বর্তমান চ্যাম্পিয়ন। এই মর্যাদা নিয়ে বিশ্বকাপ ধরে রাখার মিশনে প্রথম ম্যাচেই হার। এই উদহারণ টানার জন্য বেশি দূরে বা অন্যের বেকর্ড ঘাঁটাঘাঁটি করার দরকার নেই। খোদ আর্জেন্টিনাই ১৯৮৬ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর ১৯৯০ সালে প্রথম ম্যাচে ০-১-এ হেরে গিয়েছিল ক্যামেরুনের কাছে। ২০০২ সালে সেনেগালের কাছে উদ্বোধনী ম্যাচেই ০-১ গোলে ধরাশায়ী হয় ১৯৯৮-এর চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স। ২০১৪-এর বিশ্বকাপজয়ী জার্মানিকে ২০১৮ বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচেই ১-০-তে হারিয়েছিল মেক্সিকো। তাই শঙ্কা ছিল এবার আর্জেন্টিনাকেও হয়তো এই পরিণতি বরণ করতে হতে পারে। কারণ প্রতিপক্ষ যে ক্যামেরুন ও সেনেগালের মতোই অপর আফ্রিকান দেশ আলজেরিয়া। তবে উত্তর আফ্রিকার আরবি ও ফরাসি ভাষাভাষী দেশটিকে কোনো সুযোগই দেয়নি তিনবারের বিশ্বসেরারা। যে দাপটের সাথে লাতিন দেশটি কাতার বিশ্বকাপে খেলেছিল সেটিই ধরে রাখল যুক্তরাষ্ট্রের ক্যানসাস স্টেডিয়ামে। ফুটবলের জীবন্ত কিংবদন্তি লিওনেল মেসির হ্যাট্রিটিকে ৩-০ গোলের সহজ জয় আজেন্টিনার। তিন গোল করে অধিনায়ক মেসি প্রথমবারের মতো হ্যাটট্রিক পেলেন বিশ্বকাপে। আর এই তিন গোল দিয়ে তিনি এখন বিশ্বকাপে ১৬ গোল দেয়া জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসার সাথে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা।
২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার শুরুটা ছিল হতাশার। প্রথম ম্যাচেই তাদের হারের তিক্ত স্বাদ দিয়েছিল সৌদি আরব। হয়তো অতীতের সব রেকর্ড দেখেই বাড়তি সতর্ক ছিলেন আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি। এরপরও ৮ মিনিটে আলজেরিয়া গোলও করে ফেলেছিল; কিন্তু অফসাইডে তা বাতিল হওয়ায় রক্ষা। অবশ্য ম্যাচের ৫ মিনিট বয়সে দিয়েগো ম্যারাডোনা, গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতাদের দলও এগিয়ে গিয়েছিল। গোলদাতা সেই মেসি; কিন্তু তার গোলও সহকারী রেফারির ওঠানো পতাকার কারণে বাতিল।
শুরুতেই আর্জেন্টিনা লিড পায়নি স্ট্রাইকার লাউতারো মার্টিনেজের হেড আলজেরিয়ার গোলরক্ষক লুকা জিদান রুখে দেয়ায়। ফ্রান্সের ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ জয়ী তারকা জিনেদিন জিদানের ছেলে এই লুকা জিদান।
প্রথম ৫ মিনিটের মধ্যে তিনবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা গোল না পেলেও ১৭ মিনিটে সেই অপেক্ষার অবসান। কানসাস স্টেডিয়ামে এই ম্যাচ খেলার জন্য মাঠে নামার সাথে সাথেই রেকর্ড বুকে চলে যান মেসি। তিনিই প্রথম ফুটবলার যার টানা ৬ বিশ্বকাপ খেলা হলো। এই রেকর্ডের ম্যাচে তার গোলেই শুরু। মাঝ মাঠ থেকে লিওনেল মেসিকে থ্রু পাস দেন রদ্রিগো ডি পল। এরপর মেসি সেই বল ধরে বক্সের বাইরে থেকে দূরপাল্লার যে শট নেন তাকে পরাস্ত করেন জুনিয়র জিদান। সামনে থাকা দুই ডিফেন্ডারকে বোকা বানিয়ে মেসি তার বাম পায়ের যে ট্রেড মার্ক শট নেন তা লুকা জিদানের দুই হাতের বাধা ডিঙ্গিয়ে আশ্রয় নেয় জালে।
এই গোলেই শেষ হয় প্রথমার্ধ। বিরতির পরপরই সমতা আনার সুযোগ পেয়েছিল আলজেরিয়া। তাদের হাদি মুসার শট রুখে দেন আর্জেন্টিনার তারকা গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ, যিনি ভাঙা আঙুলের চোট কাটিয়ে ফিরেছেন ম্যাচে। এরপর অপেক্ষা কখন দ্বিতীয় গোলের দেখা পাবে আর্জেন্টিনা। কাতার বিশ্বকাপে অফ ফর্মে থাকা স্ট্রাইকার লাউতারো মার্টিনেজ সফলতা পাচ্ছিলেন না। শুরুর দিকের মতো ৫৩ মিনিটেও পারেননি লুকা জিদানকে পরাস্ত করতে।
ফলে কোচ স্কালোনি মাঠ থেকে তুলে নেন লাউতারোকে। মাঠে আসেন কাতার বিশ্বকাপে ৪ গোল করা জুলিয়ান আলভারেজ।
তবে গোল করার দায়িত্বটা নিজের কাঁধেই নেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। ৬০ মিনিটে পান নিজের এবং দলের দ্বিতীয় গোল। এই গোলের পুরো উৎস তিনি। প্রথমে কর্নার করেন। সেই কর্নার আলজেরিয়ার ডিফেন্স লাইনে ক্লিয়ার হয়ে চলে যায় আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজের কাছে। টাইব্রেকার ঠেকাতে বিশেষজ্ঞ এই কিপার সেই বল লব করেন মেসির উদ্দেশ্যে। মেসি কর্নারের পতাকার পাশে সেই বল ধরে বল ফেলেন বক্সের সামনে। বল যখন ম্যাক অ্যালিস্টারের কাছে তখন মেসি বল চাচ্ছিলেন; কিন্তু কাতার বিশ্বকাপে গোল করা অ্যালিস্টার নিজেই শট নেন পোস্টে। তার বাঁকানো মাটিঘেঁষা শট জিদানের হাঁটুতে লেগে সামনে পড়ে। মেসি আগেই বুঝতে পেরেছিলেন এই ধরনের শটে চান্স তৈরি হয়। তাই তিনি শটের সাথে সাথে দৌড়াতে থাকেন। ঠিকই বল লুকা জিদানের পায়ে লেগে সামনে চলে আসে। ফলে মেসির পক্ষে ডান পায়ের প্লেসিং শটে গোল করতে কোনো সমস্যাই হয়নি। এই গোলের আগে ও পরে দু’টি চান্স মিস করেন মেসি। ৫১ মিনিটে তার শট বার উঁচিয়ে চলে যায়। আর ৬৫ মিনিটে জিদানের বাধায় বল জালে না গিয়ে কর্নার হয়।
এরপর শুরু হয় জল্পনা-কল্পনা। কখন হ্যাটট্রিক পাবেন মেসি। নাকি এবারো অধরাই থেকে যাবে হ্যাটট্রিক। অবশ্য এবার সৃষ্টিকর্তা তাকে আর হতাশ করেননি। ৭৬ মিনিটে জুলিয়ান আলভারেজের সাথে বল ওয়ান টু করে বক্সের বাইরে বল পান মেসি। এরপর সেখান থেকে বাম পায়ের স্বল্প উচ্চতার শট। এই শট ঠেকাতে ডান দিকে পুরো শরীর ফেলে দেন আলজেরিয়ার গোলরক্ষক। মেসির নিখুঁত শটের মোহনীয়তায় অবশ্য কাজ হয়নি। বল চলে যায় জালে। আর বিশ্বকাপে প্রথম এবং আর্জেন্টিনার হয়ে দশম হ্যাটট্রিক পূরণ করেন বার্সেলোনা, প্যারিস সেন্ট জার্মেই হয়ে এখন ইন্টার মিয়ামিতে খেলা ফরোয়ার্ডটি।
জাতীয় দলের হয়ে ২০০তম ম্যাচে খেলার মাইলফলকের দিনে হ্যাটট্রিক করা এবং দলকে জেতানো সবই পেয়েছেন মেসি। এখন লাতিন আমেরিকার এই দেশটির পরের ম্যাচ ২২ জুন রাতে ডালাসের মাঠে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে। কাল অপর ম্যাচে অস্ট্রিয়া ৩-১ গোলে হারিয়েছে এবারের বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া এশিয়ার দেশ জর্দানকে।



