জলবায়ু পরিবর্তন গণতন্ত্রের জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে : প্রতিবেদন

প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ২০২৪ সালে ১৮টি দেশের ২৩টি নির্বাচন ব্যাহত হয়েছে

Printed Edition
ফিলিপাইনের মিন্দানাওতে ২০২৫ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দেয়ার জন্য অপেক্ষা করার পর হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে এক নারী মাটিতে লুটিয়ে পড়েন : ইন্টারনেট
ফিলিপাইনের মিন্দানাওতে ২০২৫ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দেয়ার জন্য অপেক্ষা করার পর হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে এক নারী মাটিতে লুটিয়ে পড়েন : ইন্টারনেট

দ্য গার্ডিয়ান

জলবায়ু সঙ্কটের কারণে বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এখন এক নজিরবিহীন হুমকির মুখে পড়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিভিন্ন দেশের নির্বাচনগুলো এখন কেবল রাজনৈতিক মেরুকরণ বা আদর্শিক লড়াইয়ের দ্বারা নয়, বরং বন্যা, দাবানল এবং চরম আবহাওয়ার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাধ্যমেও গভীরভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ইলেক্টোরাল অ্যাসিস্ট্যান্স নামক একটি আন্তঃসরকারি সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই দশকে বিশ্বের ৫২টি দেশে অন্তত ৯৪টি নির্বাচন ও গণভোট জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সঙ্কটের কারণে সরাসরি বিঘিœত হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি যত বাড়ছে, বিশেষ করে এশিয়া ও আফ্রিকার ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর এই চাপ তত বেশি ঘনীভূত হচ্ছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, কেবল ২০২৪ সালেই ব্রাজিল, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা এবং সেনেগালসহ ১৮টি দেশে অন্তত ২৩টি নির্বাচন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়েছে। এসব দুর্যোগের ফলে কোথাও নির্বাচনী অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে, কোথাও ভোটাররা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, আবার কোথাও নির্বাচনের সময়সূচি শেষ মুহূর্তে পরিবর্তন করতে হয়েছে।

কিংস কলেজ লন্ডনের রাজনীতি বিজ্ঞানের অধ্যাপক ও এই প্রতিবেদনের অন্যতম সহ-লেখক সারাহ বার্চের মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি সবচেয়ে কম এমন সময়েই নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা উচিত। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশও এখনো তাদের হ্যারিকেন বা ঘূর্ণিঝড় মৌসুমের মধ্যেই নভেম্বর মাসে নির্বাচন আয়োজন করে থাকে।

তীব্র দাবদাহ বর্তমানে নির্বাচনের জন্য এক নতুন সঙ্কট হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২২ সাল থেকে অন্তত ১০টি দেশের নির্বাচন চরম তাপপ্রবাহের কারণে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, গত বছর ফিলিপাইনের সাধারণ নির্বাচনে প্রচণ্ড গরমে ভোট গণনার যন্ত্রগুলো বিকল হয়ে গিয়েছিল এবং আগে গ্রহণ করা ব্যালট পেপারগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেরিয়ে আসছিল। এ ছাড়া নাইজেরিয়ার লাগোসের মতো জনবহুল মেগাসিটিগুলোতে তীব্র গরমের দিন সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে, যা ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০১৯ সালে মোজাম্বিকের নির্বাচনের সময় সাইক্লোন ইদাইয়ের প্রভাবে হাজার হাজার মানুষের ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট তলিয়ে গিয়েছিল, যা সরাসরি দেশটির সংসদীয় ও প্রাদেশিক আসনের বন্টনে প্রভাব ফেলেছিল। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রতিবেদনে কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। অনেক দেশ ইতোমধ্যে অভিযোজন প্রক্রিয়া শুরু করেছে। যেমন, কানাডার আলবার্টা প্রদেশ দাবানল মৌসুম এড়াতে তাদের প্রথাগত নির্বাচনের মাস মে থেকে পরিবর্তন করে অক্টোবর নির্ধারণ করেছে।

অন্য দিকে, পেরুতে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মীদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে যাতে ভোটগ্রহণের দিন কোনো বিপর্যয় ঘটলে তারা দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা এখন এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। তাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে স্থিতিশীল রাখতে আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ, পরিবেশ রক্ষা সংস্থা এবং মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর সাথে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নিবিড় সমন্বয় এখন সময়ের দাবি। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া ভবিষ্যতের নির্বাচনগুলোতে জনমতের সঠিক প্রতিফলন ঘটানো ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়বে।