ে শুরু থেকেই বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় তাকে। সরকারি দলের স্বৈরতন্ত্রী ও নিপীড়নমূলক শাসনব্যবস্থার স্বরূপ উদঘাটন করেছিলেন, তাদের আসন্ন অনিবার্য পতনের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন- এ সব কিছুর প্রাঞ্জল বর্ণনা রয়েছে বইটিতে।

মেলায় ঐতিহ্য প্রকাশনী নিয়ে এসেছে ইসলামের দৃষ্টিতে জুলাই বিপ্লব। লেখক মুহাম্মদ আনওয়ারুল কারীম। মূল্য : ৪০০ টাকা।এই বইতে জুলাই বিপ্লবের উৎস ও তা-সংলগ্ন ঘটনাবলির আলোচনার মাধ্যমে কুরআন ও হাদিসের শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন ও গভীর তাৎপর্য তুলে ধরা হয়েছে।

বইটির দ্বিতীয় অংশে আল্লাহর সৃষ্টি, কুরআনের দিকনির্দেশনা ও অদৃশ্য বিষয়ের যৌক্তিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে দেখানো হয়েছে আল্লাহর সৃষ্টিজগতের পরিপূর্ণতা ও সূক্ষ্মতা আমাদের যুক্তিবোধকে জাগ্রত করে, যা অদৃশ্য আল্লাহ, পরকাল, জান্নাত-জাহান্নাম, ফেরেশতা ও তাকদিরের মতো বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস গড়ে তোলে।

ফিরে দেখা বনি ইসরাইল। রফিকুল ইসলাম। মূল্য : ৯৫০ টাকা। মধ্যপ্রাচ্যে সঙ্ঘাতের বিষয়বস্তু ধর্ম, দর্শন ও রাজনীতি। এ তিনটি বিষয়ই সমান্তরাল আলোচিত হয়েছে বইটিতে। বিভিন্ন প্রেক্ষাপটের ভেতর দিয়ে ইসরাইল রাষ্ট্রের ভিত্তি, বিবর্তন ও ব্যাপকতা তুলে ধরা হয়েছে বইটিতে।

স্বৈরতন্ত্রের কলকবজা বনাম তত্ত্বযুদ্ধ। লেখক মুসা আল হাফিজ। মূল্য : ২৭০ টাকা। ফ্যাসিবাদের বুদ্ধিবৃত্তিক পাহারাদারি ও খেদমতগিরির বিরুদ্ধে মুসা আল হাফিজ বরাবরই ছিলেন সোচ্চার। স্বৈরতন্ত্রের বিপরীতে গণবুদ্ধিজীবিতাকে তিনি বিকশিত করতে লড়েছেন। জনগণের জীবন সঙ্কট, উপেক্ষিত কথন, নাগরিক অধিকার এবং জীবন ও সম্মানের মূল্য প্রতিষ্ঠায় বুদ্ধিজীবীদের কেন সোচ্চার হওয়া দরকার এবং কেন ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করা দরকার, তার বয়ান হাজির করেছেন।

গতকাল মেলায় ছিল শিশুপ্রহর। বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘জন্মশতবর্ষ : কলিম শরাফী’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অণিমা রায়। আলোচনায় অংশ নেন সাইম রানা। সভাপতিত্ব করেন সাধন ঘোষ। বিকেল ৪টায় ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

আজ সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বেলা ১১টা থেকে মেলা চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত থাকবে শিশু প্রহর।