বিশেষ সংবাদদাতা
দেশের ব্যাংকিং খাত যখন ইতিহাসের সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের চাপে বিপর্যস্ত, তখন বাংলাদেশ ব্যাংক আবারো ঋণখেলাপিদের জন্য বিশেষ ছাড়ের সুযোগ চালু করেছে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত মন্দ ও ক্ষতিজনক খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের জন্য এককালীন নিষ্পত্তির সুযোগ দেয়া হয়েছে। গতকাল এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এক সার্কুলার জারি করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এটিকে খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্যোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও ব্যাংকারদের মতে, এই সিদ্ধান্ত ব্যাংকিং খাতে নৈতিক ঝুঁকি আরো বাড়াবে এবং নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী গ্রাহকদের প্রতি চরম বৈষম্য সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশ ব্যাংক জারি করা নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন সাপেক্ষে ব্যাংকগুলো গ্রাহকের সাথে সমঝোতার ভিত্তিতে এককালীন নিষ্পত্তি করতে পারবে। এতে আরোপিত ও অনারোপিত সুদের বড় অংশ মওকুফের সুযোগ রাখা হয়েছে। এমনকি ২০২৪ এর ৬ আগস্ট থেকে আজ ৩০ জুন পর্যন্ত পুনঃতফসিল করা খেলাপি ঋণও এই সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত দীর্ঘদিনের খেলাপিদের জন্য নতুন করে দরকষাকষির সুযোগ সৃষ্টি করছে। যারা বছরের পর বছর ঋণ পরিশোধ করেননি, তারাই এখন সুদ মওকুফ, জরিমানা কমানো এবং বিশেষ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। অন্য দিকে যারা সময়মতো কিস্তি পরিশোধ করেছেন, তাদের জন্য কোনো প্রণোদনা বা স্বীকৃতি নেই। ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় একটি ভুল বার্তা যাচ্ছে, ঋণ পরিশোধ না করলেও শেষ পর্যন্ত বিশেষ সুবিধা মিলবে।
ব্যাংক খাতের সুশাসন নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশে ইতোমধ্যে একাধিকবার পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন এবং বিশেষ ছাড়ের নীতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই দেখা গেছে, সাময়িকভাবে খেলাপি ঋণের হিসাব কমলেও কয়েক বছরের মধ্যে সেই ঋণ আবার খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। ফলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হয়ে কেবল হিসাবের খাতায় সাময়িক উন্নতি দেখা যায়। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, সার্কুলারে পরিচালনা পর্ষদকে ব্যাপক বিবেচনাধিকার দেয়া হয়েছে। কোন গ্রাহক এই সুবিধা পাবেন এবং কী পরিমাণ সুদ মওকুফ হবে, তার বড় অংশই ব্যাংকের নিজস্ব সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। এতে প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতারা বেশি সুবিধা পেতে পারেন, অথচ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা সাধারণ ব্যবসায়ীরা একই সুযোগ নাও পেতে পারেন। ফলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতের প্রধান সঙ্কট কেবল খেলাপি ঋণের পরিমাণ নয়; বরং দুর্বল ঋণ মূল্যায়ন, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং ঋণ আদায়ে দীর্ঘসূত্রিতা। এসব কাঠামোগত সমস্যা সমাধান না করে শুধু বিশেষ ছাড় দিলে প্রকৃত সঙ্কট থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়।
সার্কুলারে কৃষি ও সিএমএসএমই খাতের কটেজ, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র ঋণকে অগ্রাধিকার দেয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে বাস্তবে বড় করপোরেট খেলাপিরাই অতীতে এমন সুবিধার বড় অংশ ভোগ করেছে। ফলে এবারো একই চিত্র দেখা যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যাংকারদের একটি অংশ বলছেন, খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য বিশেষ এক্সিট একটি স্বল্পমেয়াদি প্রশাসনিক ব্যবস্থা হতে পারে। কিন্তু এটি কখনোই টেকসই সমাধান নয়। কারণ, বারবার ছাড় দেয়া হলে ভবিষ্যতে নতুন ঋণগ্রহীতারাও ধারণা করবেন যে, নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধ না করলেও একসময় বিশেষ সুবিধা পাওয়া যাবে। এতে ঋণ সংস্কৃতি আরো দুর্বল হবে। এদিকে আমানতকারীদের মধ্যেও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, ব্যাংকের আয়ের বড় অংশই আসে ঋণের সুদ থেকে। ব্যাপক হারে সুদ মওকুফ করা হলে ব্যাংকের মুনাফা কমবে, মূলধনের ওপর চাপ বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়তে পারে আমানতকারীদের স্বার্থের ওপরও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলাপি ঋণ কমাতে হলে প্রথমে বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনিব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, ঋণ পুনরুদ্ধার ট্রাইব্যুনালকে কার্যকর করতে হবে এবং রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবমুক্ত ঋণ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি ইচ্ছাকৃত খেলাপি ও প্রকৃত ব্যবসায়িক সঙ্কটে পড়া ঋণগ্রহীতাদের আলাদা করে মূল্যায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। সব মিলিয়ে নতুন বিশেষ এক্সিট নীতিমালা স্বল্পমেয়াদে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যানে কিছুটা স্বস্তি আনতে পারে। কিন্তু সুশাসন, ন্যায্যতা ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক শৃঙ্খলার দৃষ্টিকোণ থেকে এটি নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ সুবিধার এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতে নিয়ম মেনে ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতি আরো দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত সমাধানের পরিবর্তে এটি কেবল সমস্যাকে ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেয়ার আরেকটি উদ্যোগ হয়ে উঠতে পারে।



