আলমগীর কবির
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীকে আংশিক অসাংবিধানিক ঘোষণা করে হাইকোর্ট বিভাগের দেয়া ঐতিহাসিক রায় বহাল রেখেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এর মধ্য দিয়ে প্রায় দেড় দশক পর দেশের সাংবিধানিক কাঠামোয় ফিরে এলো নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। একই সাথে পুনর্বহাল হলো গণভোটের বিধান, বাতিল হলো সংবিধানের তথাকথিত ‘অপরিবর্তনীয়’ বিধান এবং রিট বিচার নিয়ে নতুন সাংবিধানিক অবস্থানও স্পষ্ট হলো।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায়ের ফলে শুধু একটি নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা ফিরল তা নয়; বরং ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে আনা বহু মৌলিক পরিবর্তনের সাংবিধানিক ভিত্তিই নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন- ফিরে আসা তত্ত্বাবধায়ক সরকার কি ত্রয়োদশ সংশোধনীর পুরনো কাঠামোতেই পরিচালিত হবে, নাকি সময়ের বাস্তবতায় সংসদ নতুন কোনো মডেল নির্ধারণ করবে?
বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ পঞ্চদশ সংশোধনীবিষয়ক হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা তিনটি আপিল খারিজ করে দেন। ফলে হাইকোর্টের রায়ই চূড়ান্তভাবে বহাল থাকে এবং সেটিই এখন কার্যকর সাংবিধানিক অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরল, পুরনো ফর্মুলা কি বহাল থাকবে?
রায়ের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার পুনর্বহাল। এর ফলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়ার সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
তবে এ সরকার কিভাবে গঠিত হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ত্রয়োদশ সংশোধনীর বিধান অনুযায়ী সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার যে ব্যবস্থা ছিল, সেটি হুবহু কার্যকর হবে, নাকি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা ও আদালতের পর্যবেক্ষণের আলোকে নতুন কোনো কাঠামো নির্ধারণ করা হবে- এ প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
সংশ্লিষ্ট আইনজ্ঞদের মতে, আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রাখলেও সরকার গঠনের পদ্ধতি নিয়ে সংসদের আইন প্রণয়নের সুযোগ থাকলে সেখানে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা যেতে পারে। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরে এলেও এর সাংগঠনিক রূপ আগের মতো নাও থাকতে পারে।
গণভোটের বিধান এলো, ভেঙে গেল ‘অপরিবর্তনীয়’ ধারণা
রায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সংবিধানে গণভোটের বিধান পুনর্বহাল হওয়া। এর ফলে সংবিধানের কয়েকটি মৌলিক অনুচ্ছেদ- বিশেষ করে ৮, ৪৮, ৫৬, ৫৮, ৮০, ৯২(ক) ও ১৪২- পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শুধু সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা যথেষ্ট হবে না; জনগণের প্রত্যক্ষ অনুমোদনের জন্য গণভোটও প্রয়োজন হবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এর মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের সাংবিধানিক ব্যবস্থা আবারো ফিরে এলো।
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ যুক্ত করে সংবিধানের নির্দিষ্ট কিছু বিষয়কে কার্যত অপরিবর্তনীয় ঘোষণা করা হয়েছিল। এমনকি এসব পরিবর্তনের উদ্যোগকে ‘সাংবিধানিক রাষ্ট্রদ্রোহিতা’ হিসেবে বিবেচনার বিধানও যুক্ত করা হয়।
হাইকোর্ট সেই বিধানকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন। আপিল বিভাগ সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখায় এখন সংবিধানের কোনো অংশকেই জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার বাইরে রাখা যাবে না।
সংবিধান বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, সংবিধান একটি ‘লিভিং ডকুমেন্ট’; সময় ও জনগণের প্রয়োজন অনুযায়ী এর পরিবর্তনের সুযোগ থাকাই সাংবিধানিক গণতন্ত্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য।
রিটের এখতিয়ার শুধু হাইকোর্টের, ৫০টি বিষয়ে সিদ্ধান্ত সংসদের
রায়ের মাধ্যমে আরেকটি সাংবিধানিক প্রশ্নও নিষ্পত্তি হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনীর পর নি¤œ আদালতকে সীমিত পরিসরে রিট শুনানির ক্ষমতা দেয়ার যে বিধান যুক্ত হয়েছিল, সেটিও বহাল থাকেনি। ফলে সংবিধানের ৪৪(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নে রিট শুনানির একচ্ছত্র এখতিয়ার আবারো হাইকোর্ট বিভাগের কাছেই রইল।
আইনজীবীরা বলছেন, এর ফলে সাংবিধানিক বিচারব্যবস্থার দীর্ঘদিনের প্রচলিত কাঠামো অক্ষুণœ থাকল এবং রিট বিচার নিয়ে ভবিষ্যতের বিভ্রান্তিরও অবসান ঘটবে।
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে মোট ৫৪টি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছিল। আদালত তার মধ্যে চারটি বিষয়কে অসাংবিধানিক হিসেবে বহাল রেখেছেন। তবে বাকি প্রায় ৫০টি বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত দেননি; বরং বিষয়গুলো আইন প্রণয়নের জন্য জাতীয় সংসদের বিবেচনার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে সংবিধানের প্রস্তাবনা, চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি, বিভিন্ন সাংবিধানিক ঘোষণা এবং আরো কয়েকটি নীতিগত বিষয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যৎ সংসদ প্রয়োজনবোধে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে এসব বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। ফলে সাংবিধানিক সংস্কারের একটি বিস্তৃত ক্ষেত্র এখন সংসদের জন্য উন্মুক্ত হলো।
আইনমন্ত্রীর ইঙ্গিত : রায়ের আলোকে নতুন মডেলের তত্ত্বাবধায়ক সরকার
রায় ঘোষণার পর সচিবালয়ে জরুরি সংবাদ ব্রিফিংয়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, দেশের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবশ্যই নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হবে। তবে সেই সরকার ঠিক কী কাঠামোয় গঠিত হবে, সে বিষয়ে এখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চায় না সরকার।
তিনি বলেন, আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পাওয়ার আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে মন্তব্য করা সমীচীন হবে না। অতীতের মতো সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সরকার গঠিত হবে, নাকি নতুন কোনো কাঠামো নির্ধারণ করা হবে- এ বিষয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হবে।
আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল হবে- এটি আমাদের রাজনৈতিক, নির্বাচনী ও জাতীয় অঙ্গীকার। তবে আমরা আদালতের রায়কে বাইপাস করব না। পূর্ণাঙ্গ রায়ে কী পর্যবেক্ষণ রয়েছে, সেটি বিশ্লেষণ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের জন-আকাক্সক্ষা এবং সাংবিধানিক বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে দেশের জন্য সর্বোত্তম পথ নির্ধারণ করা হবে।’
তিনি আরো জানান, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যে ৫৪টি বিষয়ে পরিবর্তন আনা হয়েছিল, সেগুলো পর্যায়ক্রমে পর্যালোচনা করা হবে। রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের পর একটি উচ্চপর্যায়ের সংবিধান সংস্কার কমিটি গঠন করা হবে। ওই কমিটি নারী প্রতিনিধিত্ব, গণভোট, নির্বাচনকালীন সরকার, সংবিধানের ১২৩ নম্বর অনুচ্ছেদসহ প্রয়োজনীয় সব বিষয় পর্যালোচনা করবে।
সরকার কোনো একতরফা সিদ্ধান্ত নেবে না বলেও আশ্বাস দেন তিনি। তার ভাষায়, ‘সংবিধান সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সর্বসাধারণ, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, রাজনৈতিক দল, সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে একটি জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা হবে। পাবলিক কনসালটেশনের মাধ্যমে চূড়ান্ত খসড়া প্রস্তুত করা হবে।’
তিনি জানান, মানবাধিকার কমিশন আইন সংস্কারের কাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী সংসদ অধিবেশনেই সংশোধিত মানবাধিকার কমিশন বিল উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে। একই সাথে দেশের সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র এবং আইনের শাসন সুদৃঢ় করতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের সাংবিধানিক সংস্কারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল : আপিল খারিজে হাইকোর্টের রায়ই চূড়ান্ত
রায় ঘোষণার পর সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মো: রুহুল কুদ্দুস কাজল।
তিনি বলেন, আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা সবগুলো আপিল খারিজ করে দিয়েছেন। ফলে হাইকোর্ট বিভাগের রায়ই এখন দেশের সর্বোচ্চ আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে কার্যকর হলো।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘হাইকোর্ট চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন, আপিল বিভাগ তা বহাল রেখেছেন। এর মধ্যে রয়েছে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার পুনর্বহাল, গণভোটের বিধান ফিরিয়ে আনা এবং সংবিধানের ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ বাতিল।’
তিনি বলেন, আপিল বিভাগ নতুন কোনো পৃথক সাংবিধানিক ব্যাখ্যা না দিয়ে মূলত হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছেন। ফলে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, নির্দেশনা এবং ঘোষণাগুলোই এখন কার্যকর থাকবে।
শিশির মনির : ৪টি বিষয় নিষ্পত্তি, বাকি ৫০টি সংসদের বিবেচনায়
শুনানিতে অংশ নেয়া জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, আদালতের রায়ের মাধ্যমে চারটি মৌলিক সাংবিধানিক প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয়েছে। তবে পঞ্চদশ সংশোধনীর আওতায় আনা বাকি নীতিগত বিষয়গুলো সংসদের বিবেচনার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রথমত, সংবিধানের ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদের মাধ্যমে সংবিধানের কিছু অংশকে অপরিবর্তনীয় ঘোষণা এবং পরিবর্তনের উদ্যোগকে সাংবিধানিক রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে বিবেচনার বিধান আদালত বহাল রাখেননি। তার ভাষায়, ‘সংবিধান কোনো দণ্ডবিধি নয়; এটি একটি জীবন্ত দলিল। সময় ও জনগণের প্রয়োজন অনুযায়ী এর পরিবর্তনের সুযোগ থাকতে হবে।’
দ্বিতীয়ত, গণভোটের বিধান পুনর্বহালের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যক্ষ মতামত গ্রহণের সাংবিধানিক পথ আবারো উন্মুক্ত হয়েছে। তৃতীয়ত, রিট শুনানির এখতিয়ার কেবল হাইকোর্ট বিভাগের কাছেই থাকবে। নি¤œ আদালতে রিট বিচার সংক্রান্ত বিধান কার্যকর থাকছে না। চতুর্থত, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বিলুপ্ত করা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে অসাংবিধানিকভাবে বাতিল করা হয়েছিল- আদালতের এই সিদ্ধান্তের ফলে ত্রয়োদশ সংশোধনীর সাংবিধানিক ভিত্তি আবার কার্যকর হয়েছে।
শিশির মনির বলেন, সংবিধানের প্রস্তাবনা, চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি, অনুচ্ছেদ ৪(ক)সহ অন্যান্য প্রায় ৫০টি বিষয়ে আদালত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেননি। এসব বিষয়ে ভবিষ্যৎ জাতীয় সংসদ প্রয়োজন অনুযায়ী আইন প্রণয়ন ও সংশোধনের ক্ষমতা রাখবে।
তার মতে, সংসদ চাইলে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মূল নীতিমালা বহাল রেখে সময়োপযোগী পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন ধরনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামোও নির্ধারণ করতে পারবে। আদালতের রায়ে সে ধরনের আইন প্রণয়নে কোনো সাংবিধানিক বাধা সৃষ্টি হয়নি।
তিনি আরো বলেন, আপিল বিভাগ যেহেতু আপিল খারিজ করেছেন, তাই হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ই এখন কার্যকর। নতুন করে আপিল বিভাগের বিস্তারিত রায়ের জন্য অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই; হাইকোর্টের নির্দেশনাই বর্তমানে কার্যকর আইনগত ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে।
দীর্ঘ ১৫ বছরের সাংবিধানিক বিতর্কের পরিসমাপ্তি
পঞ্চদশ সংশোধনীকে ঘিরে আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের সূচনা হয় ২০১১ সালের ৩০ জুন। ওই দিন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী আইন পাস করে। এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান থেকে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হয় এবং সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে মোট ৫৪টি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়।
এসব পরিবর্তনের মধ্যে ছিল নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার অবসান, সংবিধানে ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ সংযোজন, শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি, রাষ্ট্র পরিচালনার চার মূলনীতি পুনর্বহাল, সংবিধানের বিভিন্ন মৌলিক বিধানে সংশোধন এবং গণভোটের বিধান বাতিল। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো শুরু থেকেই এসব পরিবর্তনের বিরোধিতা করে এবং বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপকে দেশের নির্বাচনব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি হিসেবে অভিহিত করে।
পরবর্তী এক দশকেরও বেশি সময় দেশের প্রায় প্রতিটি জাতীয় নির্বাচন নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ ও বিতর্কের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয়। বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন, নির্বাচন বর্জন এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যু।
গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন আইনি চ্যালেঞ্জ
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন আসে। ক্ষমতার পরিবর্তনের পর সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়ে।
একই বছরের শেষ দিকে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ বিশিষ্ট ব্যক্তি হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। পরে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ আরো কয়েকজন পৃথক রিট দায়ের করেন। রিটগুলোতে পঞ্চদশ সংশোধনীর সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়।
দীর্ঘ শুনানি শেষে হাইকোর্ট বিভাগ ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক রায় দেন। আদালত পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারাকে সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করেন। বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপ, গণভোট বাতিল এবং ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদের বিধানকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়।
পরে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলে বিভিন্ন পক্ষ লিভ টু আপিল দায়ের করে। আপিলের অনুমতি মঞ্জুর হওয়ার পর টানা কয়েক দিনের শুনানি শেষে আপিল বিভাগ সবগুলো আপিল খারিজ করে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ প্রায় দেড় দশকের সাংবিধানিক বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি অধ্যায়ের অবসান ঘটে।
বড় প্রশ্ন- কী হবে নতুন সাংবিধানিক রূপরেখা?
আপিল বিভাগের রায়ের পর সাংবিধানিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে এলেও এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ত্রয়োদশ সংশোধনীর পুরনো কাঠামো হুবহু কার্যকর হবে, নাকি বর্তমান বাস্তবতায় সংসদ নতুন আইন করে একটি যুগোপযোগী নির্বাচনকালীন সরকারের মডেল নির্ধারণ করবে- এ প্রশ্নই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
একই সাথে গণভোটের বিধান পুনর্বহালের ফলে সংবিধানের মৌলিক অনুচ্ছেদ সংশোধনের ক্ষেত্রে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের পথও আবার উন্মুক্ত হয়েছে। অন্য দিকে সংবিধানের কিছু অংশকে ‘অপরিবর্তনীয়’ ঘোষণার ধারণা বাতিল হওয়ায় ভবিষ্যতের সাংবিধানিক সংস্কারের পরিসরও বিস্তৃত হয়েছে।
তবে আদালত পঞ্চদশ সংশোধনীর সব বিধান বাতিল করেননি। বরং বহু নীতিগত বিষয় ভবিষ্যৎ জাতীয় সংসদের বিবেচনার জন্য উন্মুক্ত রেখেছেন। ফলে সংবিধানের প্রস্তাবনা, রাষ্ট্রীয় মূলনীতি, প্রতিনিধিত্বের কাঠামো, নির্বাচনব্যবস্থা এবং অন্যান্য সাংবিধানিক বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে নতুন সংস্কারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, আপিল বিভাগের এই রায় শুধু একটি মামলার নিষ্পত্তি নয়; এটি বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি নতুন মোড়। কারণ এর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা, সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতি, জনগণের প্রত্যক্ষ মতামতের ভূমিকা এবং সংসদের আইন প্রণয়নের ক্ষমতার মধ্যে নতুন ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়েছে। এখন আদালতের রায়ের আলোকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তুলে একটি গ্রহণযোগ্য সাংবিধানিক কাঠামো নির্মাণই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।



