ময়মনসিংহে এক বছরে প্রাথমিকে কমেছে এক লাখ ১২ হাজার শিক্ষার্থী

৫৮ শতাংশ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই

Printed Edition

মো: সাজ্জাতুল ইসলাম ময়মনসিংহ

ময়মনসিংহে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমার প্রবণতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। মাত্র এক বছরে জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী কমেছে এক লাখ ১২ হাজার ৭৪৬ জন। একই সাথে প্রধান ও সহকারী শিক্ষক সংকট, জরাজীর্ণ ভবনসহ নানা সমস্যায় ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্যানুযায়ী, জেলার ১৩ উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে দুই হাজার ১৪০টি। ২০২৫ সালে এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল পাঁচ লাখ ৩৮ হাজার ৫৬৮ জন। চলতি বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে চার লাখ ২৫ হাজার ৮২২ জনে। অর্থাৎ এক বছরে কমেছে এক লাখ ১২ হাজার ৭৪৬ জন।

জেলায় দুই হাজার ১৪০টি বিদ্যালয়ের মধ্যে এক হাজার ২৪২টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে; অর্থাৎ ৫৮ শতাংশ বিদ্যালয় চলছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে। সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত ১১ হাজার ৯০২টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছে ১১ হাজার ৪৯ জন; শূন্য রয়েছে ৮৫৩টি পদ।

জানা যায়, তারাকান্দার পিঠাসূতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র আবু রায়হান মে পর্যন্ত নিয়মিত বিদ্যালয়ে গেলেও জুন থেকে আর আসছে না। পরে শিক্ষকরা জানতে পারেন, সংসারের অভাব অনটনের কারণে সে ঢাকায় একটি দরজির দোকানে কাজ নিয়েছে। একই বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী সুমাইয়া আক্তারও দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে যাচ্ছে না। পরিবার তাকে কওমি মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে দিয়েছে। বিদ্যালয়টির কাগজে-কলমে শিক্ষার্থী ১০৪ জন। ২০২২ সালে ছিল ১৫০ জন।

শিক্ষকদের ভাষ্য, দরিদ্র পরিবারের অনেক শিশু পরিবারের সাথে ঢাকায় গিয়ে কাজে যুক্ত হচ্ছে। আবার অনেকে কিন্ডারগার্টেন, বেসরকারি বিদ্যালয় ও মাদরাসায় চলে যাচ্ছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছর ময়মনসিংহে প্রাথমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি গফরগাঁওয়ে, সেখানে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং তারাকান্দায় ৪ শতাংশ। গফরগাঁওয়ে ২০২০ সালে সরকারি প্রাথমিকে শিক্ষার্থী ছিল ৬০ হাজার ৮১৫ জন। চলতি বছর তা কমে ৩৫ হাজার ২৭ জনে দাঁড়িয়েছে।

সদর উপজেলার পয়েস্তিরচর তারাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছয়টি শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র দু’জন। ফলে একাধিক শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের একসাথে পাঠদান করতে হচ্ছে। বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে শিক্ষার্থী ১১২ জন। ২০১৮ সালে ছিল ২২৩ জন। মুক্তাগাছার গোলাবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও ছয়টি পদের বিপরীতে শিক্ষক আছেন মাত্র দু’জন। বিন্নাকুড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাতটি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন চারজন।

অবকাঠামোগত সঙ্কটও প্রকট এ জেলার অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। জেলার ২৭টি বিদ্যালয়ে এখনো টিনশেড ভবনে পাঠদান চলছে। জরাজীর্ণ ভবনের সংখ্যা ১৮৭টি। সদর উপজেলার ঝাপারকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নদীভাঙনে পুরোনো ভবন বিলীন হওয়ার পর ২০১৯ সালে নির্মিত টিনশেড ভবনে পাঠদান চলছে। বিদ্যালয়টিতে ২০১৭ সালে শিক্ষার্থী ছিল ২৪০ জন, বর্তমানে ১০৭ জনে এসে দাঁড়িয়েছে। গত কয়েক বছরে শিক্ষার্থীর সংখ্যায় বড় ওঠানামা দেখা গেছে। ২০২১ সালে প্রায় পাঁচ লাখ ৪৮ হাজার থেকে ২০২২ সালে কমে চার লাখ ২৭ হাজারে এসে দাঁড়ায়। ২০২৩ সালে চার লাখ ৬৯ হাজার এবং ২০২৪ সালে চার লাখ ৬৬ হাজারে দাঁড়ায়।