এনআইসিভিডিতে হার্ট সার্জারির রোগীদের ডায়ালাইসিস ব্যবস্থা নেই

হামিম উল কবির
Printed Edition

রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালে ডায়ালাইসিস ব্যবস্থা অপরিহার্য হলেও সেখানে কিডনি ফেইলিউর রোগীদের জন্য ডায়ালাইসিসের কোনো ব্যবস্থা নেই, পাঠাতে হয় পাশের জাতীয় কিডনি হাসপাতালে (নিকডু)। কারণ, হার্টের অপারেশন করলে অনেক সময় রোগীর কিডনি অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। রোগীকে বাঁচাতে সাথে সাথে ডায়ালাইসিস করার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। কিডনি হাসপাতালে ডায়ালাইসিসটা ভালো করতে পারলেও হার্টের সার্জারি করা রোগীদের ম্যানেজ করতে পারে না এই অজুহাতে এ ধরনের রোগীদের রাখতে চায় না।

এনআইসিভিডির চিকিৎসকরা বলছেন, সবচেয়ে ভালো হয় এনআইসিভিডিতে ডায়ালাইসিসের ব্যবস্থা করলে। দীর্ঘদিন থেকে এনআইসিভিডির ডায়ালাইসিসের চাহিদা থাকলেও এ ব্যাপারে কোনো পক্ষ থেকেই এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। ফলে ডায়ালাইসিস প্রয়োজন হয়ে পড়া রোগীরা বিপদেই পড়েন। পরে অনেকেই বাধ্য হয়ে অনেক অর্থ ব্যয় করে বেসরকারি হাসপাতালে ডায়ালাইসিসের জন্য চলে যান। আবার এই সমস্যার কারণে অনেক উচ্চবিত্ত পরিবারের রোগী বিদেশের বড় হাসপাতালে চলে যাচ্ছেন। এভাবে কোনো কোনো রোগী বাধ্য না হলেও বিদেশে গিয়ে অনেক ব্যয় করে হার্টের সার্জারি করে আসেন। এনআইসিভিডি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী একটি হাসপাতাল। এই হাসপাতালটি দীর্ঘদিন থেকে হার্টের সার্জারিসহ হার্টে স্ট্যানটিং করে আসছে। সারা দেশেই এই হাসপাতালটির ইতিবাচক একটি সুনাম রয়েছে।

হার্টের বাইপাস সার্জারি করে এসেছেন হামিদুল ইসলাম নামের একটি ব্যবসায়ী। তিনি নয়া দিগন্তকে জানান, তার সার্জারি করার সময় তার কিডনি হঠাৎ অকার্যকর হয়ে পড়ে। তাকে পরে একটি বেসরকারি হাসপাতালে গিয়েই ডায়ালাইসিস করিয়ে আসতে হয়েছে। তিনি জানান, এনআইসিভিডিতেই এই সুবিধাটা থাকলে তার চিকিৎসায় খরচ আরো কম হতে পারত।

এনআইসিভিডি হাসপাতালের একজন সহযোগী অধ্যাপক জানান, ডায়ালাইসিস ব্যবস্থা থাকলে দরিদ্র রোগীদের জন্য সুবিধা হতো, তাদের ওপর আর্থিক বোঝা কিছু কমে যেত। কিন্তু আমরা পাশের কিডনি হাসপাতালে রোগী পাঠাচ্ছি। তবে এটা ঠিক, হার্টের সার্জারি করলেই সবার ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হয় না। যাদের প্রয়োজন হয়, তাদের পাঠানো হচ্ছে নিকডুতে। কিন্তু মাঝে মাঝেই নিকডু হার্টের রোগীদের ম্যানেজ করতে পারছে না এমন অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এনআইসিভিডিতেই ডায়ালাইসিসের ব্যবস্থা করা হলে সব দিক থেকেই ভালো হতো। এ ব্যাপারে এনআইসিভিডির পরিচালক অধ্যাপক ডা: আব্দুল ওয়াদুদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি সারাক্ষণ ফোনটি ব্যস্ত থাকায়।

উল্লেখ্য, ওপেন হার্ট সার্জারি, বাইপাস সার্জারি বা ভালভ রিপ্লেসমেন্ট ও ডায়ালাইসিসের মধ্যে একটি বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় হার্ট ও কিডনি একে-অপরের পরিপূরক এবং এদের এই ঘনিষ্ঠ সংযোগকে ‘কার্ডিওরেনাল সিনড্রোম’ বলা হয়। হার্টের সমস্যায় কিডনি সাময়িকভাবে নষ্ট হয়ে রক্তপ্রবাহ কমে যেতে পারে। হার্ট দুর্বল হয়ে সঠিকভাবে রক্ত পাম্প করতে না পারলে (যেমন হার্ট ফেইলিউর বা মারাত্মক করোনারি আর্টারি ডিজিজ) শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে পর্যাপ্ত অক্সিজেনযুক্ত রক্ত পৌঁছায় না, কিডনিও পর্যাপ্ত রক্ত পায় না। ফলে কিডনির ফিল্টারিং ক্ষমতা হঠাৎ করে নষ্ট হতে পারে (একিউট কিডনি ইনজুরি)।

চিকিৎসকরা বলছেন, বড় কোনো হার্ট সার্জারির সময় (বিশেষ করে বাইপাস সার্জারি বা ভালভ সার্জারি) মাঝে মাঝেই শরীরের রক্তচাপ সাময়িকভাবে খুব কমে যেতে পারে অথবা সার্জারি-পরবর্তী জটিলতায় কিডনি কাজ করা বন্ধ করে দিতে পারে। এ সময় রোগীর প্রস্রাবও বন্ধ হয়ে যেতে পারে অথবা কমে গেলে শরীরে বিষাক্ত বর্জ্য যায়। এই জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে রোগীকে তখন সাময়িকভাবে ডায়ালাইসিস করাতে হয়।

চিকিৎসকরা বলছেন, আগে থেকেই কিডনি রোগ থাকলে অথবা যাদের কিডনি আগে থেকেই নষ্ট এবং যারা নিয়মিত ক্রনিক ডায়ালাইসিসের ওপর বেঁচে আছেন, তাদের ক্ষেত্রে রক্তনালীতে চর্বি জমে ব্লক হওয়ার ঝুঁকি (করোনারি আর্টারি ডিজিজ) সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি। ডায়ালাইসিসের রোগীদের রক্তনালী সাধারণত খুব দুর্বল বা শক্ত হয়ে যায়। তাদের প্রায়ই হার্ট সার্জারির (যেমন বাইপাস) প্রয়োজন পড়ে। চিকিৎসকরা বলছেন, ডায়ালাইসিস রোগীর হার্ট সার্জারি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয় এবং সার্জারির পরেও তাদের বিশেষ যতেœর প্রয়োজন হয়। শরীর থেকে অতিরিক্ত তরল বা পানি অপসারণ হয়ে গেলে তখন হার্ট বা কিডনি কোনোটিই যখন ঠিকমতো কাজ করে না। তখন ফুসফুসে এবং শরীরের অন্যান্য অংশে অনেক পানি জমে যায়। ফলে অনেক রোগীর ফুসফুসে পানি জমে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। কিডনি অতিরিক্ত পানি বের করতে ব্যর্থ হলে কৃত্রিমভাবে শরীর থেকে পানি ও টক্সিন বের করতে ডায়ালাইসিস করাতে হয়। এই কারণেই হৃদরোগ হাসপাতালে আইসিইউ বা সিসিইউ ইউনিটের ভেতরে ডায়ালাইসিস সুবিধা বা মেশিন থাকা বাধ্যতামূলক।