দেশ-বিদেশে সুস্পষ্ট বার্তা : আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়

Printed Edition
দেশ-বিদেশে সুস্পষ্ট বার্তা : আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়
দেশ-বিদেশে সুস্পষ্ট বার্তা : আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়

বিশেষ সংবাদদাতা

বাংলাদেশের আদালত যে রায় ঘোষণা করেছেন, তা দেশ-বিদেশে সুস্পষ্ট বার্তা দেয়- আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়, ক্ষমতা বা অবস্থান যাই হোক না কেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্ত হাজারো মানুষের জন্য এ রায় আংশিক হলেও ন্যায়বিচারের গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। সেসব পরিবার আজও শোক ও যন্ত্রণা বহন করে চলেছে। গতকাল এক বিবৃতিতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এ কথা বলেন। তিনি আরো বলেন, আমরা এমন একসময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন বহু বছরের দমন-পীড়নে বিধ্বস্ত গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে নতুন করে গড়ে তোলার দায়িত্ব আমাদের। যেসব অপরাধ বিচারের মুখোমুখি হয়েছে- বিশেষ করে নিরস্ত্র তরুণ-তরুণী ও শিশুদের ওপর প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশ; তা আমাদের আইন যেমন লঙ্ঘন করেছে, তেমনি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মৌলিক সম্পর্কেও আঘাত হেনেছে।

এই নির্মমতা বাংলাদেশের মূল মূল্যবোধ- মানবিক মর্যাদা, সহনশীলতা ও ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গীকারের বিরুদ্ধে ছিল।

জুলাই-আগস্টের সেই দিনগুলোতে প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষ জীবন হারিয়েছেন। তারা কেবল পরিসংখ্যান নয়; তারা ছিলেন আমাদের সন্তান, আমাদের অভিভাবক, আমাদের নাগরিক; যাদের অধিকার ছিল শান্তিপূর্ণভাবে কথা বলার। দীর্ঘ শুনানির মাধ্যমে আদালতে উঠে এসেছে কিভাবে নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে, এমনকি আকাশপথ থেকেও প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল।

আজকের রায় সেই ত্যাগী মানুষের বেদনার প্রতি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয় এবং নিশ্চিত করে যে অপরাধীরা জবাবদিহির বাইরে থাকবে না।

অবশ্যই আগামীর পথ কেবল আইনি বিচারেই শেষ হবে না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকদের মধ্যকার বিশ্বাস পুনর্গঠন এখন আমাদের জরুরি কর্তব্য। মানুষ কেন জীবন বাজি রেখে সত্যিকারের প্রতিনিধিত্ব চাইতে রাস্তায় নেমেছিল- সেই প্রশ্ন বুঝতে হবে এবং এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যা তাদের প্রত্যাশার যোগ্য।

আজকের রায় সেই দীর্ঘ পথে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

আমি বিশ্বাস করি, সাহস, সংযম ও প্রজ্ঞা দিয়ে বাংলাদেশ সামনে আসা চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করবে।

আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং প্রতিটি মানুষের সম্ভাবনার প্রতি অঙ্গীকার বজায় রাখলে ন্যায়বিচার শুধু টিকে থাকবে না- বাংলাদেশে তা আরো দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

লালদিয়ায় ডেনমার্কের বিনিয়োগ দেশের জন্য নতুন যুগের সূচনা : প্রধান উপদেষ্টা

বাসস জানায়, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, লালদিয়া টার্মিনালে ডেনমার্কের কোম্পানি এপিএম টার্মিনালসের বিনিয়োগ বাংলাদেশের বাণিজ্য ও প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন যুগের সূচনা করেছে। তিনি বলেন, এটি দেশের জন্য একটি নতুন সূচনা। এটি ডেনমার্ক ও ইউরোপ থেকে বৃহত্তর এবং বহুমুখী বিনিয়োগের নতুন দ্বার উন্মোচন করছে।

রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় গতকাল প্রধান উপদেষ্টার সাথে মায়ের্স্ক গ্রুপ ও ডেনিশ সরকারের একটি প্রতিনিধিদল সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়।

এপিএম (এপি মোলার-মায়ের্স্ক) টার্মিনালসের মালিকানা প্রতিষ্ঠান মায়ের্স্ক গ্রুপের চেয়ারম্যান রবার্ট মায়ের্স্ক উগলা প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। ডেনমার্কের বাণিজ্য ও বিনিয়োগবিষয়ক স্টেট সেক্রেটারি লিনা গান্দলোসে হ্যানসেনও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

লালদিয়া টার্মিনাল চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ঢাকায় আসা উগলা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর টার্মিনালে তার কোম্পানির বিনিয়োগ হবে বাংলাদেশে কোনো ইউরোপীয় কোম্পানির সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। তিনি বলেন, ২০৩০ সালে লালদিয়া টার্মিনাল চালু হলে এটি চট্টগ্রাম বন্দরে বড় জাহাজ আগমনের সুযোগ তৈরি করবে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের গতি সঞ্চার করবে। উগলা বলেন, এটি হবে একটি টেকসই বন্দর। এটি আরো বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ খাতে ডেনিশ বিনিয়োগ বাংলাদেশে আরো ইউরোপীয় বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট করতে সহায়তা করবে।

মায়ের্স্ক গ্রুপ চেয়ারম্যান আরো জানান, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিপিং লাইন মালিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে তারা বাংলাদেশের লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইন খাতে আরো বিনিয়োগের সুযোগ অন্বেষণ করবে।

গত জানুয়ারিতে দাভোসে বৈঠকের পর বাংলাদেশে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য উগলাকে ধন্যবাদ জানান প্রধান উপদেষ্টা। ডেনিশ কোম্পানির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমরা আনন্দিত ও উচ্ছ্বসিত।

অধ্যাপক ইউনূস এপিএম টার্মিনালসকে লালদিয়া টার্মিনালের নির্মাণ দ্রুত সম্পন্ন করার আহ্বান জানান। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশকে লাখ লাখ উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে এবং অবকাঠামো উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে হবে। তিনি বলেন, এটি হবে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার। এটি ভবিষ্যতের দ্বার উন্মোচন করবে। তিনি আরো বলেন, চট্টগ্রাম উপকূলরেখার বন্দরকে বিশ্বমানের সুবিধায় রূপান্তর করা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বাণিজ্য সম্ভাবনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দাভোসে প্রধান উপদেষ্টার সাথে বৈঠকের কথা স্মরণ করে উগলা বলেন, একটি ফাউন্ডেশনের মালিকানাধীন মায়ের্স্ক গ্রুপ অধ্যাপক ইউনূসের কাজ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছে। তিনি বলেন, এই বিনিয়োগ স্থানীয় সম্প্রদায়ে বড় প্রভাব ফেলবে। কোম্পানি নারীদের সহায়তার উদ্যোগেও গুরুত্ব দেবে।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী এবং পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিডা নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, এটি আমাদের জন্য একটি মাইলফলক। তিনি ডেনিশ বিনিয়োগের প্রশংসা করেন এবং উল্লেখ করেন, এটি প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে অন্তর্বর্তী সরকারের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি প্রতিফলিত করে।

ডেনিশ প্রতিমন্ত্রী হ্যানসেন সম্প্রতি অনুমোদিত শ্রম আইন নিয়ে প্রধান উপদেষ্টাকে অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, এটি আরো বেশি ইউরোপীয় কোম্পানিকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে।

প্রধান উপদেষ্টার এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ এবং বাংলাদেশে ডেনিশ রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলারও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।