পুরান ঢাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা

কোর্টে হাজিরা দিতে গিয়ে খুন হয় ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ মামুন

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর পুরান ঢাকায় কোর্টকাচারি এলাকায় ন্যাশনাল মেডিক্যাল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের সামনে প্রকাশ্যে ফিল্মি স্টাইলে গুলি করে তারিক সাঈফ মামুন (৫৫) নামের এক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে। মামুন ঢাকার নিম্ন আদালতে দ্রুত বিচার মামলা ৩৫/২০০৩ এ মামলার হাজিরা দিতে এসেছিল বলে জানায় তার পরিবার। তিনি শীর্ষ সন্ত্রাসী বলে পুলিশের দাবি।

গতকাল সোমবার ১১টার দিকে ন্যাশনাল হাসপাতালের সামনে মামুনকে খুব কাছ থেকে গুলি করে দুই দুর্বৃত্ত। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত মামুনের স্ত্রী রিপা আক্তার জানান, আদালতে একটি মামলার হাজিরা দিতে গিয়েছিলেন। আমার স্বামী বিএনপি সমর্থিত একজন কর্মী ও পাশাপাশি ব্যবসা করতেন। আমরা জানতে পারি আমার স্বামী গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে আছেন। পরে ঢাকা মেডিক্যালে হাসপাতালে এসে আমার স্বামীকে মৃত অবস্থায় দেখতে পাই। শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের লোকজন এই হত্যার সাথে জড়িত বলে তিনি দাবি করেন। এর আগেও ইমনের লোকজন মামুনকে হত্যার চেষ্টা করেছিল বলে তিনি জানান। নিহতের গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুর। ঢাকায় বাড্ডার আফতাব নগর এলাকায় পরিবার নিয়ে থাকতেন।

ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যালের ওয়ার্ড মাস্টার মহিবুল্লাহ জানান, আনুমানিক বেলা ১১টার দিকে হাসপাতালের সামনে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। শব্দ শুনে হাসপাতালের মেইন গেটের সামনে এসে ওই ব্যক্তিকে রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখি। সাথে সাথে তাকে উদ্ধার করে ন্যাশনাল হাসপাতালে নিয়ে যান। অবস্থার অবনতি দেখে সেখান থেকে দ্রুত ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে আসি। তবে দায়িত্বরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মৃত ঘোষণা করেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মামুন গাড়ি থেকে নামার কিছুক্ষণের মধ্যেই গুলির শব্দ শুরু হয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছয় থেকে সাতটি গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালের সামনে রাস্তায় ঢলে পড়েন রক্তাক্ত মামুন। পেছনে রাস্তায় পুলিশ ছিল, হাসপাতালের গেটে নিরাপত্তাকর্মীরা ছিল। গুলির আওয়াজ শুনে সবাই এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করছিল। প্রথম যখন গুলি করে, মামুন রাস্তার ওপর থেকে দৌড়ে ন্যাশনাল মেডিক্যালের দিকে এগিয়ে আসতেছিলেন। মেইন গেট থেকে দু-তিন ফুট সামনে গিয়ে পড়ে যায়। আশপাশের লোকজন হাসপাতালে ভর্তি করানোর চেষ্টা করে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসা না করিয়ে ঢামেকে পাঠিয়ে দেয়।

এ ঘটনার একটি সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সিসি ফুটেজে দেখা যায়, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের গেটের সামনে মানুষ আসা-যাওয়া করছে। হঠাৎ এক ব্যক্তি দৌড়াতে দৌড়াতে পড়ে যান। এমন সময় পেছন থেকে দুইজন ব্যক্তিকে অস্ত্র হাতে ধাওয়া করতে দেখা যায়। দূর থেকে একজন গুলি করেন। পরে অস্ত্র হাতে ওই দু’জনই পড়ে যাওয়া ব্যক্তির কাছে এসে পরপর বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি করেন। এরপর দ্রুত তারা স্থান ত্যাগ করেন। ফুলহাতা টিশার্ট পরিহিত তারিক সাইফ মামুনকে সিনেমা স্টাইলে মাস্ক পরিহিত দুইজন বন্দুকধারী গুলি করতে করতে হাসপাতালের প্রধান ফটক থেকে একটু ভেতরে ঢুকে পড়েন। পরে তারা দৌড়ে পালিয়ে যান।

এর আগে ২০২৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাত ১০টার দিকে রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় তারিক সাঈফ মামুনকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায় একদল সন্ত্রাসী। সেই গুলি লেগেছিল মোটরসাইকেল আরোহী ভুবন চন্দ্র শীলের মাথায়। পরে ২৫ সেপ্টেম্বর ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতালে ভুবন চন্দ্র শীল মারা যান। ঘটনার পর তখন পুলিশ বলেছিল, শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাঈফ মামুনকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়েছিলেন কারাবন্দী শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমনের লোকজন। ওই গুলি লেগেছিল ভুবনের মাথায়। কয়েক মাস আগে শীর্ষ সন্ত্রাসী মামুন জামিনে মুক্ত হন।

পুলিশ জানায়, নিহত ব্যক্তি একসময় আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের সহযোগী ছিলেন, তবে অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে দীর্ঘ দিন ধরে বিরোধ চলছিল। শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন ও মামুন একসময় হাজারীবাগ, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও তেজগাঁও এলাকার আতঙ্ক ছিলেন। তাদের গড়ে তোলা বাহিনীর নাম ছিল ‘ইমন-মামুন’ বাহিনী। তারা দু’জনই চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী ও সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু হত্যা মামলার আসামি। নিহত সাঈফ মামুন শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের এক সময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। তবে তার সাথে দীর্ঘ দিন ধরে শীর্ষ সন্ত্রাসী ক্যাপ্টেন ইমনের দ্বন্দ্ব চলছিল। দীর্ঘ ২৪ বছর জেল খাটার পর ২০২৩ সালে তিনি জেল থেকে বের হন।

সূত্রাপুর থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, আমরা ধারণা করছি পূর্বশত্রুতা থেকে এই হত্যাকাণ্ড হতে পারে। তবে কারা এটি করেছে, এখনো নাম পরিচয় জানা যায়নি। এ দিকে পরিবার থেকে এখনো থানায় কোনো অভিযোগ করতে আসেনি। এ সম্পর্কে তদন্ত চলমান রয়েছে। নিহতের পরিবার থেকে অভিযোগ পেলেই আমরা কাজ শুরু করব।

শীর্ষ সন্ত্রাসী মামুন নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করে ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, তারিক সাঈফ মামুন নামের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। তিনি ক্যাপ্টেন ইমন গ্রুপের লোক ছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তার বিরুদ্ধে অনেক মামলা রয়েছে। আজ সে আদালতে হাজিরা দিতে গিয়েছিল। সেখান থেকে বের হওয়ার পরেই দুর্বৃত্তরা তাকে গুলি করে পালিয়ে যায়।

এ বিষয়ে ডিএমপির লালবাগ বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী বলেন, নিহত ব্যক্তি ইমন-মামুন গ্রুপের মামুন। তিনি এক সময় সানজিদুল ইসলাম ইমনের সহযোগী ছিল। তিনি একজন ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’। আমরা হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা করছি। ছোট ছোট গোয়েন্দা তথ্য পাচ্ছি। এর বাইরে এখন আর কিছু বলতে পারছি না।