পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করলে বাকশালে ফেরার ঝুঁকি

বড় সিদ্ধান্ত সংসদের ওপর ছাড়ার আর্জি জামায়াতের

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

সংবিধানের ঐতিহাসিক পঞ্চদশ সংশোধনী আইনটি ঢালাওভাবে পুরোটা বাতিল করা হলে দেশ অনিবার্যভাবে ফের ‘বাকশাল’ ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির পক্ষ থেকে পুরো সংশোধনী বাতিল না করে কেবল তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলুপ্তির মতো বিষয়গুলো; যা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সাথে সাংঘর্ষিক সেগুলো আদালত কর্তৃক বাতিল করে বাকি ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের মতো বড় বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়ার ভার নির্বাচিত সংসদের ওপর ছেড়ে দেয়ার আর্জি জানানো হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বেঞ্চে পঞ্চদশ সংশোধনী মামলার দ্বিতীয় দিনের শুনানি চলাকালে জামায়াতের পক্ষে এই গুরুত্বপূর্ণ আইনি অবস্থান তুলে ধরেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। শুনানিতে তার সাথে ছিলেন আইনজীবী সাদ্দাম হোসেন, আব্দুল ওয়াদুদ ও জাহিদ বিন আমজাদ। অন্য দিকে রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক এবং অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আরশাদুর রউফ। মঙ্গলবার জামায়াত ছাড়াও মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেনের পক্ষে ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির শুনানি করেন, এর আগে মূল রিটকারী ড. বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে শুনানি শেষ করেছিলেন আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া। উভয় পক্ষের দীর্ঘ শুনানি শেষে আপিল বিভাগ মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আজ বুধবার দিন ধার্য করেছেন।

মঙ্গলবার শুনানি শেষে সুপ্রিম কোর্ট বারান্দায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জামায়াতের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি সংক্রান্ত বিষয়গুলো আদালতের বদলে সংসদে মীমাংসা হওয়ার ওপর বিশেষ জোর দেন। আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতি কী হবে, প্রস্তাবনায় কিংবা অনুচ্ছেদ ৮, ৯, ১০, ১১, ১২ এবং ২৫ (২)-এ কী থাকবে এগুলো সম্পূর্ণ নীতিগত ও রাজনৈতিক বিষয়। ক্ষমতার পৃথকীকরণ তত্ত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি সাবমিশন করেন যে, আদালত যদি এই নীতি নির্ধারণী অংশে হস্তক্ষেপ করে, তবে সংসদের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা খর্ব হয়। আদালতের কখনোই ‘সুপার লেজিসলেটর’ বা আইনসভার ওপর কোনো অভিভাবকের ভূমিকা পালন করা উচিত নয় এবং রাজনৈতিক বিতর্ক সেটেল করতে গেলে আদালত নিজেই বড় বিতর্কের সম্মুখীন হয়। সে কারণে তাদের সাবমিশন হলো, মৌলিক বা প্রস্তাবনায় যে সব পরিবর্তনের সূচনা করা হয়েছিল, এগুলো যেন আদালতে সিদ্ধান্ত না নিয়ে সংসদের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়, যাতে সংসদ আগামীতে ‘জুলাই চার্টার’-এর আলোকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার মতো বিষয়গুলো, যা না থাকলে গণতন্ত্র বা জনগণের সার্বভৌমত্ব থাকে না, সেগুলো যেহেতু মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী, তাই উচ্চ আদালতের উচিত কেবল সেই ধারাগুলোকে বাতিল ঘোষণা করা। আদালত যদি নিজের সীমার বাইরে গিয়ে সংসদের আইনি এখতিয়ারে এনক্রোচমেন্ট বা অনধিকার প্রবেশ করে, তবে গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় সিস্টেমে তিন অঙ্গের (আইন, শাসন ও বিচার বিভাগ) ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হবে না।

পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী একযোগে বাতিল হলে দেশে কেমন আইনি সঙ্কট তৈরি হতে পারে, তার ব্যাখ্যায় জামায়াতের এই আইনজীবী চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রবর্তিত ‘বাকশাল’ ব্যবস্থার প্রসঙ্গ টানেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, পুরো সংশোধনী যদি আপিল বিভাগ ‘এ টু জেড’ বাতিল করে দেন, তবে সংবিধানের চ্যাপ্টার সিক্স-এর ‘এ’ (অধ্যায় ৬ক) বাতিল হয়ে যাবে, যার ফলে দেশ অনিবার্যভাবে আবার বাকশাল ব্যবস্থাপনায় ফিরে যাবে। এটি আদালতের কাজ হতে পারে না এবং পুরোটা বাতিল করলে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের মতো নীতিগত বিষয়গুলোও বাতিল হয়ে যাবে, যা মূলত পোলস্টার বা রাষ্ট্রের গাইডিং প্রিন্সিপাল এবং এগুলো নির্ধারণের একমাত্র ফোরাম হলো সংসদ। রাজনৈতিক বিতর্ক আদালতের চার দেয়ালের মধ্যে বসে সিদ্ধান্ত নিতে গেলে জনগণের মধ্যে একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। এই আইনি জটিলতা এড়াতে তারা সংশোধনীর বিষয়গুলোকে আইনি বিশ্লেষণের মাধ্যমে দু’টি ভাগে বিভক্ত করে আদালতের সামনে একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা জমা দিয়েছেন; যার প্রথম ভাগে থাকা ৪১টি নীতি ও পদ্ধতির বিষয় সংসদের বিবেচনার জন্য রেখে কেবল দ্বিতীয় ভাগে থাকা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাসংক্রান্ত ধারাগুলো আদালতকে বাতিলের আর্জি জানানো হয়েছে, যাতে বিচার বিভাগের মর্যাদা ও স্বাধীনতা অক্ষুণœ থাকে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ কয়েকজনের করা রিট মামলার নিষ্পত্তি করে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু অংশ বাতিল ঘোষণা করেছিল হাইকোর্ট বিভাগ। ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৫৫টি ক্ষেত্রে সংযোজন, পরিমার্জন ও প্রতিস্থাপন আনা হয়েছিল, যার মধ্যে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তি-সংক্রান্ত আইনের ২০ ও ২১ ধারাকে সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করা হয়। হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে নির্বাচন ব্যবস্থাকে দলীয়করণের মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ‘গণতন্ত্র’ ও ‘জনগণের সার্বভৌমত্ব’-কে ধ্বংস করা হয়েছে, যার ফলে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে নাগরিকদের ভোটাধিকার হরণ করা হয় এবং যা শেষ পর্যন্ত জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের জন্ম দেয়।

এ ছাড়া হাইকোর্টের ওই রায়ে অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকারীকে রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান-সংক্রান্ত ৭ক অনুচ্ছেদকে অস্পষ্ট ও হাতিয়ার হিসেবে আখ্যায়িত করে বাতিল করা হয়। একই সাথে পরবর্তী সংসদের সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা কেড়ে নেয়া ৭খ অনুচ্ছেদ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপকারী ৪৪ (২) অনুচ্ছেদ এবং গণভোটের বিধান বিলুপ্তকারী ৪২ ধারাকে বাতিল করে দ্বাদশ সংশোধনীর মূল ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা হয়েছিল। তবে হাইকোর্ট পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল না করে বাকি বিধানগুলোর ভার সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়ায়, সেই রায়ের বিরুদ্ধে পুরো সংশোধনী বাতিলের দাবিতে আপিল করেছিল রিটকারী বাদিপক্ষ, যার ধারাবাহিকতায় এখন সর্বোচ্চ আদালতে এই ঐতিহাসিক আপিল শুনানি চলছে।