পুঁজিবাজারে সূচক ও লেনদেনের উন্নতি

বন্ধ কোম্পানি ডিলিস্টিংয়ের খবর সত্যি নয়

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

কোনো বাহুল্য বা আস্বাভাবিকতা নয়। বিনিয়োগকারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সাবলীলভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে পুঁজিবাজার। উন্নতি ঘটছে বাজারের সূচক ও লেনদেনের। গতকাল নতুন সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসের বাজার আচরণ নিয়ে এমনই মন্তব্য ছিল পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের। তারা মনে করেন, পুঁজিবাজারের এ আচরণ অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় পরিপক্ব মনে হচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের সচেতন অংশগ্রহণের ফলেই এটি সম্ভব হচ্ছে।

গতকাল রোববার দিনের শুরু থেকেই বাজার আচরণ ছিল বেশ সাবলীল। লেনদেনের বিভিন্ন পর্যায়ে বাজারে মৃদু বিক্রয়চাপ থাকলেও বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তায় ফের ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাজার। এতে দিনশেষে দুই পুঁজিবাজারই সূচকের উল্লেখযোগ্য উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স এদিন ৪৫ দশমিক ১৫ পয়েন্ট ধরে রাখে। ৫ হাজার ৮০৪ দশমিক ০৬ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি গতকাল দিনশেষে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৮৪৯ দশমিক ২১ পয়েন্টে। আর এভাবে সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছে যায় সূচকটি। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ২২ দশমিক ৪৭ ও ৩ দশমিক ৩৭ পয়েন্ট।

অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ৭৭ দশমিক ৪৪ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। ১৫ হাজার ৫১৫ দশমিক ২২ পয়েন্ট থেকে সূচকটি গতকাল দিনশেষে ১৫ হাজার ৫৯২ দশমিক ৬৭ পয়েন্টে স্থির হয়। সিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ১২৪ দশমিক ৫১ ও ৭৬৬ দশমিক ৮৩ পয়েন্ট।

সূচকের পাশাপাশি ঢাকা শেয়ারবাজারে গতকাল উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পায় লেনদেন। এদিন ডিএসই এক হাজার ৬৬৯ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিনের চেয়ে ২৪১ কোটি টাকা বেশি। গত বৃহস্পতিবার ডিএসইর লেনদেন ছিল এক হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। তবে একই সময় লেনদেনের বড় ধরনের অবনতির শিকার হয় চট্টগ্রাম শেয়ারবাজার। গতকাল বাজারটির লেনদেন ছিল মাত্র ১০ কোটি টাকা। এটি সিএসইর সাম্প্রতিক সময়ে সর্বনিম্ন লেনদেন।

দিনের বাজার আচরণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভালো কোম্পানির দিকে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের মাত্রা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। গতকাল ডিএসইর লেনদেনের একটি বড় অংশই সংঘটিত হয়েছে ভালো কোম্পানি ঘিরে। ব্যাংক, বীমাসহ সব খাতেরই মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোতে মূল্যস্তরে যথেষ্ট উন্নতি ঘটেছে। তবে এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি দেখা যায়নি গতকাল। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, মন্দা বাজারে যেভাবে বিনিয়োগকারীরা দ্রুত মুনাফার খোঁজে অপেক্ষাকৃত দুর্বল কোম্পানিগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়ে বাজারের স্বাভাবিক আচরণ দেখলে তারাও নিজেদের বিনিয়োগে ভালো কোম্পানিগুলোকেই প্রাধান্য দেন। আর এর ফলে কেটে যায় বাজারের অস্বাভাবিক আচরণ। তাদের মতে এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে সামনের দিনগুলোতে বিনিয়োগকারীদের পুঞ্জীভূত লোকসান থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এ দিকে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে ‘বন্ধ কোম্পানি ডিলিস্টিং বা তালিকাচ্যুত করার সিদ্ধান্ত’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদগুলোকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং বিভ্রান্তিকর বলে আখ্যায়িত করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। গতকাল (১২ জুলাই) বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো: আবুল কালাম স্বাক্ষরিত এক জরুরি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই ব্যাখ্যা দেয়া হয়।

বিএসইসি জানিয়েছে, দীর্ঘদিন উৎপাদন বা কার্যক্রম বন্ধ থাকা কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজার থেকে ডিলিস্টিং করার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এখনো নেয়া হয়নি। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গত ৯ জুলাই ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরামের (সিএমজেএফ) কার্যালয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় বিএসইসির বর্তমান চেয়ারম্যান মাসুদ খান সাংবাদিকদের সাথে পুঁজিবাজারের সমসাময়িক বিভিন্ন সংস্কার ও বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন।

কিন্তু পরবর্তীতে বেশ কিছু জাতীয় দৈনিক, অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় সংবাদ প্রচার করা হয় যে, বিএসইসি বন্ধ কোম্পানিগুলোকে বাজার থেকে সরিয়ে দেয়ার (ডিলিস্টিং) চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে; যা মূলত প্রকৃত তথ্যের অপব্যাখ্যা। তবে ডিলিস্টিংয়ের সিদ্ধান্ত এখনই কার্যকর না হলেও বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় বিশেষ বার্তা দিয়েছে কমিশন। বিএসইসি জানিয়েছে, যে সব কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন বা বাণিজ্যিক কার্যক্রমের বাইরে রয়েছে এবং যাদের ‘গোয়িং কনসার্ন’ (ভবিষ্যতে টিকে থাকার সক্ষমতা) চরম ঝুঁকির মুখে, সেসব কোম্পানির শেয়ারে লেনদেন করার ক্ষেত্রে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। বিজ্ঞপ্তিতে গুজব বা অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কোনো ধরনের বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত না নিতে পুঁজিবাজারের অংশীজনদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

অন্য দিকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ গতকাল ডিএসইতে মৌলভিত্তিসম্পন্ন ৩০ কোম্পানি নিয়ে গড়া বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ সমন্বয়ের কথা জানিয়েছে। সূচকটিতে যুক্ত হয়েছে তিনটি কোম্পানি ও বাদ গেছে তিনটি। যুক্ত হওয়া কোম্পানি তিনটি হলো বিএসআরএম লিঃ, একমি ল্যাবরেটরিজ ও পাওয়ারগ্রীড কোম্পানি। অপর দিকে সূচক থেকে বাদপড়া তিনটি কোম্পানি হলো কহিনুর কেমিক্যালস, ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট ও লিনডে বাংলাদেশ লিঃ।

গতকাল ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে খাদ্য ও আনুষাঙ্গিক খাতের লাভোলো আইসক্রিম। ৬৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৯২ লাখ ৮২ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ৪৪ কোটি ৯২ লাখ টাকায় ৩৫ লাখ ৮৭ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন উঠে আসে দ্বিতীয় স্থানে। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে মালেক স্পিনিং, ইস্টার্ণ হাউজিং, আইটি কনসালটেন্ট, জেনেক্স ইনফোসিস লিঃ, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, আইপিডিসি, সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট ও মেঘনা ইন্স্যুরেন্স।