মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন অনুযায়ী, কোনো সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে। কিন্তু রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়াদ ইতোমধ্যে অনেক আগেই শেষ হয়ে যাওয়ায় নির্বাচন নিয়ে নতুন করে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে- শুধু ঢাকায় নয়, সারাদেশেই।
তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয় ২ জুন ২০২০ সালে, যার মেয়াদ শেষ হয়েছে ১ জুন ২০২৫-এ। অন্য দিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা হয়েছিল ৩ জুন ২০২০-এ, যার মেয়াদ শেষ হয়েছে ২ জুন ২০২৫-এ। ফলে আইনি সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের দাবি জোরদার হচ্ছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। পরবর্তীতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অধিকাংশ সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দেয়। তবে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। এ লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে।
ইসি সূত্র জানায়, চিঠিগুলো কমিশনে পৌঁছেছে এবং তা কমিশন সভায় উপস্থাপনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। সভায় অনুমোদনের পর নির্বাচনের রোডম্যাপ, সময়সূচি এবং প্রস্তুতির বিস্তারিত পরিকল্পনা নির্ধারণ করা হবে। এর মধ্যে থাকবে ভোটার তালিকা হালনাগাদ, সীমানা নির্ধারণ, প্রার্থী যাচাই-বাছাই এবং নির্বাচন কর্মকর্তাদের নিয়োগ। বিশেষ করে চট্টগ্রাম সিটির ক্ষেত্রে সময় স্বল্পতার কারণে আলাদা জরুরি পরিকল্পনা নেয়া হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই তিন সিটির নির্বাচন নতুন সরকারের অধীনে প্রথম বড় স্থানীয় নির্বাচন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করবে। তবে নির্বাচনকে ঘিরে আরেকটি বড় প্রশ্ন সামনে আসছে- ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সনদে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সরাসরি নির্বাচন কমিশনের অধীনে পরিচালনার প্রস্তাব থাকায়, এটি বাস্তবায়ন না হলে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হতে পারে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন মেয়র ও কাউন্সিলরদের পদত্যাগের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ১২টি সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অপসারণ করে। বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ ছাড়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। তবে আদালতের নির্দেশে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে ডা: শাহাদাত হোসেন মেয়রের দায়িত্ব পালন করছেন, যার মেয়াদও সম্প্র্র্রতি শেষ হয়েছে।
বিএনপির প্রস্তুতি ও সম্ভাব্য প্রার্থী : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পর বিএনপি সরকার গঠনের সাথে সাথে ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন নিয়ে দলটির ভেতরে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। যদিও প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে বিরোধীদল, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী আপত্তি জানিয়েছে এবং দ্রুত নির্বাচনের দাবি তুলেছে।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, পর্যায়ক্রমে যেসব সিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে সেখানে নির্বাচন আয়োজন করা হবে এবং অগ্রাধিকার দেয়া হবে ঢাকা ও চট্টগ্রামকে। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত সংসদে নেয়া হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ঢাকার দুই সিটিতে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, আব্দুস সালাম, তাবিথ আউয়াল, এম এ কাইয়ুম, শফিকুল ইসলাম খান এবং ইশরাক হোসেন। এর মধ্যে ইশরাক হোসেন ইতোমধ্যে ঢাকা দক্ষিণে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
ঢাকা দক্ষিণে আব্দুস সালাম প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং মনোনয়ন পেলে নির্বাচনে অংশ নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। একই সাথে হাবিব-উন-নবী খান সোহেলও দলের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন। অন্য দিকে ইশরাক হোসেন অতীত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আবারো প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়েছেন।
ঢাকা উত্তরে আলোচনায় রয়েছেন তাবিথ আউয়াল, যিনি ২০২০ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। এ ছাড়া শফিকুল ইসলাম খান (মিল্টন), এম এ কাইয়ুম এবং ব্যবসায়ী নেতা কফিল উদ্দিন আহম্মেদের নামও শোনা যাচ্ছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা দলীয় মনোনয়নের অপেক্ষায় রয়েছেন এবং ইতোমধ্যে নিজ নিজ অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
জামায়াত ও এনসিপির অবস্থান : জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটও স্থানীয় নির্বাচনে শক্ত অবস্থান নিতে চায়। দলটি সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ঢাকা উত্তরে সেলিম উদ্দীন ও অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমানের নাম আলোচনায় রয়েছে। দক্ষিণে সাদিক কায়েম, জাহিদুল ইসলাম, আব্দুল মান্নান ও এনায়েত উল্লাহর নাম শোনা যাচ্ছে।
তবে জোট সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা দক্ষিণে জামায়াত এনসিপিকে সমর্থন দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ মেয়র প্রার্থী হতে পারেন। এ ছাড়া উত্তর সিটিতে আরিফুল ইসলাম আদিবের নামও আলোচনায় রয়েছে।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন ছাড়া নির্বাচন সম্ভব নয়। তিনি জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, বহুমাত্রিক সঙ্কট মোকাবিলায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা অপরিহার্য।
অন্য দিকে জামায়াতের নায়েবে আমির ডা: সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কার প্রয়োজন এবং সেই সংস্কার ‘জুলাই সনদ’ অনুযায়ী হওয়া উচিত। সংস্কার সম্পন্ন হলে দল নির্বাচনে অংশ নেবে বলেও তিনি জানান।
সবমিলিয়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন শুধু একটি স্থানীয় নির্বাচন নয়- এটি হয়ে উঠতে পারে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রথম বড় পরীক্ষা। প্রশাসক বনাম নির্বাচিত প্রতিনিধি বিতর্ক, দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জোট রাজনীতি- সবকিছুর পাশাপাশি ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন প্রশ্নটি এই নির্বাচনের কেন্দ্রীয় ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। ফলে নির্বাচন কবে হবে, কিভাবে হবে- তার সাথে জড়িয়ে আছে দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক সংস্কার ও ঐক্যের প্রশ্নও।



