সিলেট ব্যুরো
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ১৫ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে সিলেটের ভয়ঙ্কর অস্ত্রধারীরা। দুই দফা ‘ডেভিল হান্ট’ অভিযান চালিয়েও তাদের গ্রেফতারে ব্যর্থ হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ দিকে আন্দোলন দমনে ব্যবহৃত বহু আগ্নেয়াস্ত্র এখনো উদ্ধার না হওয়ায় নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
পুলিশের দাবি, চিহ্নিত অনেক অস্ত্রধারী দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে। কেউ কেউ বিদেশে অবস্থান করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় রয়েছে, আবার কেউ দেশে আত্মগোপনে থাকতে পারে। তাদের ধরতে বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কাজ করছে এবং সাধারণ মানুষকেও তথ্য পেলে পুলিশকে জানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নগরীর ছয়টি থানায় হামলা চালিয়ে ১০১টি বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র লুট করা হয়। এর মধ্যে বেশির ভাগ অস্ত্র উদ্ধার হলেও এখনো ১৬টি বড় ধরনের আগ্নেয়াস্ত্রের কোনো হদিস নেই। পুলিশ জানিয়েছে, এসব অস্ত্র উদ্ধারে গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, জুলাইয়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলন দমাতে পুলিশের পাশাপাশি যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মহড়া দেয় এবং ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। এসব ঘটনার ছবি ও ভিডিও সিলেটের প্রায় সব প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও চিহ্নিত অধিকাংশ অস্ত্রধারী এখনো গ্রেফতার হয়নি।
গত বছরের নভেম্বর মাসে ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনায় আনসার আহমদ রুহেল ওরফে শুটার আনসার ও তার সহযোগী আমিনুল ইসলাম নাঈমকে র্যাব-৯ গ্রেফতার করে। তারা বর্তমানে কারাগারে থাকলেও শুটার আনসারের ব্যবহৃত অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি।
জুলাই আন্দোলনের শুরুতে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর ধারালো অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহপরাণ হল থেকে দু’টি পিস্তল উদ্ধার করে শিক্ষার্থীরা। ২ আগস্ট থেকে শাবি ফটক ও মদিনা মার্কেট এলাকায় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন শুরু করে।
৩ আগস্ট পুলিশের ধাওয়ায় শাবি শিক্ষার্থী রুদ্র সেন পানিতে ডুবে মারা যান। ওই দিন সুরমা আবাসিক এলাকায় একের পর এক গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় ৪ আগস্ট। সেদিন কোর্ট পয়েন্ট, জিন্দাবাজার, বন্দরবাজার ও চৌহাট্টা এলাকায় প্রকাশ্যে শত শত রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তৎকালীন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সামনেই অস্ত্রের মহড়া চলে।
ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের একাধিক শীর্ষ নেতা ও ক্যাডার ওই দিন সশস্ত্র অবস্থায় মাঠে ছিল এবং গুলিবর্ষণে নেতৃত্ব দেয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় অসংখ্য শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ আহত হন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জুলাই আন্দোলনে ৩ ও ৪ আগস্ট সিলেটের রাজপথে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে যুবলীগ নেতা আবুল হোসেন, রুহুল আমীন শিপলু, রেজা ও তোফায়েল ছাত্র-জনতার ওপর হামলা করে।
এ ছাড়া ওই দিন কোর্টপয়েন্ট-জিন্দাবাজারে যুবলীগ ক্যাডার তুফায়েল, সাব্বির আহমদ, শাহ রুখনোজ্জামান রুখন, এমসি কলেজ ছাত্রলীগ নেতা তাজিম, আলি হোসাইন, আলমগীর, নিউটন চৌধুরী, হোসাইন আহমদ, দেলোয়ার হোসাইন, টেলেন্ট কান্তি দাস, অপু তালুকদার ও রনি তালুকদারের বিরুদ্ধে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী সরকারের পতন ও শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ১৫ মাস পার হলেও শুটার আনসার ছাড়া আর কোনো অস্ত্রধারী গ্রেফতার হয়নি।



