চব্বিশের ৫ আগস্টের পর দেড় বছর পার হলেও বিগত ১৫ বছরের আওয়ামী দুঃশাসনের সহযোগীদের সরানো যায়নি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) থেকে। ২০২২ সালের বিতর্কিত কারিকুলাম প্রণয়নের সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা এখনো বহাল তবিয়তে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে পাহাড়সম অভিযোগ। হাজার হাজার কোটি টাকার পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ প্রক্রিয়ায় ভেতর-বাইরের সিন্ডিকেট-যোগসাজশ দুর্নীতি অনেকটা ওপেন-সিক্রেট। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবির প্রশাসনিক অদক্ষতা ও দূরদর্শীতার অভাবে কখনোই বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে শতভাগ মানসম্মত পাঠ্যপুস্তক তুলে দিতে পারেনি। ফ্যাসিস্ট শাসনামলের দোসরদের অনেককে বহাল তবিয়তে রেখেই আগস্ট-পরবর্তী সরকার প্রতিষ্ঠানটির নীতিনির্ধারণী পদগুলোতেই একের পর এক বিতর্কিত, অদক্ষ ও অনভিজ্ঞদের নিয়োগ দিচ্ছে। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণেœ এসব নিয়োগে কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রও উড়িয়ে দিচ্ছেন না শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা। আওয়ামী দোসর কর্মকর্তাদের কুটকৌশল, অদক্ষতা ও দুর্নীতির কারণে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ কারিকুলাম ও পাঠ্যপুস্তক উইংয়ে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। ফলে শিক্ষা উপদেষ্টা ঘোষিত ২০২৭ সালে নতুন কারিকুলাম ও নতুন পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা ।
২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ প্রণীত আইনে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) একটি সংবিধিবদ্ধ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বাস্তবে এটি সরকার/মন্ত্রণালয়ের একটি আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানের তকমা থেকে বের হতে পারছে না। প্রতিষ্ঠানটির নীতিনির্ধারকদের মন্ত্রণালয়ের ‘জি, স্যার/ইয়েস, স্যার’ হুকুম তালিম করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানের স্বাতন্ত্রকে বিসর্জন দিতে হয়। ২০০৮ সালে আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি সব সময় ‘গিনিপিগ’ হিসাবে ব্যবহার করছে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকার।
আওয়ামী দোসররা এখনো বহাল তবিয়তে : ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে এনসিটিবি আওয়ামী সরকারের ফরমায়েসি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। প্রতিষ্ঠানটিতে ১৫ বছরে নীতিনির্ধারণী থেকে পিয়ন পর্যন্ত খাস আওয়ামী দোসরদের ব্যতীত কাউকে নিয়োগ দেয়া হয়নি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ৫ আগস্টের পরও প্রতিষ্ঠানটিতে এখনো নীতিনির্ধারণী থেকে মধ্যম সারির কয়েক ডজন দোসর দীর্ঘ সময় ধরে বহাল তবিয়তেই আছে। এনসিটিবির কারিকুলাম উইংয়ের প্রধান নীতিনির্ধারক সাবেক সদস্য অধ্যাপক মশিউজ্জামান ছিলেন বিতর্কিত ২০২২ কারিকুলামের মূল নায়ক। ওই সময় তাকে ওই কারিকুলামের জনক বলেও তার অনুসারীরা প্রচার করতেন। অধ্যাপক মশিউজ্জামান ছিলেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা: দিপু মনির ডান হাত। এনসিটিবিতে কে কোন পদে পদায়ন পাবেন তা তিনি নির্ধারণ করে দিতেন। তার সময় তিনি ডজনখানেক নিজের বিশ^স্ত ও আওয়ামী দোসরকে এনসিটিবিতে পদায়ন করে নিয়ে আসেন। তার এতই প্রতাপ ছিল যে তৎকালীন সময় প্রাইমারি উইং সদস্য রিয়াজুল হাসান আওয়ামী সমর্থক হয়েও তাকে বদলি করা হয়। ২০২৪ সালের মে মাসে মশিউজ্জামান অবসরে গেলে রিয়াজুল হাসান এনসিটিবিতে পদায়ন পেতে আবার উঠেপড়ে লাগে। ৫ আগস্টের পরে রিয়াজুল হাসান তার পূর্বের শাস্তিমূলক বদলিকে পুঁজি করে এনসিটিবির সর্বোচ্চ চেয়ারম্যান পদের নিয়োগ বাগিয়ে নেন। এবার ফাঁকা মাঠে তিনিও মশিউজ্জামানের মতো একক প্রতাপশালী হয়ে উঠেন। মন্ত্রণালয়কে দিয়ে তার কাছের আওয়ামী অর্ধডজন অনুসারীকে এনসিটিবির গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন করিয়েছেন। এই দোসররাই এনসিটিবির আগস্ট-পরবর্তী কার্যক্রমে কৌশলে বাধা সৃষ্টি, দুর্নীতি, এমনকি সরকারকে বেকায়দায় ফেলার তৎপরতা চালাচ্ছেন। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন অধ্যাপক রিয়াদ চৌধুরী। তিনি এই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) পদে ৫ আগস্টের পর নিয়োগ পেয়েছেন। এর আগে আওয়ামী সরকারের আমলে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম) ও মাদরাসা বোর্ডের প্রকাশনা নিয়ন্ত্রকের দায়িত্বে ছিলেন। এনসিটিবিতে পদায়ন পাওয়ার পর গত দেড় বছরে দফতরের নানা অনিয়মের সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। আগস্ট-পরবর্তী এনসিটিবির উৎপাদক নিয়ন্ত্রক পদে পদায়ন পেয়েছেন অধ্যাপক আবু নাসের টুকু। এনসিটিবির সাবেক চেয়ারম্যান রিয়াজুল হাসানের ঘনিষ্ঠ বলে তিনিই তাকে ওই পদে নিয়ে এসেছেন। এনসিটিবির যেসব সেক্টরে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যায়, তার মধ্যে উৎপাদন শাখা অন্যতম।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রিয়াজুল হাসান থেকে বর্তমান পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ সংক্রান্ত নানা দুর্নীতির তীর ওই শাখার দিকে। ছলে-বলে কৌশলে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগসাজশের অভিযোগ অধ্যাপক আবু নাসের টুকুর বিরুদ্ধে। নোয়াখালীতে অবস্থিত দুটি বিশেষ মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির সাথে তার জড়িত থাকার অভিযোগ খোদ এনসিটিবির সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে শোনা যায়।
এ দিকে ভাণ্ডার শাখার ঊর্ধ্বতন ভাণ্ডার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। প্রাক্কলিত দরপত্র ফাঁস, কয়েকটি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির দণ্ড থেকে রেহাই দিতে নানা কৌশলের আশ্রয় নেয়ার অভিযোগ আছে। এনসিটিবির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা বিতরণ। এই শাখায় কয়েক মাস আগে বিতরণ নিয়ন্ত্রক পদে পদায়ন পেয়েছেন মোহাম্মদ মতিউর রহমান খান পাঠান। তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কো-অর্ডিনেটরের ছোট ভাই। ভাইয়ের তদবিরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মো: মজিবুর রহমান সহযোগিতায় তিনি এই পদে নিয়োগ পান। জানা গেছে, তার পদায়ন অল্প কয়েক মাস হলেও ইতোমধ্যে তিনিও নোয়াখালীর বিতর্কিত মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান দুটির সাথে যোগসাজশে জড়িয়ে গেছেন।
জানা গেছে, এনসিটিবির কারিকুলাম উইং (মাধ্যমিক)-এ এখনো দীপু মনি-মশিউজ্জামান গংরা বহাল তবিয়তে আছেন। এর মধ্যে আছেন কারিকুলাম উইংয়ের ঊর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সুলতানা সাদেক, ঊর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো: কমর উদ্দিন আকন, ঊর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক প্রবীর চন্দ্র রায়, ঊর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ মো: মোস্তফা সাইফুল আলম, বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সফিকুল আলম বকশ, বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক কামরুল হক ভূঞা, গবেষণা কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম, গবেষণা কর্মকর্তা ড. মো: আবু হানিফ। প্রাইমারি উইংয়েও বহাল তবিয়তে আছেন ঊর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ মো: আব্দুল মুমিন মোছাব্বির, বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির, বিশেষজ্ঞ মো: আহসানুল আরেফিন, গবেষণা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মফিজুর রহমান ও গবেষণা কর্মকর্তা মো: মনির হোসেন মজুমদার ।
এরা সবাই ২০২২ সালের বিতর্কিত কারিকুলাম ও পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের সাথে মশিউজ্জামানের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এই কারিকুলাম প্রণয়ন করে তারা রাষ্ট্রের কয়েক হাজার কোটি টাকার অপচয় করে। ৫ আগস্ট পরবর্তীতে সেই কারিকুলাম ও পাঠ্যপুস্তক স্থগিত করে ২০১২ সালের কারিকুলাম ও পাঠ্যবইয়ে সরকার ফিরে গেলে এরা অভ্যন্তরীণ নানা কৌশলে এর বিরোধিতা করেছিলেন। এমনকি ২০২৫ ও ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য ২০২৪ সালের আগস্টে পরবর্তীতে যখন পরিমার্জনের কাজ শুরু হয় পাঠ্যপুস্তক থেকে আওয়ামী বয়ান যাতে বাদ না পড়ে সে জন্য কৌশলে নানা বাধা সৃষ্টি করেন মশিউজ্জামানের সময় গড়ে ওঠা ওই সিন্ডিকেট।
সাম্প্রতিক আলোচিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন : এনসিটিবির প্রশাসন ব্যতীত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উইং হচ্ছে- কারিকুলাম। এই উইং থেকেই কোটি কোটি কোমলমতি শিক্ষার্থীর জন্য কারিকুলাম ও পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন হয়। শিক্ষার দর্শন, গুণগতমান ও আগামী প্রজন্ম বৈশ্যিক চ্যালেঞ্জ কিভাবে মোকাবেলা করবে তা কারিকুলাম ও পাঠ্যপুস্তকে প্রতিফলনের কাজটি মূলত এই উইং করে। সুতরাং এনসিটিবির চেয়ারম্যান ব্যতীত পরবর্তী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ ‘সদস্য, কারিকুলাম’।
প্রায় এক বছর এই উইং-এর কাজে স্থবিরতা চলছে। এনসিটিবির অধ্যাপক রবিউল কবির চৌধুরী ২০২৫ সালের ৬ নভেম্বর পর্যন্ত কারিকুলাম সদস্য পদে ছিলেন। কিন্তু তিনি ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ চেয়ারম্যানের (অতিরিক্ত দায়িত্ব) দায়িত্ব পান। দুই দায়িত্ব এক সাথে হওয়াতে চেয়ারম্যানের পদের দায়িত্বের প্রতি তাকে বেশি মনযোগী হতে হয়েছে। ফলে কারিকুলাম উইং-এর কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়। ২০২৫ সালের ৬ নভেম্বর অধ্যাপক রবিউল কবীর অবসরে গেলে কারিকুলাম সদস্য পদটি শূন্য হয়ে পড়ে। ফলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রতিশ্রুত ২০২৭ সালে শুরু করা নতুন কারিকুলাম ও পাঠ্যপুস্তক মুখ থুবড়ে পড়েছে। এই অবস্থায় সম্প্রতি গত ৭ জানুয়ারি ড. এ কে এম মাসুদুল হককে কারিকুলাম সদস্য পদে পদায়ন দিয়েছে মন্ত্রণালয়। ড. হকের সাথে দিনাজপুরের আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ইকবালুর রহিমের ঘনিষ্ঠতা দিনাজপুর অঞ্চলে সর্বজনবিদিত। ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পরে তাকে বৈষম্য দিনাজপুরের সরকারি বীরগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ পদে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে তিনি আবার পুরস্কার হিসাবে দিনাজপুর শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নিয়োগ দেয় মন্ত্রণালয়। ড. মাসুদুল হক দিনাজপুরের বিভিন্ন বিতর্কিত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে যুক্ত। কারিকুলাম বিষয় কোনো একাডেমিক বা বাস্তব পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। এ ছাড়াও তিনি বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের আত্তিকৃত অধ্যাপক। এ নিয়ে শিক্ষা ক্যাডার সমিতি এবং জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকদের ক্ষোভ রয়েছে।
এ ছাড়াও সম্প্রতি এনসিটিবির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য (অর্থ) পদে প্রশাসন ক্যাডারের উপ-সচিব আজীজ হায়দার ভূঁইয়াকে পদায়ন দেয়া হয়েছে। জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক সমমর্যাদার এই পদায়ন নিয়েও শিক্ষা ক্যাডারে অসন্তোষ রয়েছে। এই পদে তার পূর্বে যিনি ছিলেন তিনি প্রশাসন ক্যাডারের যুগ্ম-সচিব ছিলেন। এনসিটিবিতে তিনি স্বচ্ছতা ও সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করছিলেন। অভিযোগ রয়েছে- আজীজ হায়দার ভূঁইয়ার সাথে সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। এ ছাড়া ২০২০ সালের ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি ওই নির্বাচনকে ‘ভোট অবাধ, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ, জবাবদিহি ও উৎসবমূখর অনুষ্ঠিত হয়’ বলে পোস্ট করেছেন।
এসব বিষয়ে জানতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা সচিব রেহানা পারভীন-এর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।



