সংসদ প্রতিবেদক
বিরোধী দলের তীব্র আপত্তি ও সমালোচনার মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশ বাতিল করেছে সরকার। একইসাথে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল-২০২৬ পাস করে ২০০৯ সালের আইন আবার চালু করা হয়েছে। জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে বিল পাসের মাধ্যমে এসব অধ্যাদেশ রহিত করে পূর্বের আইনি কাঠামোয় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীবৃন্দ বিলগুলো উত্থাপন করেন। এদিকে, আপত্তি সত্ত্বেও অধ্যাদেশগুলো বাতিল করায় জাতীয় সংসদ থেকে ঘোষণা দিয়ে ওয়াকআউট করেন বিরোধী দলের সদস্যরা।
গতকাল বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১২তম দিনে ৩১টি বিল পাস হয়েছে। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের ২৭টি অধ্যাদেশ অবিকল রেখে বিল হিসেবে পাস করা হয়েছে। তবে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগসহ চারটি অধ্যাদেশ রহিত (বাতিল) করা হয়। এর আগে গত ৬ এপ্রিল আরেকটি অধ্যাদেশ রহিতকরণ হয়। অর্থাৎ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জারি করা মোট পাঁচটি অধ্যাদেশ বাতিল করা হলো।
বাতিল ৫ অধ্যাদেশ : অধিবেশনে ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ-২০২৫’ রহিত করে ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল-২০২৬’ এবং ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল-২০২৬’ পাস করে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৬ বাতিল করা হয়েছে। বিরোধী দলের সদস্যদের আপত্তি সত্ত্বেও অধ্যাদেশগুলো রহিত (বাতিল) করা হয়। একইসাথে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল-২০২৬ পাস করে ২০০৯ সালের আইন আবার চালু করা হয়েছে। অর্থাৎ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জারি করা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪ বাতিল করা হলো। এর আগে গত ৬ এপ্রিল ‘জাতীয় সংসদ সচিবালয় (অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ বিধান) রহিতকরণ আইন-২০২৬’ পাস হয়। অর্থাৎ মোট পাঁচটি অধ্যাদেশ বাতিল করলো সরকার।
বিরোধী দলের ওয়াকআউট : গতকাল আসরের নামাজের বিরতির পর স্থানীয় সরকার সংক্রান্ত বিল পাসের পর সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন ডা: শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিরোধী দলের সদস্যরা। বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য বিরোধী দলের যৌক্তিক বাধা সত্ত্বেও যে কয়টি গণবিরোধী বিল আজকে পাস হয়েছে, আমরা তার দায় নিতে চাই না। তাই সংসদ থেকে ওয়াকআউট করছি। তার নেতৃত্বে জোটের সংসদ সদস্যদের নিয়ে অধিবেশন থেকে বের হয়ে যান। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ কিছু বলার জন্য দাঁড়ালে ডেপুটি স্পিকার ফোর দেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমি ধন্যবাদ জানানোর জন্য উঠছি। আইন প্রণয়নপ্রক্রিয়ার ফার্স্ট রিডিং, সেকেন্ড রিডিং, থার্ড রিডিং, সব রিডিংয়ে উনারা সহায়তা করেছেন। কেউ কেউ হাত তুলে সমর্থনও দিয়েছেন। সব প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের পরে ওয়াকআউটের কোনো মানে আছে কি না এটা জানার জন্য। সব প্রক্রিয়ায় তারা অংশগ্রহণ করার জন্য ধন্যবাদ। আশা করি মাগরিবের নামাজের পর তারা আবার অংশগ্রহণ করবেন।
মাগরিব নামাজের পর শুরু হওয়া অধিবেশনে ফের যোগ দেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। অধিবেশনের সভাপতি ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ওয়াকআউট করা অপরাধ কি না?
বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন : অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য গত ১২ মার্চ সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ৯৮টি অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তরের জন্য বিল আকারে উপস্থাপনের কথা বলা হয় এবং ১৫টি সংশোধন করে ফের আনার প্রস্তাব দেয়া হয়। বাকি ২০টির মধ্যে চারটি বাতিল এবং ১৬টি আপাতত আইন আকারে না আনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এই ১৬টির অন্যতম ‘মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ রহিত করে ২০০৯ সালের আইন পুনঃপ্রচলন করে আনা বিল জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অধ্যাদেশগুলো (১৬টি) অনুমোদন না পেলে এসব অধ্যাদেশের কার্যকারিতা হারানোর বাধ্যবাধকতা ছিল, যার সময়সীমা আজ নির্ধারিত ছিল।
অবিকল বিল : গতকাল অধিবেশনে অন্তর্র্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ অবিকল রেখে পাস হওয়া বিলগুলো হচ্ছে- ‘জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘বঙ্গবন্ধু ক্রীড়াসেবী কল্যাণ ফাউন্ডেশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘শেখ হাসিনা জাতীয় যুব উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘বাংলাদেশ শ্রম সংশোধন বিল, ২০২৬’, ‘স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫’ রহিত করা ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল, ২০২৬’ এবং ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫’ রহিত করা সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল, ২০২৬’ বিল পাস করা হয়। এ ছাড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪-এর জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিত ও পুনঃপ্রচলন) বিল, ২০২৬’, ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ এবং ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরা বিল, ২০২৬’, ‘বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘বাংলাদেশ গ্যাস (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন বিল, ২০২৬’, ‘বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম) রেগুলেশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন বিল, ২০২৬’, ‘বন ও বৃ সংরণ বিল, ২০২৬’, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফেলোশিপ ট্রাস্ট (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘জেলা পরিষদ (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) বিল ২০২৬, উপজেলা পরিষদ ( সংশোধন) বিল ২০২৬, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরা বিল ২০২৬, বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন (সংশোধন) বিল ২০২৬ ও নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট (সংশোধন) বিল ২০২৬।
ফেরানো হলো ২০০৯ সালের মানবাধিকার কমিশন আইন : অন্তর্বর্তী সরকারের আনা জাতীয় ‘মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ বাতিল (রহিত) করে ২০০৯ সালের আইন পুনঃপ্রচলন সংক্রান্ত বিল জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। বিরোধী দলের আপত্তির মধ্যেই বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়। আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান বিলটি উত্থাপন করেন।
বিলটি উত্থাপনের পর সংসদে দাঁড়িয়ে এর বিরোধিতা করেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, এই বিল পাসের মাধ্যমে ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন পুনঃপ্রচলন করা হচ্ছে, যা অতীতে বিরোধী দল ও মত দমনে ব্যবহৃত হয়েছে। তার অভিযোগ, কমিশন বিএনপিকে দমন করার বৈধতা দিয়েছে। এমনকি তিনি দাবি করেন, মানবাধিকার রার নামে জামায়াত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গুলি চালানোর মতো বক্তব্যও কমিশনের প থেকে এসেছে।
হাসনাত আবদুল্লাহ আরো বলেন, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশ বিলুপ্ত করে ২০০৯ সালের আইনে ফিরে যাওয়া একটি ‘ব্যাকওয়ার্ড মুভ’ বা পশ্চাৎমুখী পদপে, যা জাতির অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করবে। তার ভাষায়, এটি জাতিকে পিছিয়ে দেয়ার একটি ‘টেক্সটবুক এক্সাম্পল’ হয়ে থাকবে।
এ বক্তব্যের জবাবে আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান বলেন, বিরোধী সংসদ সদস্য বিলটি না পড়ে মন্তব্য করেছেন। তিনি মন্তব্য করেন, তার বক্তৃতা রাজপথ বা জনসমাবেশের জন্য বেশি উপযোগী। আইনমন্ত্রী বলেন, বিলের শুরুতেই উল্লেখ রয়েছে-সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সাথে আরো পরামর্শ ও যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে এবং মানবাধিকার কমিশনের কার্যক্রম যাতে বন্ধ না থাকে, সে কারণে আপাতত ২০০৯ সালের আইন পুনঃপ্রচলন করা হয়েছে। তিনি সংসদকে আরো জানান, অধ্যাদেশ রহিত করার পর যদি ২০০৯ সালের আইন পুনঃপ্রচলন না করা হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এমন ধারণা তৈরি হবে যে, বাংলাদেশে কোনো মানবাধিকার কমিশন নেই।
স্পিকার-বিরোধী নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিতণ্ডা: ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল-২০২৬’ পাসের পর সংসদে কথা বলার সময় বরাদ্দকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলের নেতা ডা: শফিকুর রহমান, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদের মধ্যে উত্তপ্ত বিতণ্ডা দেখা দেয়। বিরোধী দল দুই মিনিট সময়কে ‘অপ্রতুল’ উল্লেখ করে বাড়ানোর দাবি জানায়।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বিলে তাদের দেয়া ভিন্নমত (ডিসেন্ডিং অপিনিয়ন) নিয়ে যথাযথ আলোচনা করার সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। তিনি প্রশ্ন তোলেন, মাত্র দুই মিনিটে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়, অথচ ট্রেজারি বেঞ্চের সদস্যরা দীর্ঘ সময় পাচ্ছেন। পর্যাপ্ত সময় না দিলে সংসদীয় বিতর্ক অর্থহীন হয়ে পড়বে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জবাবে স্পিকার বলেন, তিনি সংসদের পূর্ববর্তী নজির অনুসরণ করছেন। আগে আপত্তি উত্থাপনে দুই মিনিট সময় দেয়া হলেও এবার ছয় মিনিট দেয়া হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে আপত্তি উত্থাপনকারীদের জন্য সময় কিছুটা বাড়ানোর আশ্বাস দেন তিনি।
এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিধি মোতাবেকই আলোচনা চলছে এবং আপত্তি উত্থাপনকারীদের জন্য নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় দেয়া হয়েছে। তিনি আরো জানান, সেকেন্ড বা থার্ড রিডিংয়ে কার্যপ্রণালী বিধি অনুসরণ করে বিরোধী দল চাইলে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ পেতে পারে।
বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়: ২০২৫ সালে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সরকার বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছতা আনতে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’ গঠন এবং বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিতে পৃথক সচিবালয় অধ্যাদেশ জারি করেছিল। তবে, গতকাল কণ্ঠভোটে এই অধ্যাদেশগুলো বাতিল করা হয়েছে, যার ফলে বিচার বিভাগ পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা লাভের সুযোগ হারিয়ে আবার নির্বাহী বিভাগের প্রভাবযুক্ত পূর্বের অবস্থায় ফিরে গেল। এই বাতিলের বিরোধিতা করে আরো আলোচনার দাবি জানিয়েছেন রংপুর-৪ আসনের এনসিপি সদস্যসচিব আখতার হোসেন। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ২০২৫-এর মূল ল্য ছিল বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের প্রভাব কমিয়ে প্রধান বিচারপতির নিয়ন্ত্রণে সরাসরি বিচারক নিয়োগ ও বদলি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য হুমকি-নাজিব মোমেন : সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ ও আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিলের উদ্যোগকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন। তিনি বলেন, নি¤œ আদালত এখনো উচ্চ আদালতের অধীনে স্বাধীনভাবে কাজ করলেও অতীতে বিচার বিভাগের পে অবস্থান নিলে বিচারকদের শোকজ ও বদলির মতো চাপের মুখে পড়তে হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, আইন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে ম্যাজিস্ট্রেটদের আনতে চাওয়ার প্রবণতা নতুন নয়। অতীতে বিরোধী দল দমনে নির্দেশ না মানলে বিচারকদের দূরবর্তী জেলায় বদলি করা হয়েছে। সেই পরিস্থিতি ফেরানোর চেষ্টা চলছে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
মোমেন বলেন, হাইকোর্টের রায়ের ভিত্তিতেই সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। ‘সাদ্দাম হোসেন ভার্সেস বাংলাদেশ’ মামলার রায়ে ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনরুজ্জীবিত করে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণ-পদায়ন, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা-সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করার নির্দেশ দেয়া হয়। একই সাথে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালা ২০১৭-কে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয় এবং তিন মাসের মধ্যে পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়। তিনি বলেন, সেই রায় বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই সুপ্রিম কোর্টে আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এখন সেটি বাতিলের উদ্যোগ নেয়া আদালতের রায়ের পরিপন্থী।
জামায়াতের আপত্তিতেও জামুকা বিল পাস : জামায়াতে ইসলামীর আপত্তি সত্ত্বেও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টির নাম বহাল রেখে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) অধ্যাদেশ সংশোধন করে আইনে রূপ দিয়েছে সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আহমেদ আযম খান বিলটি উত্থাপন করলে কণ্ঠভোটে তা পাস হয়।
বিলের ওপর আপত্তি জানিয়ে বক্তব্য দেন জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তবে তাদের জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এ বিষয়ে কোনো আপত্তি নেই বলে স্পিকারকে লিখিতভাবে জানায়।
পাস হওয়া আইনে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা সহযোগী ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্বাধীনতার ল্েয পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এদেশীয় সহযোগীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বেসামরিক নাগরিকরা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন। পাশাপাশি সশস্ত্রবাহিনী, মুক্তিবাহিনী, বিএলএফ, পুলিশ, ইপিআর, নৌকমান্ডো, কিলো ফোর্স ও আনসার সদস্যদেরও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য করা হবে।
আইনে ‘মুক্তিযুদ্ধ’-এর সংজ্ঞায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগী রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসসহ সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে পরিচালিত স্বাধীনতার যুদ্ধকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।



