হামিদুল ইসলাম সরকার
জরুরি প্রকল্প বাস্তবায়নেও বাংলাদেশে তাগিদ থাকে না। সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো বিদ্যুৎ খাতের প্রকল্প। আর সেই খাতের একটি প্রকল্প চলছে বছরের পর বছর। রূপসা আটশ’ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের বাস্তবায়ন খরচ, যা ধরে অনুমোদন দেয়া হয়, আট বছর পর এসে সেই খরচ ২০.৪৩ শতাংশ বা এক হাজার ৭৩৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা কমানো হলো। আর কাজের প্রাক্কলনের তুলনায় চুক্তিমূল্য কম হওয়ায় ৬.৮ কোটি ডলার বিদেশী ঋণ কম নিতে হয়েছে। তবে চার বছরের প্রকল্প আট বছরে ৯৪.০২ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। এখন মেয়াদ বাড়িয়ে ৯ বছরে উন্নীত করার জন্য সংশোধিত প্রস্তাবনা দলিল পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগে পাঠানো হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, নির্ধারিত সময়ের পূর্বে প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ার মূল কারণ হলো কমিশনিংকালীন ইউনিট-১ এ গ্যাস টারবাইনে হাই ভেরিয়েশন পরিলক্ষিত হওয়া।
বিদ্যুৎ বিভাগের সংশোধিত প্রকল্প দলিলের তথ্য থেকে জানা গেছে, দেশে বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে সহায়ক ভূমিকা পালন, ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও সরবরাহের ঘাটতি কমাতে সহায়তা, পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বিদ্যুতের মাধ্যমে সিস্টেম লস কমানোর জন্য রূপসা আটশ’ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয়।
প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধি : বিদেশী ঋণসহ মোট আট হাজার ৪৯৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পটি জুলাই ২০১৮ হতে জুন ২০২২ পর্যন্ত মেয়াদে বাস্তবায়নে ২২ মে ২০১৮ তারিখে একনেকে অনুমোদিত হয়। এখানে জিওবি ২ হাজার ৪৬০ কোটি ৭৮ লাখ টাকা, এডিবি, আইডিবি এবং জেএফপিআর-এর ঋণ/অনুদান পাঁচ হাজার ৯৮৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব ৫০ কোটি টাকা প্রাক্কলিত অর্থায়ন ধরা হয়। পরবর্তীতে, বিদ্যুৎ বিভাগ কর্তৃক ১৬ জুলাই ২০২২ তারিখ ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়া এক বছর বৃদ্ধি করে মেয়াদ জুন ২০২৩ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। এরপর বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন কর্তৃক ২০ জুন ২০২৩ তারিখে প্রকল্পের মেয়াদ ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়াই আরো বছর বৃদ্ধিতে জুন ২০২৫ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। সর্বশেষ বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়াই মেয়াদ আরো এক বছর বৃদ্ধি করে জুন ২০২৬ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। বর্তমানে প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বৃদ্ধি করে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ হ্রাস, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার পরিবর্তন, পরিকল্পনা কমিশনের পূর্বানুমোদন প্রতিফলনসহ প্রকল্পের বিভিন্ন অঙ্গের ব্যয় হ্রাস/বৃদ্ধির কারণে মোট ছয় হাজার ৭৬২ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকায় কমিয়ে আনার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
৮ বছর পর খরচ ২০.৪৩ শতাংশ কমলো : প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় ইপিসি চুক্তিমূল্য কম হওয়ায় প্রকল্পে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৬.৮ কোটি ডলার কমে গেছে। ফলে প্রস্তাবিত ১ম সংশোধিত ব্যয় অনুমোদিত মূল ডিপিপির তুলনায় এক হাজার ৭৩৬ কোটি ৩৫ লাখ ৮৮ হাজার টাকা বা ২০.৪৩ শতাংশ কমেছে।
৮ বছরে অগ্রগতি : চলতি বছরের মে পর্যন্ত প্রায় আট বছরে প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিত ব্যয় চার হাজার ৯২৭.৪৩ কোটি টাকা বা (৫৭.৯৮ শতাংশ) যেখানে জিওবি এক হাজার ১৫৪.৪৪ কোটি টাকা, প্রকল্প সাহায্য তিন হাজার ৭২২.১৩ কোটি ও সংস্থার নিজস্ব ৫০.৮৬ কোটি টাকা। ওই অর্থ ব্যয়ের বিপরীতে বাস্তব অগ্রগতি ৯৪.০২ শতাংশ।
বাস্তবায়ন মেয়াদ বৃদ্ধির কারণ : নির্মাণাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রে দু’টি ইউনিট রয়েছে। উভয় ইউনিটের ইরেকশন সম্পাদনপূর্বক কমিশনিং চলমান রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের পূর্বে প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ার মূল কারণ হলো কমিশনিং কালীন ইউনিট-১ এ গ্যাস টারবাইনে হাই ভেরিয়েশন পরিলক্ষিত হওয়া। সংশোধিত শিডিউল অনুযায়ী ইউনিট, ১ জুন ২০২৬ এবং ইউনিট-২ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে কমিশনিং সম্পন্ন হবে। তবে, শীত মৌসুমে গ্যাস সরবরাহ বিবেচনায় উভয় ইউনিটের কমিশনিং সম্পন্ন করতে ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত এবং প্রকল্পের অন্যান্য কাজ সম্পন্ন করতে আরো চার মাস সময়সহ প্রকল্পের মেয়াদ জুন ২০২৭ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন বলছে, প্রকল্পটি নিয়ে মূল্যায়ন কমিটির সভায় আলোচনা করা হবে। কেন এত বছরেও কাজ শেষ করতে পারল না। বিদেশী ঋণে নেয়া প্রকল্পগুলো যথাসময়ে বাস্তবায়ন না হলে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। তা ছাড়া পরবর্তীতে প্রকল্পে অর্থায়ন পাওয়া কষ্টকর হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে এত বেশি সময় অতিবাহিত করার পেছনে কোনো ধরনের গাফিলতি আছে কি না সেটাও দেখা হবে।



