বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেলে (টিএফআই সেল) গুম ও অমানুষিক নির্যাতনের শিকার এক ভুক্তভোগী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে অবর্ণনীয় ও লোমহর্ষক জবানবন্দী প্রদান করেছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৭ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গতকাল সোমবার নতুন এই সাক্ষী ট্রাইব্যুনাল-১-এ তার ওপর নেমে আসা রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের প্রতিটি অধ্যায় তুলে ধরেন। বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদের একক বেঞ্চ এই সাক্ষ্য রেকর্ড করেন এবং আগামী ২৯ জুন অভিযুক্ত পক্ষের জেরার জন্য পরবর্তী দিন নির্ধারণ করেছেন।
সোমবার ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেয়া মাহমুদুল হাসান বর্তমানে চট্টগ্রামে একটি বেসরকারি সংস্থায় প্রোগ্রাম ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত। তিনি জানান, ছাত্রজীবনে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি ছাত্রশিবিরের সমর্থক ছিলেন এবং ফেসবুকে সরকারের একতরফা নির্বাচন ও হেফাজতে ইসলামের ওপর নির্যাতনের গঠনমূলক সমালোচনা করতেন। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ২০ জুন তিনি যখন বাগেরহাটের ফকিরহাটে একটি কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন, তখন রাত ৯টার দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিয়ে সাদা পোশাকধারী ব্যক্তিরা তাকে একটি কালো গ্লাসের হাইস গাড়িতে তুলে নেয়। গাড়িতে তোলার পরপরই তার হাতে হ্যান্ডকাফ ও মাথায় জম টুপি পরিয়ে দেয়া হয়, যার ফলে তার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। গাড়ি চলন্ত অবস্থায় তাকে চারপাশ থেকে লাঠি দিয়ে এবং কানের ওপরে চড়-থাপ্পড় মারা হয়। নির্যাতনের একপর্যায়ে তার বাম হাতের কনুই ফেটে গেলে তারা সেখানে ব্যান্ডেজ করে দেয় এবং তার যশোরের মেস ও অন্যান্য শিবিরের কর্মীদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করে।
ভুক্তভোগী জানান, ওই রাতেই তাকে নিয়ে যশোরের ‘পাঠশালা’ নামক ছাত্রাবাসে অভিযান চালানো হয় এবং ছাত্রদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সেখান থেকে পুনরায় ৩-৪ ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে ফেরি পার হয়ে আরো ৩-৪ ঘণ্টা পর তাকে একটি ভবনের লোহার দরজা পার করে অজ্ঞাত একটি অন্ধকার সেলে ঢোকানো হয়। সেখানে তার গায়ের টি-শার্ট খুলে নেয়া হয় এবং পেছন মোড়া করে শিকের সাথে হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে চোখ কাপড় দিয়ে বেঁধে দেয়া হয়। পবিত্র রমজান মাস চলাকালীন এই গুমের ঘটনা ঘটলেও রোজা রাখার কারণে তিনি একবেলা খাবার খেতে চাইলে তাকে মারধর করা হতো এবং বলা হতো এখানে তিনবেলা খাওয়ার নিয়ম। বাথরুমে যাওয়ার জন্য মাত্র ১ মিনিট সময় নির্ধারিত ছিল এবং দরজা সামান্য ফাঁকা রাখা হতো যাতে তারা নজরদারি করতে পারে। ১ মিনিটের বেশি সময় নিলেই বাথরুমে ঢুকে তাকে নির্মমভাবে পেটানো হতো।
নির্যাতনের চূড়ান্ত বিবরণ দিয়ে সাক্ষী বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে একটি এসি রুমে নিয়ে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে ঝুলিয়ে রাখা হতো এবং কানের লতি ও লজ্জাস্থানে বৈদ্যুতিক শক দেয়া হতো, যার ফলে ৩-৪ দিন ধরে রক্তক্ষরণ ও তীব্র জ্বালাপোড়া হতো। জঙ্গিবাদের মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য তাকে মৃত মানুষের বিকৃত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ছবি দেখিয়ে একই পরিণতি করার হুমকি দেয়া হতো। সারাক্ষণ হাত পেছনে শিকের সাথে বাঁধা থাকার কারণে তিনি শুতে বা ঘুমাতে পারতেন না। চোখে সার্বক্ষণিক কাপড় ও হাতে হ্যান্ডকাফ থাকার কারণে তার চোখের পাশে ও দু’হাতের কব্জিতে গভীর ঘা হয়ে গিয়েছিল। শরীরে কোনো কাপড় না থাকায় সারাক্ষণ ঝাঁকে ঝাঁকে মশা কামড়াতো। তিনি যে নির্যাতন কেন্দ্রে ছিলেন সেখানে ডানে ও বামে ৫টি করে মোট ১০টি সেল ছিল, যার শেষ সেলে তিনি বন্দী ছিলেন। বাথরুমে নেয়ার সময় চোখের বাঁধনের ফাঁক দিয়ে তিনি বাইরে একটি কাঁঠাল গাছের পাতা এবং সার্বক্ষণিক গাড়ির হর্ন ও প্লেন ওড়ার শব্দ পেতেন। একদিন ভালো খাবার দিলে তিনি রোজা আছেন বলার পর নির্যাতনকারীরা উপহাস করে বলেছিল, ‘আজকে ঈদের দিন’। অন্য সেলে বন্দীদের নির্যাতনের কান্নার শব্দও তিনি শুনতে পেতেন।
এক মাস পর তার চুল-দাড়ি কেটে একটি রুমে নিয়ে দুই হাতের ১০ আঙুলের ছাপ, আইরিশ ও ছবি নেয়া হয়। এরপর চোখে কাপড়ের নিচ দিয়ে তিনি দেখতে পান যে তাকে ‘র্যাব’ লেখা একটি বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরানো হয়েছে। রাতে গাড়িতে তুলে ৩-৪ ঘণ্টা পর সাংবাদিকদের সামনে এনে হাজির করা হয় এবং একটি বাড়ির চারতলা থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে বলে র্যাব সদস্যরা সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। এরপর টঙ্গী মডেল থানায় সোপর্দ করা হলে তৎকালীন ওসি ফিরোজ তালুকদার অভিযোগ মিথ্যা জেনে প্রথমে তাদের গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান, তবে পরে বাধ্য হয়ে গ্রহণ করেন। গাজীপুর কোর্টে হাজির করে অস্ত্র, বিস্ফোরক ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের তিনটি মিথ্যা মামলায় তাদের দুই দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। রিমান্ড শেষে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিতে অস্বীকার করলে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট র্যাব সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘এদেরকে ভালোভাবে পিটানো হয়নি। এরা ১৬৪ দিবে না’। এরপর তাদের গাজীপুর জেলহাজতে পাঠানো হয়।
পরবর্তীতে দীর্ঘ ২৫ মাস কারাগারে থাকার পর আদালত থেকে জামিন পেলেও জেলগেট থেকেই কাউন্টার টেররিজম ইউনিট তাকে পুনরায় তুলে নিয়ে মিন্টো রোডের অফিসে আরো ১৬ দিন গুম করে রাখে। পরে তার বাবার উপস্থিতিতে মুচলেকা নিয়ে তাকে ছাড়া হয়। এই সময়ের মধ্যে তার বিরুদ্ধে মোট সাতটি মামলা দেয়া হয়েছিল, যার চারটিতে তিনি খালাস পেয়েছেন এবং তিনটি মামলা এখনো চলমান। গুমের পর তার সহকর্মী বাহারুল ইসলাম ফকিরহাট থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং-৭৪৫, তারিখ: ২১-০৬-২০১৬) করেছিলেন, যার কপি তার বাবা কর্মস্থল থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। এই পরিকল্পিত গুমের সাথে তৎকালীন সরকার, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং র্যাবের ইন্টেলিজেন্স উইং সরাসরি জড়িত দাবি করে সাক্ষী ট্রাইব্যুনালের কাছে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আবেদন জানান।
বিগত সরকারের আমলে র্যাবের টিএফআই সেলে গুমের এই ঘটনায় বর্তমান ও সাবেক ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ১৭ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে ১০ জন বর্তমানে ঢাকা সেনানিবাসের সাবজেলে আটক রয়েছেন। আজ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা আটককৃতরা হলেন- ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: জাহাঙ্গীর আলম, তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, মো: কামরুল হাসান, মো: মাহবুব আলম, কে এম আজাদ, কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন, আনোয়ার খতিফ খান (অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে); লে. কর্নেল মো: মশিউর রহমান, সাইফুল ইসলাম এবং মো: সারওয়ার বিন কাশেম। মামলার অপর সাত অভিযুক্ত বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। তারা হলেন- ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার সাবেক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ ও এম খুরশীদ হোসেন, ঢাকা মহানগর পুলিশের ডিবির সাবেক প্রধান মো: হারুন অর রশিদ এবং লে. কর্নেল (অব:) মুহাম্মাদ খায়রুল ইসলাম।



