রফতানিমুখী তৈরী পোশাক শিল্পের জন্য দেয়া বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা এখন ভয়াবহ অপব্যবহারের রূপ নিয়েছে। শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা সুতা, কাপড়, কেমিক্যাল ও অন্যান্য কাঁচামালের একটি বড় অংশ তৈরী পোশাক উৎপাদনে ব্যবহার না করে চোরাইপথে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে সঙ্ঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে সরকার প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশীয় বস্ত্র ও সুতা শিল্প, একই সাথে বিকৃত হচ্ছে বাজার প্রতিযোগিতা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যে দেখা যায়, দেশে বর্তমানে প্রায় ৭ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান বন্ড লাইসেন্স সুবিধার আওতায় রয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশই তৈরী পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের সাথে যুক্ত। এসব প্রতিষ্ঠান রফতানির শর্তে শুল্ক ও কর ছাড়ে কাঁচামাল আমদানি করতে পারে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, একটি অংশ সেই কাঁচামাল উৎপাদনে ব্যবহার না করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করছে।
এনবিআরের শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের একাধিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রতি বছর শত শত কোটি টাকার বন্ড সুবিধার পণ্য স্থানীয় বাজারে অবৈধভাবে প্রবেশ করছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বাস্তবে এর পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। কারণ অধিকাংশ লেনদেন হয় গোপনে এবং সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রিত চ্যানেলে।
বস্ত্র ও পোষাক শিল্প সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা সুতা ও কাপড় যখন কর না দিয়েই বাজারে বিক্রি হয়, তখন স্থানীয় মিল মালিকরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েন। এতে দেশীয় শিল্প মারাত্মক চাপের মধ্যে পড়ে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি হলেন শওকত আজিজ রাসেল। তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, দেশীয় শিল্পকে ধ্বংস করে দেয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যারা বৈধভাবে শুল্ক-কর দিয়ে কাঁচামাল আমদানি করছে বা স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করছে, তারা বাজারে টিকতে পারছে না। কারণ অবৈধভাবে আসা সুতা ও কাপড় অনেক কম দামে বিক্রি হচ্ছে।
তিনি বলেন, বন্ড সুবিধায় আমদানি করা সুতা ও কাপড়ের একটি অংশ ঢাকার ইসলামপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জসহ বিভিন্ন পাইকারি মার্কেটে চলে যাচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে ভুয়া রফতানি কাগজপত্র দেখিয়ে কাঁচামাল গায়েব করা হয়। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান ‘ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন’ জালিয়াতির মাধ্যমেও হিসাব গরমিল করে। এনবিআরের গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের সাথে জড়িত রয়েছে আমদানিকারক, কিছু অসাধু কাস্টমস ক্লিয়ারিং এজেন্ট, স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং পরিবহন চক্র। এদের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল রাতের আঁধারে গুদাম থেকে বের হয়ে স্থানীয় বাজারে পৌঁছে যায়।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আবদুল মজিদ নয়া দিগন্তকে বলেন, বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা বাংলাদেশের রফতানি খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর দুর্বল তদারকির কারণে একটি অংশ এটিকে অবৈধ ব্যবসার উৎসে পরিণত করেছে। তিনি বলেন, ডিজিটাল ট্র্যাকিং, রিয়েল-টাইম ইনভেন্টরি মনিটরিং এবং কঠোর অডিট ছাড়া এই অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআর সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার শুল্কমুক্ত কাঁচামাল স্থানীয় বাজারে অবৈধভাবে বিক্রি হচ্ছে বলে ধারণা করা হয়। যদিও এই অঙ্কের পূর্ণাঙ্গ সরকারি হিসাব নেই, তবে খাতসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো বলছে প্রকৃত পরিমাণ আরো বেশি হতে পারে।
নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম নয়া দিগন্তকে বলেন, যারা প্রকৃত রফতানিকারক, তারা কখনো চাইবে না বন্ড সুবিধা অপব্যবহার হোক। কারণ এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি বলেন, বিদেশী ক্রেতারা এখন সাপ্লাই চেইনের স্বচ্ছতা নিয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এ ধরনের অনিয়ম চলতে থাকলে ভবিষ্যতে ঝুঁকি বাড়বে।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার শুধু রাজস্ব ক্ষতিই করছে না, এটি বৈধ শিল্প বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে। কারণ যারা কর দিয়ে ব্যবসা করছে তারা অবৈধভাবে কম দামে বিক্রি হওয়া পণ্যের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। তিনি বলেন, এটি মূলত বাজার বিকৃতির একটি বড় উদাহরণ। সরকার এক দিকে শিল্প সুরক্ষা দিতে চায়, অন্য দিকে সেই সুবিধাই যদি চোরাচালান ও কর ফাঁকির হাতিয়ার হয়, তাহলে পুরো নীতির কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
স্থানীয় সুতা ও কাপড় ব্যবসায়ীরা বলছেন, অবৈধভাবে বাজারে আসা পণ্যের কারণে অনেক দেশীয় মিল উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। এতে কর্মসংস্থানও ঝুঁকিতে পড়ছে। তারা বলছেন, লোকাল মার্কেটে এমন দামে সুতা বিক্রি হয়, যা বৈধভাবে আমদানি করলে সম্ভব না। সবাই জানে এগুলো বন্ডের মাল, কিন্তু প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলে না। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রফতানি খাতকে সহায়তা দিতে দেয়া বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহিতা না থাকলে এই সুবিধাই পরিণত হচ্ছে কর ফাঁকি, চোরাচালান ও অবৈধ বাণিজ্যের বড় উৎসে। তাই এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার নিতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।



