রফিকুল হায়দার ফরহাদ, কানাডা থেকে
৭২ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলছে সুইজারল্যান্ড। দলকে এই পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে ইতিহাস গড়েছেন তুর্কি বংশোদ্ভূত কোচ মুরাত ইয়াকিন। তার দল ‘রাউন্ড অব ৩২’-এ আলজেরিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে সেরা ১৬তে ওঠে। এরপর কলম্বিয়াকে পেনাল্টি শুটআউটে হারিয়ে টুর্নামেন্টের শেষ আটে নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করে। ১৯৫৪ সালের পর থেকে কোনো বড় টুর্নামেন্টে দলটির দীর্ঘ দিনের একটি বাধা বা খরা কাটল এবার। গ্রুপ পর্বে তারা কাতারের সাথে ১-১ গোলে ড্র করে। এরপর বসনিয়াকে ৪-১ গোলে এবং কানাডাকে ২-১ গোলে হারায়। সুইজারল্যান্ডের এখন প্রতিপক্ষ হলো আর্জেন্টিনা। ২০১৪ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে আলবিসেলেস্তেদের কাছে ১-০ গোলে হেরেছিল সুইসরা। সাওপাওলোর ওই ম্যাচে নির্ধারিত সময় গোলশূন্য থাকার পর অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তে (১১৮ মিনিটে) জয়সূচক গোলটি করেছিলেন আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া। এবার দেখা হচ্ছে কোয়ার্টার ফাইনালে। এই ম্যাচে ২০১৪ সালের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার পালা সুইসদের। এই ম্যাচ জিতে সেমিফাইনালে উঠলে আরেক ইতিহাস গড়া হবে সুইজারল্যান্ডের।
২০২১ সালের আগস্টে ইয়াকিন সুইজারল্যান্ড জাতীয় দলের ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি একটি শক্তিশালী, সুশৃঙ্খল এবং রক্ষণভাগে অত্যন্ত সংহত দল গড়ে তুলেছেন। বিশ্বকাপ ফুটবলে তার উল্লেখযোগ্য সাফল্যের মধ্যে রয়েছে ২০২২ বিশ্বকাপ কঠিন বাছাইপর্বের বাধা পেরিয়ে ‘রাউন্ড অব ১৬’-এ নিয়ে যাওয়া। সেবারও সুইজারল্যান্ড দ্বিতীয় রাউন্ডেই বিদায় নেয়। এবার গ্রুপ পর্ব থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়েই তাদের এ পর্যন্ত আসা। এ ছাড়া ২০২৪ ইউরোতে সুইজারল্যান্ড ১-১ গোলে ড্র করে জার্মানি ও স্কটল্যান্ডের সাথে। আর ৩-১-এ হারায় হাঙ্গেরিকে। এরপর দ্বিতীয় রাউন্ডে ইতালিকে ২-০ গোলে হারায়। যদিও কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের কাছে হারতে হয়েছিল টাইব্রেকারে।
মুরাত ইয়াকিন বিশ্বকাপে খেলতে পারেননি। অবশ্য জাতীয় দলের হয়ে ৪৯ ম্যাচে ৪ গোল। দিলেও কোচ হিসেবে স্ইুসদেরকে সাফল্য এনে দিচ্ছেন। টানা দুই বিশ্বকাপে দলকে নকআউটে নিয়ে গেছেন। মুরাতের ছোট ভাই হাকান ইয়াকিন ২০০৬ ও ২০১০ বিশ্বকাপে খেলেছেন সুইজারল্যান্ডের হয়ে।
হাকান ইয়াকিন ২০১০ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে সুইজারল্যান্ডের খেলা ১০টি ম্যাচের মধ্যে সাতটিতে অংশ নেন। তিনি দু’বার মূল একাদশে এবং পাঁচবার বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামেন এবং ইসরাইলের বিপক্ষে দলের প্রথম বাছাইপর্বের ম্যাচে একটি গোল করেন। ২০১১ সালের ৪ অক্টোবর তিনি সুইজারল্যান্ড জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন। জাতীয় দলের হয়ে তিনি ৮৭ ম্যাচে ২০ গোল করেন।
হাকান ইয়াকিন ২০০০ সালে প্রথমবার জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামেন। সুইস দলে ডাক পাওয়ার আগেই তাকে তুরস্কের নাগরিকত্ব গ্রহণের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল; কিন্তু ব্যক্তিগত কারণে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি তার দেশের হয়ে উয়েফা ইউরো ২০০৪, উয়েফা ইউরো ২০০৮ এবং ২০০৬ ও ২০১০ সালের ফিফা বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করেছেন।
২০০৮ সালের ১১ জুন, ইউরো ২০০৮-এর ‘গ্রুপ এ’-তে তুরস্কের বিপক্ষে সুইজারল্যান্ডের ম্যাচ। ৩২ মিনিটে হাকান ইয়াকিন প্রথম গোলটি করে দলকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন; তবে নিজের পরিবারের জন্মভূমির প্রতি শ্রদ্ধাস্বরূপ গোল করার পর তিনি কোনো উদযাপন করেননি। অবশ্য এরপর তিনি আরেকটি সুযোগ হাতছাড়া করেন এবং দ্বিতীয়ার্ধে তুরস্ক দু’টি গোল করে বসে। এর ফলে টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যেই গাণিতিক হিসেবে সুইজারল্যান্ড প্রথম দল হিসেবে প্রতিযোগিতা থেকে বিদায় নেয়। তবে পর্তুগালের বিপক্ষে গ্রুপের শেষ ম্যাচে ইয়াকিন দ্বিতীয়ার্ধে দু’টি গোল করেন (যার মধ্যে দ্বিতীয়টি ছিল পেনাল্টি কিক), যা ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপে সুইজারল্যান্ডকে তাদের ইতিহাসের প্রথম জয় (২-০) এনে দেয়।
সুইজারল্যান্ড দলে আরো একজন তুর্কি ফুটবলার আছেন। তার নাম এরায় কমের্ট। বিভিন্ন সময়ে মোট ১০ জন তুর্কি ফুটবলার খেলেছেন সুইস জাতীয় দলে। এ ছাড়া সুইজারল্যান্ডের লিগে ৩০-৩৫ জন তুর্কি ফুটবলার খেলেন।



