বিদ্যুৎ খাতে মূল্য, চুক্তি ও শাসন সঙ্কটের স্থায়ী উত্তরণ দরকার

বিদ্যুৎ খাতের পোস্টমর্টেম

চাহিদা কমলেও বা জ্বালানি সঙ্কট দেখা দিলেও সরকারকে নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন আগের সিদ্ধান্তগুলো বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বাজেটকে বেঁধে ফেলছে, অন্যদিকে আর্থিক ব্যবস্থাপনার নমনীয়তা মারাত্মকভাবে সীমিত হয়ে পড়ছে। এনআরসি বলছে, এই চুক্তিগুলো পুনঃসমন্বয় ছাড়া অতিরিক্ত মূল্য ও অতিরিক্ত সক্ষমতার আর্থিক বোঝা বহু বছর ধরে চলতেই থাকবে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

২০১০ সালে প্রণীত ‘কুইক এনহ্যান্সমেন্ট অব ইলেকট্রিসিটি অ্যান্ড এনার্জি সাপ্লাই (স্পেশাল প্রভিশনস) আইন’-সংক্ষেপে কিউইইইএস আইন- দীর্ঘ ১৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে একটি ব্যতিক্রমী শাসন কাঠামো তৈরি করেছিল। ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে এই আইন বাতিল হওয়া নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক সংশোধন। এর মধ্য দিয়ে স্বাভাবিক দরপত্র, নিয়ন্ত্রক তদারকি ও বিচারিক পর্যালোচনার বাইরে গিয়ে চুক্তি করার আইনি ভিত্তির অবসান ঘটে।

কিন্তু জাতীয় সংস্কার কমিশনের (এনআরসি) বিশ্লেষণ বলছে, এই বাতিলই বিদ্যুৎ খাতের মূল্য, রাজস্ব চাপ ও শাসন সঙ্কটের সমাধান নয়। বরং কিউইইইএস যুগের সবচেয়ে ভারী উত্তরাধিকার রয়ে গেছে আইনের বাইরে- দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক অভ্যাসে।

বাতিল হলেও বহাল দীর্ঘমেয়াদি দায়

কিউইইইএস আইনের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো- আইন বাতিল হলেও এর আওতায় সম্পাদিত বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিগুলো (পিপিএ) বহাল রয়েছে। এসব চুক্তির মেয়াদ সাধারণত ২০ থেকে ২৫ বছর। এর সাথে যুক্ত রয়েছে নির্দিষ্ট সক্ষমতা ভাড়া (পধঢ়ধপরঃু ঢ়ধুসবহঃ), ‘টেক-অর-পে’ বাধ্যবাধকতা, জ্বালানি ব্যয়ের পূর্ণ পাস-থ্রু এবং মূল্যসূচক সমন্বয়ের ধারা।

চাহিদা কমলেও বা জ্বালানি সঙ্কট দেখা দিলেও সরকারকে নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন আগের সিদ্ধান্তগুলো বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বাজেটকে বেঁধে ফেলছে, অন্যদিকে আর্থিক ব্যবস্থাপনার নমনীয়তা মারাত্মকভাবে সীমিত হয়ে পড়ছে। এনআরসি বলছে, এই চুক্তিগুলো পুনঃসমন্বয় ছাড়া অতিরিক্ত মূল্য ও অতিরিক্ত সক্ষমতার আর্থিক বোঝা বহু বছর ধরে চলতেই থাকবে।

প্রাতিষ্ঠানিক ‘পাথ ডিপেন্ডেন্স’

দীর্ঘ সময় কিউইইইএস ব্যবস্থার অধীনে কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুৎ খাতের পরিকল্পনা, দরপত্র ও সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়ায় একটি প্রাতিষ্ঠানিক অভ্যাস তৈরি হয়েছে- যাকে কমিশন বলছে ‘পাথ ডিপেন্ডেন্স’। অর্থাৎ, আইনি কাঠামো বদলালেও আচরণ ও সক্ষমতা বদলায়নি।

জরুরি ক্ষমতার আওতায় দরকষাকষিভিত্তিক সিদ্ধান্তে অভ্যস্ত কর্মকর্তাদের অনেকেই প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ও কঠোর নিয়ন্ত্রক নজরদারিতে ফিরতে উৎসাহ বা সক্ষমতা দেখাচ্ছেন না। জটিল অবকাঠামো চুক্তি মূল্যায়ন ও আলোচনার জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি ও আইনি দক্ষতাও এখনো অসম। ফলে আশঙ্কা রয়েছে- আইন বদলালেও অন্য নামে বা অন্য যুক্তিতে একই ধরনের ছাড় আবার ফিরে আসতে পারে।

নিয়ন্ত্রক দুর্বলতা এখনো কাটেনি

কিউইইইএস বাতিলের পর আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রক কাঠামো ফিরে এলেও বাস্তবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) ক্ষমতা এখনো সীমাবদ্ধ। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে নির্ধারিত মূল্য কাঠামো নিয়ন্ত্রক হস্তক্ষেপের সুযোগ সঙ্কুচিত করে রেখেছে।

এ ছাড়া রাজনৈতিক প্রভাব, তথ্যের অসমতা ও বিশ্লেষণী সক্ষমতার ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে রাখছে। এনআরসির মতে, কেবল আইনি এখতিয়ার নয়- স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়ানো ছাড়া কার্যকর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। নীতিনির্ধারণ, ক্রয়প্রক্রিয়া ও নিয়ন্ত্রণ- এই তিনটির মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন না থাকলে অতীতের ভুল পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থেকেই যাবে।

পরিকল্পনা ও ক্রয়ের বিচ্ছিন্নতা

আগের অধ্যায়গুলোতে চিহ্নিত আরেকটি বড় সমস্যা ছিল পরিকল্পনা ও প্রকল্প অনুমোদনের মধ্যকার বিচ্ছিন্নতা। কিউইইইএস বাতিল হলেও এই ফাঁক স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়নি। বিদ্যুৎ খাতের মাস্টারপ্ল্যান এখনো এমনভাবে সংশোধন করা সম্ভব, যাতে আগেই নির্ধারিত প্রকল্পকে যৌক্তিক দেখানো যায়।

চাহিদা পূর্বাভাস অতিরঞ্জিত হলে বা রাজনৈতিক অগ্রাধিকার প্রাধান্য পেলে অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। এনআরসি বলছে, সংস্কার কেবল ‘কিভাবে’ প্রকল্প অনুমোদিত হবে- এখানেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং ‘কখন’ ও ‘কোন শর্তে’ প্রকল্প এগোবে, তা নির্দিষ্ট করাও জরুরি।

আইনি ও আর্থিক ঝুঁকির বাস্তবতা

কিউইইইএস যুগের চুক্তিগুলো অক্ষত রেখে বসে থাকাও ঝুঁকিপূর্ণ। অর্থ পরিশোধে দেরি, চুক্তি ছাঁটাই বা একতরফা পদক্ষেপ নিলে আন্তর্জাতিক সালিশি ও মামলার আশঙ্কা রয়েছে- বিশেষ করে যেখানে বিদেশী ফোরামে বিরোধ নিষ্পত্তির ধারা আছে।

অন্য দিকে, কোনো পরিবর্তন ছাড়াই এসব চুক্তি বহাল রাখলে রাজস্ব চাপ বাড়বে এবং উন্নয়ন ব্যয় সঙ্কুচিত হবে। ফলে প্রশ্নটা স্থিতিশীলতা বনাম সংস্কারের নয়; বরং নিয়ন্ত্রিত সংস্কার বনাম অনিয়ন্ত্রিত আর্থিক অবনতির। এনআরসি বলছে, লক্ষ্যভিত্তিক চুক্তি পর্যালোচনা ও পুনঃআলোচনা- আইনসম্মত, স্বচ্ছ ও আর্থিক প্রভাব বিবেচনায় অগ্রাধিকার দিয়ে, সম্ভব এবং প্রয়োজনীয়।

নতুন নামে পুরনো ব্যতিক্রমের ঝুঁকি

আরেকটি বড় আশঙ্কা হলো ‘নীতিগত প্রতিস্থাপন’। অর্থাৎ, একটি ব্যতিক্রমী কাঠামোর জায়গায় আরেকটি ব্যতিক্রমী কাঠামো চলে আসা-নতুন নামে, নতুন যুক্তিতে। ভবিষ্যতে কোনো সঙ্কট দেখিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্তের নামে যদি আবার নিয়ন্ত্রণ ও দরপত্রের নিয়ম শিথিল করা হয়, তাহলে কিউইইইএসের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো যাবে না।

কমিশনের সতর্কতা স্পষ্ট- জরুরি অবস্থা আর নিয়মের বাইরে যাওয়াকে এক করে দেখা যাবে না। জরুরি ব্যবস্থা হলে তা হতে হবে সময়সীমাবদ্ধ, সীমিত পরিসরের এবং কঠোর নজরদারির আওতায়।

শুরুটা এখানেই, শেষ নয়

এনআরসির উপসংহার পরিষ্কার, ছঊঊঊঝ আইন বাতিল একটি সূচনা, কোনো সমাপ্তি নয়। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ভারসাম্য ফেরানো, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা পুনর্গঠন, নিয়ন্ত্রক শক্তিশালী করা এবং পরিকল্পনা-ক্রয়ের সংযোগ স্থাপন, সব মিলিয়ে ধারাবাহিক ও সমন্বিত সংস্কার ছাড়া টেকসই সমাধান মিলবে না।

স্বচ্ছতা ও তদারকিতে দ্রুত অগ্রগতি আস্থা তৈরি করতে পারে। আর দীর্ঘমেয়াদে চুক্তি ও প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার উদ্যোগই বিদ্যুৎ খাতে মূল্য ও শাসনের বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে পারে। নচেৎ, আইন বাতিল হলেও অতিরিক্ত মূল্য ও রাজস্ব চাপের ছায়া থেকে যাবে আরো বহু বছর।