৭০০-এর বেশি আলেম-দায়ীর অংশগ্রহণ

ইস্তাম্বুলে আমানাতুল আকসা অঙ্গীকার ও প্রহরা শীর্ষক তৃতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলন শুরু

Printed Edition
সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখছেন তুরস্কের সাবেক ধর্মমন্ত্রী ও আঙ্কারায় অবস্থিত ইসলামী রিসার্চ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ গোরমেজ ; নয়া দিগন্ত
সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখছেন তুরস্কের সাবেক ধর্মমন্ত্রী ও আঙ্কারায় অবস্থিত ইসলামী রিসার্চ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ গোরমেজ ; নয়া দিগন্ত

মাসুমুর রহমান খলিলী ইস্তাম্বুল থেকে

আল-আকসা আমানত ফাউন্ডেশন ফর দায়ীস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল শরিয়াহ গ্র্যাজুয়েটস গতকাল শনিবার সকাল ১০টায় ইস্তাম্বুলে তাদের তৃতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘আমানাতুল আকসা-অঙ্গীকার ও প্রহরা’ শীর্ষক আয়োজনের উদ্বোধন করেছে। সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ৭০০-এর বেশি আলেম, দায়ী ও ইসলামী চিন্তাবিদ অংশ নেন।

চলমান গাজা যুদ্ধ, মসজিদুল আকসায় দখলদার বাহিনীর আগ্রাসন এবং জেরুসালেমের ইসলামী পরিচয় মুছে দেয়ার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনটি ধর্মীয় আলোচনার গণ্ডি ছাড়িয়ে রাজনৈতিক, নৈতিক ও ফিকহিদায়িত্ববোধের একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে রূপ নিয়েছে।

আকসা কোনো আঞ্চলিক বিষয় নয়, এটি উম্মাহর দায়িত্ব : উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, মসজিদুল আকসা শুধু ফিলিস্তিনিদের কোনো স্থানীয় ইস্যু নয়; এটি গোটা মুসলিম উম্মাহর ওপর আরোপিত একটি শরিয়তসম্মত দায়িত্ব ও সভ্যতাগত আমানত। এ দায়িত্ব পালনে নবীজি সা:-এর ওসিয়ত, হজরত ওমর রা:-এর চুক্তিনামা এবং সালাহউদ্দিন আইয়ুবির জিহাদি উত্তরাধিকার স্মরণ করার আহ্বান জানানো হয়।

সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে ফাউন্ডেশনের সভাপতি প্রফেসর ড. ইসমাইল আল-বশির বলেন, এই সম্মেলন একটি ‘অঙ্গীকার ও প্রহরার মিথাক (অঙ্গীকার)’। আকসা হলো উম্মাহর মাপকাঠি এবং পরিচয়ের মানচিত্র- যা প্রথমে হৃদয়ে আঁকা হয়, তারপর ইতিহাসে লেখা হয়।’

তিনি সতর্ক করে বলেন, বিপদ শুধু ভূমি দখলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং পরিচয় ধ্বংস, ইতিহাস বিকৃতি ও চেতনা বিভ্রান্তিকরণই আজকের সবচেয়ে বড় হুমকি। ড. আল-বশির স্পষ্ট করে বলেন, মসজিদুল আকসা মুসলমানদের একক ও অবিভাজ্য অধিকার এবং গাজা ও জেরুসালেম একই দেহের দুই প্রাণ- একটি ছাড়া অন্যটি টিকে থাকতে পারে না।

তিনি আলেম সমাজকে আহ্বান জানান ‘ফিকহুল আহদ ও ফিকহুল রিবাত’ নতুন করে বিন্যস্ত করার, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির শরিয়াহি বিধান স্পষ্ট করার এবং এমন এক প্রজন্ম গড়ে তোলার, যারা আকসাকে তাদের দায়িত্বের তালিকার শেষে নয় শীর্ষে রাখবে।

গ্রানাডা থেকে গাজা- একই ইতিহাসের ধারাবাহিকতা : তুরস্কের সাবেক ধর্মবিষয়ক প্রধান প্রফেসর ড. মুহাম্মদ গোরমাজ তার বক্তব্যে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘গ্রানাডার আর্তনাদ নিঃশেষ হয়ে যায়নি; আজ তা গাজার কণ্ঠে নতুন করে উচ্চারিত হচ্ছে।’ তিনি সতর্ক করেন, ইসলামী শরীরের কোনো একটি অঙ্গ হারালে তার প্রভাব পুরো উম্মাহর ওপর পড়ে এবং ফিলিস্তিনের ঘটনাপ্রবাহ মুসলিম জাতির নৈতিক দৃঢ়তার এক ঐতিহাসিক পরীক্ষা।

আকসার পক্ষে সম্মেলনও এক ধরনের প্রহরা : বিশ্ব মুসলিম আলেম সম্মেলনের সভাপতি শায়খ হাসান আদ-দাদু বলেন, মসজিদুল আকসা ইবরাহিমি মিল্লাতের উত্তরাধিকার, আর একে কেন্দ্র করে আয়োজিত ইসলামী সম্মেলনগুলো আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রহরারই অংশ। তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, ‘গাজা গ্রানাডা হবে না’- এই দৃঢ় সঙ্কল্পই আজকের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

কারাগার থেকে বার্তা- শক্তির সব উপায় অবলম্বন জরুরি : ফিলিস্তিনি বন্দীদের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন বন্দী আন্দোলনের প্রতীক নায়েল বারগুতি। তিনি বলেন, স্বাধীনতা কখনো দান করা হয় না; তা অর্জন করতে হয় শক্তির সব উপায় গ্রহণের মাধ্যমে- নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও বাস্তবিক।

জেরুসালেম গোটা উম্মাহর আমানত : জেরুসালেম থেকে ভার্চুয়ালি বক্তব্যে শায়খ ইকরামা সাবরি উম্মাহর স্থবিরতা ভাঙার আহ্বান জানান এবং দৈনন্দিন নিপীড়নের সাথে অভ্যস্ত হয়ে পড়ার বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেন। ড. জামাল আমরো বলেন, জেরুসালেম কোনো একটি জাতির সম্পদ নয়; এটি সমগ্র উম্মাহর ঘাড়ে অর্পিত আমানত।

আল্লাহর প্রতিশ্রুতিতে অবিচল আস্থা : সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্যগুলোতে বলা হয়, কথা ও কাজের সামঞ্জস্য, জ্ঞান ও কর্মের ঐক্যই মসজিদুল আকসাকে উম্মাহর হৃদস্পন্দন হিসেবে টিকিয়ে রাখতে পারে। একই সাথে জুলুমের অবসান ও ন্যায়বিচারের বিজয়ে আল্লাহর ওয়াদার ওপর পূর্ণ আস্থা পুনর্ব্যক্ত করা হয়। সম্মেলনের শেষে আকসাকেন্দ্রিক দাওয়াহ, ফিকহ, মিডিয়া ও রাজনৈতিক কর্মপরিকল্পনা সংবলিত একটি ঘোষণাপত্র ও সুপারিশমালা প্রকাশের কথা রয়েছে।